ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

নির্বাচনী বছরে পাহাড়ের রাজনীতি

ভয় আর শংকাকে জয় করে নতুন পথেই পথা চলা শুরু করেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জাতীয় দলগুলোর বৈরিতা দিনে দিনে যেনো আরো বাড়ছে পাহাড়ে। একসময় কথার যুদ্ধ এখন সরাসরি অস্ত্র আর হামলায় রূপান্তর হয়েছে। সবমিলিয়ে স্বস্তি নেই পাহাড়ে। ২০১৭ সালে কেমন ছিলো পাহাড়ের রাজনীতি আর কোন পথেই হাঁটছে ভবিষ্যত,সেসব নিয়েই পর্যালোচনা করার চেষ্টা করেছি আমরা এই প্রতিবেদনে। যেহেতু ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন,সেহেতু নির্বাচনের এই বছরে পাহাড়ের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি জানার চেষ্টাও করেছি আমরা।

জাতীয় রাজনীতির উপর আঘাত !
২০১৭ সালের শেষাংশে এসে হঠাৎ করেই আলোচনা চলে আসে রাঙামাটিতে আওয়ামী রাজনীতিতে জড়িত পাহাড়ীদের উপর উপর্যুপরি হামলা এবং গণপদত্যাগের ঘটনা। জুরাছড়ি উপজেলা আওয়ামীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমাকে গুলি করে হত্যা,বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি রাসেল মার্মা ও রাঙামাটি জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি ঝর্না খীসাকে হত্যাচেষ্টার ঘটনার পর জুরাছড়ি,বিলাইছড়ি,বাঘাইছড়ি এবং রাজস্থলী উপজেলা থেকে একের পর এক পাহাড়ী নেতাকর্মীদের পদত্যাগের ঘটনা জেলা জুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। মূলত: জনসংহতি সমিতির হুমকি ও চাপ প্রয়োগের কারণে এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটলেও সংগঠনটি এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের নেতারা পুরো বিষয়টিকে জাতীয় রাজনীতি ও চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার উপর আঘাত বলে অভিযোগ করে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছে জনসংহতির দিকেই।

ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল : ২০১৭ সালেও হয়নি কমিটি !
২০১৫ সালের ২ জুন রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনের মাধ্যমে ৬ সদস্যের কমিটি গঠন হওয়ার পর থেকেই প্রতিবছরই প্রতীক্ষায় থাকে ঐতিহ্যবাহি এই ছাত্র সংগঠনটির নেতাকর্মীরা পূর্ণাঙ্গ কমিটির ! কিন্তু বাস্তবতা হলো,গত ২০১৫,২০১৬ সালের মতো ২০১৭ সালেও আশাহত থাকতে হয়েছে এই জেলার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের। টানা তিনবছর পূর্ণাঙ্গ কমিটিহীন থাকলো সংগঠনটি। বারবার পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে এমন আশ্বাস দিয়ে আসলেও এই বছরও কমিটি হয়নি সংগঠনটির,এটাই রূঢ় কঠিন বাস্তবতা।

অন্যদিকে ২০১০ সালে গঠিত হয় রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের কমিটি। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরো বছরের পর বছর চলে গেলেও নতুন কমিটি গঠনের কোন প্রক্রিয়া বা উদ্যোগ নেই। কবে সম্মেলন হবে আর নতুন নেতৃত্ব পাবে সংগঠনটি জানেনা কেউই। ২০১৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ে রাঙামাটি কমিটি করার বিষয়ে কিছু তোড়জোড় শুরু হলেও তাও হালে পানি পায়নি,বছর শেষে সেই একই আদুভাইদের হাতেই রয়ে গেছে সংগঠনটির নেতৃত্ব !

চাঙ্গা য্বুদল-যুবলীগ !
ছাত্রলীগ আর ছাত্রদলের বেহাল দশার মধ্যে একেবারেই বিপরীত অবস্থান ছিলো আওয়ামী যুবলীগ ও জাতীয়তাবাদী যুবদলের। সরকারি দলের কর্মসূচীতে সক্রিয় অংশগ্রহণ,নিজেদের অসংখ্য কর্মসূচী পালন,ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠনসহ নানান কাজের মধ্য দিয়ে ২০১৭ সালের পুরো বছরই চাঙ্গা ছিলো পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী ও নুর মোহাম্মদ কাজলের নেতৃত্বাধীন যুবলীগ।

