খোলা জানালালিড

তোমরা কে-মনে পাহাড়ি মানু?

ঞ্যোহ্লা মং
ছেলেবেলায় দেখেছি আমার দাদা-দাদীদের কাছে স্থানীয় পরিচিত কিছু বাঙালী ক্রেতা কাঁঠাল, কলা কিনতে আসতো। কাঁঠাল, কলা, মুরগী, হলুদ, আদা, জাম্বুরা বাদে পাহাড়ি ফসলের পাহাড়ি ক্রেতাই ছিল বেশি। বাজার থেকে পাহাড়ি মুরগী পাহাড়িদের কিনতে হতো না। প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে কমবেশি মুরগী পালন করতো। দাদা-দাদীর কাছে বাঙালি ক্রেতারা কাঁঠাল কিনতে আসতো নৌকা নিয়ে। প্রতি কাঁঠালের দাম ২-৫টাকার বেশি বিক্রি হতে দেখিনি। গাছে কাঁঠালের অবস্থা দেখে ১০ কিংবা ২০টা কিনবে বলে দাম মিটিয়ে নিজেরা বাগানে ঢুকে বাছাই করে সংগ্রহ করতো। নৌকা ছাড়ার শব্দ পেলে দেখতে গিয়ে দাদা-দাদীরা প্রায়ই বলে উঠতো “ওই বাঙলি, কাং-তল লইব কইয়ে ১০গুয়া তোমরা এক নুকা লইয়ারে যাইয়ে গই, তোমরা কে-মনে বাঙলি?” এমন হতাশার সুর নিয়ে প্রায় বলতে শুনা গেলেও, বিকল্প ক্রেতা না থাকায় তাদের কাছে বারে বারে দাদা-দাদীকে বিক্রি করতে হতো। যে কটা টাকা পায় তাতেই লাভ। কলা ছড়া ১০টাকা-২০টাকায়ও নিতে চায়তো না। বাজারে নিয়ে গেলে ক্রেতা প্রথমবার যে দাম দিবে, দিয়ে দিতে হতো, পরের বার আসবে শুধু আগের দেয়া দামের চাইতে কমে চাইতে।
পাহাড়ে সেই চিত্রের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় বেশ দাম পাচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে বলে এখনো শুনা যায়। সম্প্রতি ফেসবুকে এক বলা বিক্রেতাকে ক্ষেপে গিয়ে কলা ছড়া ভেঙ্গে ফেলে চলে যেতে দেখা গেছে। বান্দরবানে কিছু এলাকায় এখনো ৩০/৪০ টাকায় কলা ছড়া বিক্রি হয় বলে দুইএকজন ছাত্রের মুখে শুনেছি। রাঙ্গামাটি আর বান্দরবানে আনারস মৌসুমে পানির দরে পাওয়ার আনন্দে শিক্ষিত ক্রেতাদের অনেককে ফেসবুকে পোস্ট করতে দেখা যায়। খাগড়াছড়িতে আমের মৌসুমে কেজিতে ২০ টাকায়ও পাওয়া যায়। প্রকৃত চাষীদের বঞ্চনার চিত্র সর্বত্র একই রকম। মধ্যসত্ত্বভোগী, ব্যবসায়িদেরই যত লাভ। রাঙ্গামাটি থেকে আনারস কাঁঠাল বিক্রি করে, গাছ ব্যবসা করে কত শত ব্যবসায়ি ঢাকা শহরে প্রাসাদ দালান গড়ে তুলেছে, সে হিসাব করতে গেলে আমাদের অবাকই করবে।
খাগড়াছড়ির এক নিকট আত্নীয়ের বাসায় দেখেছি বাজার থেকে কেনা টমেটো চার মাস ধরে অবিকল টিকে আছে। পচার কিংবা নষ্ট হওয়ার লক্ষণ নেই। আত্নীয়টি সন্তানদের জন্য স্থানীয় বাজার থেকে দুধ কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি নাকি বেশ কয়েকবার দুধে রাবার পেয়েছেন। দুধ গরমে দিলে নাকি রাবারে পরিণত হয়। দুধে রাবার মেশানোর কথা বিভিন্ন সময়ে শুনেছি। এখন নিকট আত্নীয়ের কাছ থেকে শুনে আমিও বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। বছর খানিক আগে একটি