প্রকৃতিপুরাণরাঙামাটিলিড

নির্বিচারে কাটা হচ্ছে পাহাড়, উজাড় হচ্ছে বন

শুভ্র মিশু ॥
পাহাড়, প্রকৃতি, ছড়া, ঝিরি-ঝর্ণা নানান উপাদান নিয়ে গঠিত পার্বত্য জনপদ রাঙামাটি। জেলার দশ উপজেলার ৭ উপজেলায় দুর্গম। যার অনেক ইউনিয়নে এখনো শহর থেকে যেতে সময় লাগে দুই থেকে তিন দিন। আবার অনেক ইউনিয়নে যেতে হয় অন্য জেলা ঘুরে দুর্গম পথ পেরিয়ে। দুর্গম এলাগুলোতে এখনো সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই, ব্যবহারের মাধ্যম ছড়া, ঝর্ণা, ঝিরি। কিন্তু নির্বিচারে গাছকাটা, পাহাড় কেটে বসতি স্থাপনে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে সে ছড়া-ঝিরি। চরম আকারে দেখা দিচ্ছে যেমন সুপেয় পানির সংকট, ইদানিং কালে প্রায় প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে যাচ্ছে মানুষের প্রাণ।

জেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়কের এক কিলোমিটার ভিতরেও শুষ্ক মৌসুমে প্রকৃতির সবুজের দেখা মেলা ভার। নির্বিচারে কাটা হচ্ছে গাছ। পাহাড় কেটে ও ঝর্ণা ঝিরি থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে পাথর, যার কারণে শুষ্ক মৌসুমে ঘাগড়া ঝর্ণা এলাকায় বসবাস করা প্রায় ১০৬টি পরিবার ভুগছে পানি সংকটে। সেসব পরিবার আগে শুষ্ক মৌসুমে ছড়ায় পাথরের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা পানি ব্যবহার করলেও এখন নির্বিচারে উত্তোলনের ফলে পানির সে উৎস নষ্ট হয়ে গেছে, কুয়া থেকেও উঠছে না পর্যাপ্ত পানি, যার কারণে ভুগতে হচ্ছে পানি সংকটে।

তেমনিভাবে জেলার সাজেক, জুরাছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলায় শুষ্ক মৌসুমের শুরু থেকেই শোনা যায় পানি সংকটের কথা। সেখানে এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে ছড়া, ঝিরি, ঝর্ণা। যার কারণে শুষ্ক মৌসুমে যেমন সুপেয় পানির চরম সংকট দেখা দেয়, নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে বর্ষা মৌসুমে খাবার পানি সংগ্রহ করার কুয়াগুলোতে ময়লা পড়ে পানি খাবারের অযোগ্য হয়ে উঠে, এতে বর্ষায় খাবার পানির সংকট আরো তীব্রতর হয়।

জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দাবি তারা মোট জনসংখ্যার ৬৫শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে সুপেয় পানি। বাকি ৩৫শতাংশ মানুষ এখনো সুপেয় পানির সংকটে রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, জেলা শহরসহ আশপাশের উপজেলাগুলোতে পাহাড় কেটে তৈরি হচ্ছে বসতি। জেলা শহরে প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে যেমন কাটা হচ্ছে গাছ, তেমনি ভাবে পাহাড়ের গায়ে স্তর স্তর পাহাড় কেটে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে বসতি। শহরজুড়ে এমন অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণে বর্ষা এলেই শুরু হয় পাহাড় ধসে প্রাণহানির শঙ্কা। ২০১৭সালে প্রকৃতির প্রতিশোধে এক রাতেই জেলাজুড়ে পাহাড় ধসে প্রাণ গিয়েছিল ১২০জনে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল শতশত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়, যা দেশের ইতিহাসে প্রথম। ২০১৮সালে জেলার নানিয়াচরে পাহাড় ধসে প্রাণ যায় ১১জনের, ২০১৯ সালে কাপ্তাই উপজেলায় পাহাড় ধসে প্রাণ যায় আরো তিন জনের। আর নির্বিচারে গাছ কাটায় শহরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হচ্ছে তীব্র তাপদাহ, যা জনজীবনে অস্বস্তির সৃষ্টি করছে দিন দিন। জেলা লংগদু, রাজস্থলীসহ উপজেলার ইটভাটাগুলোতে প্রতিনিয়ত পাহাড় কাটা মাটি ব্যবহার করে ইট তৈরির অভিযোগ আছে। পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসনিক নানা ব্যবস্থাপনা দেখা গেলেও কিছু সময় পর তা আবারও আগের ঠিকানায় ফিরে যায়।

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, পাহাড়কাটা বন্ধে জোরালো ভূমিকা রাখছে জেলা প্রশাসন। যেখানেই পাহাড় কাটার খবর পাচ্ছে সেখানেই তারা তৎক্ষণাৎ অভিযান পরিচালনা করছে। বাংলা ভাষাসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের কয়েকটি ভাষায়ও পাহাড় কাটা ভয়াবহতা এবং পাহাড় না কাটতে জনসাধারণকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাথর উত্তোলনে খবর পেলে সেখানেও অভিযান পরিচালনা করছে স্থানীয় প্রশাসন। এছাড়াও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবিচারে বৃক্ষ নিধন রোধ ও বৃক্ষ রোপণে জনসাধারণকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপের গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।

জুরাছড়ি উপজেলার অন্তিক চাকমা জানান, আগে ছড়া, ঝিরি, কুয়া থেকে আমরা শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমে পানি সংগ্রহ করতাম। এখন দীর্ঘপথ পেরিয়ে শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ে নিচে কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করি। কিন্তু বর্ষায় একমাত্র ভরসা বৃষ্টির পানি, কারণ নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে বর্ষায় বৃষ্টির পানির সাথে ময়লা এসে কুয়ার পানি ময়লা হয়ে যায়, যা খাবার তো দুরের কথা অনেক সময় ব্যবহারের উপযোগীই থাকে না।

কাউখালি উপজেলার ৩নং ঘাগড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জগদিশ চাকমা বলেন, ছড়া থেকে পাথর উত্তোলন করতে করতে পানির উৎস প্রায় শেষ। এখন শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানি সংকট দেখা দেয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চল কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসাইন বলেন, পাহাড় কাটা পাথর উত্তোলনের তথ্য পেলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইতিমধ্যে আমরা যেমন জরিমানা আদায় করেছি, তেমন মামলা করেছি পাহাড় কাটার জন্য।

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগীয় কর্মকর্তা রফিকুজ্জামান শাহ বলেন, দক্ষিণ বন বিভাগ জেলার পাঁচটা উপজেলার ২লক্ষ ২হাজার ৬৬৯একর জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের রিজার্ভ ফরেস্টে তেমন কোন গাছ কাটা অভিযোগ নাই। আমরা জনগণকে উৎসাহিত করি যাতে রিজার্ভ ফরেস্টের গাছ না কাটে, গাছের উপকারিতা সম্পর্কে অবহিত করি। এছাড়াও বর্ষাকাল গাছ লাগানোর মৌসুম এই সময় যাতে সকলে তিনটা করে গাছ লাগাই সেজন্যও উৎসাহিত করি।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমরা জনসাধারণকে বৃক্ষ রোপণে উৎসাহিত করছি। আবার পাহাড়কাটা, পাথর উত্তোলন বন্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। যেখানেই পাহাড়কাটা হবে সেখানেই আমরা অভিযান পরিচালনা করবো। জেলায় পাহাড় কাটা নিরুসাহিত করতে নানা ভাষায় প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button