ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

ধসের কারণ খুঁজতে বিশেষজ্ঞরা পাহাড়ে

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক পাহাড় ধসের কারণ ও করণীয় নির্ণয়ে গঠিত কমিটি মঙ্গলবার রাঙামাটি সফরে এসেছেন।

এদিন সন্ধ্যায় তারা রাঙামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি,সুশীল সমাজের প্রতিনিধি,সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তা ও প্রথাগত নেতাদের সাথে এক মতবিনিয়ম সভায় মিলিত হন।

তারা সকলের সাথে আলোচনা করে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যান্য জেলায় পাহাড় ধসের কারণ ও এর সম্ভাব্য প্রতিকার সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা করেন।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ত্রান ও দুর্যোগ মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব সত্যব্রত সাহার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড,জেলা প্রশাসন,ফায়ার সার্ভিস,সড়ক ও জনপদ বিভাগ,সেনাবাহিনী,পুলিশসহ দুর্যোগকাজে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা বক্তব্য রাখেন।

মতবিনিময় সভায় ৫ জেলায় ভূমিধসের কারণ নির্ণয় ও করণীয় নিধারণে গঠিত কমিটি আহ্বায়ক অতিরিক্ত সচিব সত্যব্রত সাহা বলেন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে আমরা পাহাড় ধস প্রসঙ্গে সমাধান করার চেষ্টা করবো। আমরা দেখতে পাচ্ছি সড়ক যোগাযোগের কাজ খুবই দ্রুততার সাথে করা হচ্ছে। আমরা বারবার এই অঞ্চলে আসবো এবং এই পাহাড় ধস রোধে করণীয় সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া চেষ্টা করবো। তিনি আরো বলেন, আমাদের ২৭ সদস্য বিশিষ্ট যে কমিটি গঠন করা হয়েছে এতে বিভিন্ন সেক্টরের লোক রয়েছেন। আমরা পাহাড় ধসের কারণ এবং এই প্রসঙ্গে কি কি করণীয় তা জানতে চেষ্টা করবো, সেই অনুযায়ি প্রতিবেদন তৈরি করবো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমি আসার সময় দেখতে পেয়েছি, যে সকল পাহাড়ে গাছপালা নেই বা গাছপালা কম সে সকল পাহাড়ই বেশি ধস হয়েছে। আমরা চেষ্টা করবো সকলের সহযোগিতায় এই পার্বত্য এলাকাকে আগামী প্রজন্মের জন্য বসবাসযোগ্য ভূমি নির্মাণ করে যেতে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান তরুণ কান্তি ঘোষ বলেন, পাহাড়ের মাটি হচ্ছে লাল মাটি। যে মাটি খুবই দুর্বল, যাকে বলা যেতে পারে প্রেমময় মাটি। যে মাটি অল্প পানিতেই কাঁদা হয়ে যায় এবং মানুষের কাছে লেগে থাকার চেষ্টা করে। এই মাটি রক্ষার জন্য আমাদেরকে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা বলেন, বিভিন্ন জন বিভিন্ন ভাবে পাহাড় ধস প্রসঙ্গে মন্তব্য করছে। কেউ কেউ বলছে জুম চাষ আবার কেউ বলছে জোত পারমিট করার কারণে এমনটি হয়েছে। বর্তমানে রাঙামাটিতে আগের মত আর জুম চাষ হয় না। এখন শতকরা পাঁচ ভাগ জুম চাষ হচ্ছে এছাড়া জোত পারমিট হচ্ছে পার্বত্য এলাকার জন্য অর্থনৈতিক একটি বড় উৎস। এই জোত পারমিট বন্ধ করা হলে অর্থনীতির উপর চাপ পড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

রাস্তার পাশে পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন নির্মাণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, রাঙামাটির বিভিন্ন সড়কের পাশে পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন নির্মাণ করা হয় নি। একটু সতর্ক থাকতে হবে, এখন যেনো এই সড়কের পাশে পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন নির্মাণ করা হয়।