স্থানীয় এনজিও’র নির্বাহী পরিচালককে ফেসবুকে ভিডিও করে দুধে রাবার পাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানাতে দেখেছি। পার্বত্য চট্টগ্রামে রাবার চাষের শুরুর দিকে কৃষকদের আকৃষ্ট করতে উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের বলতে শুনেছি “রাবার গাছ হচ্ছে গাভীর মতো। গাছটি প্রতিদিন দুধ দিবে”। এখন রাবার গাছ সত্যি সত্যি গাভীতে পরিণত হয়েছে।
ছেলেবেলায় ঘরের মুরগী বাজারে নিয়ে গেলে স্থানীয় বাঙালি কিংবা চাকরিজীবিদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। একটা সময় ছিল, জোর করে, ভয় দেখিয়ে নিয়ে যেতো। ঘরের মুরগী ধরে দিতে হতো। এখন সেদিন নেই সত্য, তবে দেশি মুরগী আশংকাজনক হারে কমেছে। ধর্ম পালনের নামে বিরাট অংশ পশু-পাখি পালন কমিয়ে দিয়েছে। বাজারে গেলে মরা মাছ, মরা মাংস ছাড়া, না কেনার দলের সংখ্যা দিনকে দিন ভারী হচ্ছে। অন্যদিকে শহর সমাজের ন্যায় বিভিন্ন মুরগীকে দেশি মুরগী বলে চালিয়ে দেয়াও রপ্ত করেছে। ঢাকায় নিয়ে যাবো বলে ৬৫০টাকা কেজিতে ২টি মুরগী মধুপুর বাজার থেকে কিনেছিলাম। রান্না করে খেতে গিয়ে হতাশ হতে হলো। আমাদের মহামূল্যবান মূল্যবোধগুলো সব হারিয়ে যাচ্ছে। যে মূল্যবোধের কারণে আমরা পাহাড়ি, আদিবাসী সে সব সম্পদগুলো হারিয়ে ফেলছি দ্রুততার সাথে। একদিকে পূবপুরুষের জমিজমা হাতছাড়া করছি, অন্যদিকে ভিতরে থাকা আসল মানুষ, আসল পরিচয়গুলোও বিক্রি করে চলেছি। শহরের সাথে পাহাড়ের মূল্যবোধ মিলেমিশে একাকার করতে চলেছি।
একই বাজার থেকে ছড়ার লম্বা শামুক কিনেছিলাম। না কাটা শামুক ১৫০ টাকা। আর কাটা শামুক হলে ২০০ টাকা। কাটা শামুক কিনতে গিয়ে এমনভাবে কেটে দিয়েছে যা পূর্বে কখনো দেখিনি। নাম মাত্র কেটে দিয়ে আমায় চালান দিয়ে দিয়েছে। ঘরে এনে খুলতে গিয়ে রীতিমত অবাক করেছে। খাওয়ার উপযোগী করতে আমাকে আবার কাটতে হয়েছে।
শহর বন্দরের মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা, কূট-কৌশলগুলো পাহাড়ের বেচাবিক্রিতে ঢুকে পড়েছে। এমন ছোট ছোট ঘটনা সব, পাহাড়ের পাহাড়ি মানুষের স্বতন্ত্র পরিচয়, বিশ্বাসগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
আমাদের সুন্দর মন, সুন্দর চিন্তা, সুন্দর ভাবনা, ভাল ব্যবহারগুলোকে ধরে রাখার চেষ্টা থাকা দরকার। আমাদের ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধগুলোকে নব্য তরুণ ছোটখাট ব্যবসায়িদের দ্বারা নষ্ট করতে দেয়া যেতে পারে না। আমাদের আদিবাসী মূল্যবোধ, বিশ্বাসগুলোকে আমাদের কাজের, ব্যবসায় লাভজনক অংশে পরিণত করার চিন্তা থাকা দরকার। ব্যবসায় জনপ্রিয়তা পেতে আমাদের মূল্যবোধগুলোকে ধরে রাখা আবশ্যক। পানখাইয়া পাড়াতে দেখেছি, প্রতিদিন শত শত কেজি আম নষ্ট বলে বটতলায় ফেলে দেয়া হচ্ছে। তারা আম ব্যবসাকে ধরে রাখতে বেছে বেছে আম বিক্রি করছে। সেরা আমগুলো দূরে চালান দিচ্ছে। অন্যদিকে মধুপুর বাজারে পাহাড়ি মানুষ পাহাড়ের মানুষকে ঠকিয়ে ব্যবসায় লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা তাদের নিরুৎসাহিত করতে পারি।