অন্যদিকে সভাপতি সাইফুল ইসলাম শাকিল ও সাধারন সম্পাদক মো: ইলিয়াছের নেতৃত্বে সারা বছর মাঠে ময়দানে কর্মসূচীতে এবং নেতাকর্মীদের আগলে রেখে ও সক্রিয় রেখে চাঙ্গা ছিলো যুবদলও। নিজেদের সাংগঠনিক ভাবে আরো শক্তিশালি করা এবং নিয়মিত কর্মসূচী পালন করার পাশাপাশি এই বছর যুবদলের একাধিক নেতা গ্রেফতারও হন। গ্রেফতারকৃতদের মুক্ত করে আনতেও যুবদলের নেতৃত্ব দায়িত্বশীল ও সক্রিয়া ভূমিকা পালন করে প্রশংসিত হয়েছে।

নয়া রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক)
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ীদের ইতোপূর্বেকার তিন রাজনৈতিক দলের ভীড়ে এ বছর নাম লেখায় আরো একটি আঞ্চলিক দল। সেটি হলো ইউপিডিএফ থেকে বিভিন্ন সময় বহিস্কৃত ও বের হয়ে যাওয়াদের সমন্বয়ে গঠিত ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক)। একসময়কার সংগঠনটির নানিয়ারচর এলাকার প্রভাবশালী নেতা তপনজ্যোতি চাকমা বর্মার নেতৃত্বে ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর খাগড়াছড়িতে এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় দলটি। প্রতিষ্ঠার পর পরই ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রিত নানিয়ারচর ও সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গায় এই সংগঠনটির হামলায় নিহত হয় ২ ইউপিডিএফ নেতা। নিজেদের শক্ত দুর্গ নানিয়ারচরে চ্যালেঞ্জে পড়ে মূল দল ইউপিডিএফ। বছরের শেষে এই দুই দলের আধিপত্যের লড়াই জারি ছিলো এই উপজেলায়।

কার্যালয়েই অবরুদ্ধ কর্মসূচী বিএনপি’র !
বিগত বছরগুলোর মতো ২০১৭ সালেও রাঙামাটি জেলা বিএনপি ও সহযোগি সংগঠনগুলোর বেশিরভাগ কর্মসূচীই পালিত হয়েছে দলীয় কার্যালয় চত্বরেই পুলিশী বাধা ও অবরুদ্ধতায়। বিএনপির নেতাকর্মীরা মিছিল বের করার চেষ্টা করবে আর পুলিশ বাঁধা দিবে,এটাই যেনো নিয়ম হয়ে গেছে রাঙামাটির বিএনপি ও সহযোগি সংগঠনগুলোর কর্মসূচী পালনের। দুচারটি ব্যতিক্রম বাদে দলটির বেশিরভাগ কর্মসূচীই পালিত হয়েছে অবরুদ্ধভাবেই। বিএনপি নেতারা এর জন্য সরকারের ‘ফ্যাসিবাদি’ আচরণকে দায়ি করলেও, খোদ দলটির নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশের অভিযোগ সিনিয়র নেতাদের ‘আপোষ ও সমঝোতা’মূলক মনোভাবই এর কারণ । আবার বিএনপির মনীষ ও দীপেন গ্রুপের পৃথক কর্মসূচী পালন অব্যাহত ছিলো এই বছরেও। আর সবচে বড় খবর ছিলো, একসময়কার দীপেন দেওয়ানের কট্টর সমালোচক সাইফুল ইসলাম ভূট্টোর আবার তার গ্রুপেই সংযুক্ত হওয়া।

নির্বাচনের প্রস্তুতিতে মাঠে প্রার্থীরা
সম্ভাব্য নির্বাচনকে ঘিরে রাঙামাটি শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র চষে বেড়াচ্ছেন আওয়ামলীগের কেন্দ্রীয় নেতা,সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার। প্রায় প্রতি সপ্তাহান্তেই জেলার কোথাও না কোথাও যাচ্ছেন তিনি দলীয় কর্মসূচী কিংবা সরকারি কোন উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করতে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে যেই আসুন না কেনো,তাকে যে দীপংকর তালুকদারের সাথে কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হবে তা নিশ্চিত। আওয়ামীলীগে দীপংকর তালুকদার ছাড়া আর কোন প্রার্থী না থাকলেও বিএনপিতে কে প্রার্থী হবেন জানেনা কেউই। এখানে নির্বাচনী দৌড়ে আছেন মনীষ দেওয়ান,দীপেন দেওয়ান,মো: শাহ আলমসহ অনেকেই। অন্যদিকে পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলো কি এবারো পৃথক প্রার্থী দিবে নাকি সম্মিলিত প্রার্থী থাকবে তাদের,তা এখনো স্পষ্ট হয়নি।

সবমিলিয়ে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে পাহাড়ের রাজনীতিতে একটি বাঁক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্চে,যা হয়তো সময়ের সাথে সাথে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হবে।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button