স্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাঙামাটিতে কোন স্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র না হওয়ায় সকলে এখন বিভিন্ন স্কুল, কলেজে গিয়ে উঠেছে। বর্তমানে সেই স্কুল কলেজ খোলায় শিক্ষার্থীদের পড়া লেখা করতে অসুবিধা হচ্ছে। তাই রাঙামাটিতে দুইয়ের অধিক স্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র খোলার জন্য আহ্বান জানান তিনি।

মত বিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান বলেন, রাঙামাটিতে এই দুর্যোগকে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর ব্যবসায়িরা দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু আমরা সকলের প্রচেষ্টায় খুবই দ্রুততার সাথে এটি নিয়ন্ত্রন করে সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছি।

তিনি আরো বলেন, রাঙামাটিতে বিদ্যুৎ বিভাগ দ্রুততার সাথে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার ফলে আমাদের জন্য অনেক বেশি উপকার হয়েছে। তিনি মত বিনিময় থেকে রাঙামাটির প্রতিটি বিভাগ ও সংস্থাকে দুর্যোগ মোকাবেলায় সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: এমদাদ হোসেন বলেন, সড়কের পাশ ঘেষে ঘর নির্মাণ এবং ২৪ ঘন্টায় ৩৪৫ মিলিমিটার রেকর্ড সংখ্যক যে বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা প্রকটতা আমরা সকলেই উপলদ্ধি করতে পেরেছি। ১৪৫ টি স্থানে পাহাড়ধসের ফলে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ১১৩ স্থানে সড়কের কাঠামো নষ্ট হয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে,৩ টি স্থানে সড়ক সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। আমি এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সার্ভে করার অনুরোধ করছি।

রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেন, রাঙামাটিতে বেপরোয়াভাবে পুরানো সড়কগুলোকে মেরামত করা হয়। এই সড়কগুলো যেনো টেকসই হয় সেই জন্য দেশী বা বিদেশী দক্ষতা সম্পূর্ণ লোকবল দিয়ে সুপরিকল্পনা মতে সড়ক উন্নয়নের কাজ করতে হবে।

রাঙামাটি সদর উপজেলার চেয়ারম্যান অরুন কান্তি চাকমা বলেন, শুধু মাত্র পৌর এলাকায় নয় এই পাহাড় ধস সদর উপজেলা সহ রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলায় সংগঠিত হয়েছে। পাহাড় ধসের বিভিন্ন কারণ হতে পারে বলে তিনি মত বিনিময় সভায় মন্তব্য করেন।

তিনি আরো বলেন, পাহাড়ে যারা অবৈধ ভাবে বসবাস করছে তাদের জীবনের ঝুঁকি এড়াতে এদেরকে উচ্ছেদ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, যারা পাহাড় ধস দুর্ঘটনায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ তাদের তালিকা তৈরি করে এদেরকে সহযোগিতা করতে হবে।

রাঙামাটি ফায়ার বিগ্রেডের উপ-পরিচালক মোঃ গোলাম মোস্তফা বলেন, যে সকল এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ, সে সকল এলাকা থেকে জনসাধারণকে উচ্ছেদ করার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। তিনি আরো বলেন, আমরা ৬০ জনের একটি টিম করে মোট ১২০ জন লোক কাজ করেছি। আমরা সর্বচ্চ ১০ ফিট নীচ পর্যন্ত কাজ করতে সক্ষম হয়েছি।

তিনি আরো বলেন, রাঙামাটির ফায়ার বিগ্রেড হচ্ছে তৃতীয় শ্রেণীর ফায়ার বিগ্রেড। এটিকে উন্নত করে প্রথম শ্রেণীর করতে হবে। তাহলে সরঞ্জাম ও লোকবল বাড়বে। এতে করে আগামীতে যে কোন দূর্যোগ মোকাবেলায় সম্ভব হবে।

মত বিনিময় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সুনিল কান্তি দে, চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি বেলায়ত হোসেন, ডা: একে দেওয়ান, বিটিভির সংবাদদাতা মোস্তফা কামাল।

মত বিনিময় সভায় পার্বত্য মন্ত্রনালয়,প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিনিধিসহ সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ২৭ সদস্যের কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

ি কমেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − fifteen =

Back to top button