parbatyachattagram

২০০১ সালের ৪ হাজার এবার ৩৫ হাজার !

ধানের ঘাঁটিতে নৌকার হাসি

রাঙামাটির জেলার গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা লংগদু। কাপ্তাই হ্রদবেষ্টিত এই উপজেলার আয়তন ৩৮৮.৪৯ বর্গকিলোমিটার,প্রায় ৬৮ হাজার ৪১ জন লোকসংখ্যা অধ্যুষিত এই উপজেলার বেশিরভাগ মানুষের জীবিকা কৃষি আর কাপ্তাই হ্রদ থেকে আহরিত মৎস সম্পদ আহরণের উপর নির্ভরশীল। এই উপজেলাটি পার্বত্য রাঙামাটির রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হিসেবে বিবেচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদি আন্দোলন শুরু হওয়ার পর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ১৯৮০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি পুনর্বাসন শুরু হলে যেসব এলাকায় সবচে বেশি বাঙালীকে পুনর্বাসন করা হয়েছে তার মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ লংগদু। বিলুপ্ত গেরিলা সংগঠন শান্তিবাহিনীর আক্রমনে সবচে বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এই উপজেলাতেই। ১৯৮৯ সালে জনপ্রিয় উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রশীদকে হত্যার পর সাম্প্রদায়িক জিঘাংসায় এই উপজেলায় বেশ কয়েকটি পাহাড়ী গ্রামে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দেশান্তরিত হয়ে প্রতিবেশি ভারতে আশ্রয় নেয় হাজারো পাহাড়ী। পার্বত্য চুক্তির পর পাহাড়ীরা ফিরে আসে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। কিন্তু ২০১৭ সালের ২ মে যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন হত্যাকান্ডের জেরে আবারো পাহাড়ীদের গ্রামে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আলোচনায় আসে বাঙালী অধ্যুষিত এই উপজেলাটি।

বরাবরই বিএনপির ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত এই উপজেলাটি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে পুনর্বাসিত হওয়ায় কৃতজ্ঞতা কিংবা ভালোবাসার কারণেই দলটির প্রতি দুর্বলতা এখানকার মানুষের। ইউপি নির্বাচন কিংবা উপজেলা বা সংসদ নির্বাচন, সবসময়ই এই উপজেলা থেকে বেশি ভোট পেয়ে থাকেন বিএনপি’র প্রার্থীরা। ফলে প্রতিটি নির্বাচনেই এই উপজেলায় বেশি ভোট পায় ধানের শীষ। আওয়ামীলীগ প্রার্থী ১৯৯১ সালে এই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তিনি এই উপজেলায় পরাজিত হয়েছিলেন। এমনকি এরপরের ১৯৯৬ সালেও এমপি নির্বাচিত হওয়া এই নেতা লংগদুতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোট পাননি। ২০০১ সালে লংগদু থেকেই বিপুল পরিমাণ ভোট পেয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী মনিস্বপন দেওয়ান। কিন্তু ২০০৮ সালে দীপংকর আবার বিজয়ী হলেও বিজয়ী হতে পারেননি এখানে। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় এই উপজেলায় প্রথমবারের মতো বিজয়ী হয় নৌকার দীপংকর। কিন্তু সেবার মূলত: বিএনপি নির্বাচনে না থাকার কারণেই বিজয়ী হওয়া সম্ভব হয় আওয়ামীলীগের। যদিও এরপর অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হয় বিএনপির প্রার্থী তোফাজ্জল হোসেন। গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন পরিষদ গুলশাখালিতে চেয়ারম্যানও হয় দলটির জেলা সহসভাপতি আবু নাছির।
কিন্তু অবিশ^াস্য হলেও সত্য, ধানের শীষের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই উপজেলাতেই এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রেকর্ড ভোট পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে আওয়ামীলীগের নৌকা। বিএনপির ঘাঁটিতে পাওয়া বিশাল বিপুল ভোটই মূলত নৌকার জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মূলত: সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকেই এই উপজেলায় শুরু হয় বিএনপির অবনমন। উপজেলার ৭ টি ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টিতেই পরাজিত হয় দলটি। বিপরীতে ৫ ইউনিয়নে বিজয়ী হয় আওয়ামীলীগের প্রার্থীরা।

এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ২২ কেন্দ্রের ৫২ হাজার ১৪৬ ভোটের মধ্যে নৌকার প্রাপ্ত ভোট ৩৪ হাজার ৮৪২,যা মোট ভোটের ৬৭ শতাংশ। বিপরীতে নিজেদের হারিয়ে ফেলা এই ঘাঁটিতে ধানের শীষ প্রতীকের ভোট কমে হয়েছে ৪ হাজার ৫০৭,যা মোট ভোটের মাত্র ৯ শতাংশ। আর আরেক প্রার্থী জনসংহতির ঊষাতন তালুকদার সিংহ প্রতীকে পেয়েছেন ৪ হাজার ২৯৮। অথচ এই উপজেলাতেই ২০০১ সালের নির্বাচনেও নৌকার ভোট ছিলো মাত্র ৩৬০০। ভোটের এই পরিবর্তন বা বাঁক বদলে বিস্মিত বিএনপির নেতারা। যদিও আওয়ামীলীগ নেতাদের দাবি, একসময় বিএনপি জামাত নেতাকর্মীরা আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে নানান মিথ্যাচার ও অপবাদ প্রচার করতো। এই কারণে পুনর্বাসিত বাঙালীদের কাছে আওয়ামীলীগকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হতো। কিন্তু গত দুই মেয়াদের শাসনামলে আওয়ামীলীগের উন্নয়ন ও কর্মকান্ডের মাধ্যমে সেই ভুল ভাঙ্গাতে সক্ষম হয়েছে।

পাশাপাশি লংগদু উপজেলার সর্বশেষ নির্বাচনের পর উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বিএনপি নেতা হাজী ফয়েজ আহমেদের নেতৃত্বে দলটির প্রায় তিন হাজার নেতাকর্মী আওয়ামীলীগে যোগ দেন।

এই প্রসঙ্গে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য ও লংগদু উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ জানে আলম বলেছেন, ‘ গত ১০ বছর এই উপজেলায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড হয়েছে এবং আমাদের নেতা বারবার এই উপজেলায় এসে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন। শুধু তাই নয়, একসময় বিএনপি-জামাত যেভাবে অপপ্রচার ও মিথ্যাচার করতো,সেটাই ভুল প্রমাণ করেছেন দাদা। একসময় প্রচার করা হতো,আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসলে বাঙালীদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে চলে যেতে হবে,এমন অপপ্রচারও আমরা মিথ্যা প্রমাণ করতে পেরেছি। পাশাপাশি সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দাদা’র শক্ত ও স্পষ্ট অবস্থান তাকে বাঙালী-পাহাড়ী সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। বিপরীতে ধানের শীষ ও জনসংহতির প্রার্থী দুজনেই সাবেক শান্তিবাহিনীর সদস্য,যে শান্তিবাহিনীর হাতে এই উপজেলায় অনেক নিরিহ বাঙালী মারা গেছেন,এইসব কারণে মানুষ পাহাড়ী-বাঙালী ঐক্যের প্রতীক জননেতা দীপংকর তালুকদারকেই বেছে নিয়েছেন।’

তবে আওয়ামীলীগের বক্তব্যের সাথে ভিন্নমত জানিয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, এই নির্বাচন প্রহসনের নির্বাচন। এই পাতানো নির্বাচনের ফলাফল দিয়ে এটা মূল্যায়ণ করা যাবে না যে,বিএনপির ঘাঁটি শেষ হয়ে গেছে। আমাদের নেতাকর্মীদের তো ভোটকেন্দ্রেই যেতে দেয়নি,হামলা মামলার মাধ্যমে তাদের বাড়ীঘর ছাড়া করেছে। এই কারণেই এই ফলাফল,এটা বাস্তব চিত্র নয়। ভবিষ্যতে কোন অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এটা আবারো প্রমাণিত হবে যে,লংগদু বিএনপি’রই ঘাঁটি।’

Micro Web Technology

আরো দেখুন

চুরির মামলা করে নিজেই ফেঁসে গেলেন বাদী !

রাঙামাটিতে মিথ্যা চুরির মামলায় বাদীর কারাদ- দিয়েছেন আদালত। জেলার কাউখালী থানার আর্দশগ্রাম নিবাসী আবুল কাসেমের …

Leave a Reply