ঢাকা শহরে চাষের কই, ছোট সাইজের হলে কয়েক টুকরো কচুরিপানা ঢেকে দেশী কই মাছে পরিণত করা হয়। পুকুরের মাছকে নদীর মাছ বানানো কোন ব্যাপারই নয়। আর সুপারশপে নানা জাতের সামুদ্রিক মাছ ফ্রিজ করে রাখা প্যাকেটের উপরের অংশে বড় সাইজের দেখে কিনতে গেলে নিচে এমন ছোট ছোট সাইজের মাছ পাওয়া যাবে, যা আপনাকে কষ্ট করে আয় করা টাকা দিয়ে কেনা হলে খুব হতাশই করবে। শহরের মানুষগুলো এইসব নিয়ে কেউ চিন্তা করে না। যা পাচ্ছে তাই খাচ্ছে। ফুটপাথের ধুলাবালিতে বসে রাস্তায় তৈরি করা খাবার শিক্ষিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা খেতে খেতে প্রেম করছে। কিভাবে বানাচ্ছে, কি দিয়ে বানাচ্ছে, কোন পরিবেশে বানাচ্ছে কেউ ভাবে না। আমাদের রুচিবোধে হাইজিন প্র্যাকটিস ধারণাটি নেই বলে নিম্ন শ্রেণির ব্যবসায়িরা রাতারাতি পয়সা কামিয়ে বড়লোক হচ্ছে। এই রোগটি আমাদের পাহাড়েও ধরেছে। ধর্মের নামে কেউ প্রশ্ন করবে না। বললে বলবে “যে করবে সেই ভুগবে”, কিন্তু রাবার মেশানো দুধটি যদি শিশুরা খায় সে শিশুটির কি হবে আমরা কেউ ভাবছি না। কবে ধর্ম তাদের শাস্তি দিবে, আর কবে আমাদের নিরাপদ খাবার হবে কে জানে।
দাদুদের সময়ে স্থানীয় ব্যবসায়িরা পাহাড়িদের হাবাগোবা ভেবে ঠকাতো। আমাদের সময়ে শহর থেকে কিনতে আসা ব্যবসায়িরা নানা পন্থায় ঠকিয়েছে। এখন স্থানীয়দের মধ্য থেকে যারা অল্পস্বল্প ব্যবসা করা শুরু করেছে তারাও ঠকাতে শুরু করেছে নিজেদের লোকজনকে (আমি কাউকে ঠকানোর বিপক্ষে)। ব্যবসা মানে কি ঠকানো? পাহাড়ের লোকজন অনেক আগে থেকে ব্যবসা শুরু করেছে ঠিকই, বড় অর্থে সফলতা নেই। সফলতা না পাওয়ার সে অনেক কারণ আছে তা আমরা জানি। চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে আনারস ঢেলে চলে আসার নানা গল্প প্রচলন আছে। কেউ সেই অর্থে কেউ টিকতে পারেননি, নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারেননি। যা পেরেছি তাহলো ‘আদিবাসী মূল্যবোধ’। এই মূল্যবোধের জোরে ক্রেতারা কিনতে চায়। পর্যটকরাও কিনেন। এটিই আমাদের একমাত্র ‘ব্র্যান্ডিং’। এখন সেই ব্র্যান্ডেও স্থানীয় বাজারের টুকটাক ব্যবসা করিয়েরা নষ্ট করতে শুরু করেছে। কাঁচি দিয়ে মূল্যবোধকে কাটতে শুরু করেছে।
টুকটাক ব্যবসা করতে গিয়ে নিজেদের লোকজনও বিশ্বাসে পেরেক লাগাতে শুরু করেছে। অনেকের মনে থাকতে পারে, শিক্ষকরাও আমাদের কম ঠকাননি। পাহাড়ে প্রথম প্রথম উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হলে এ্যাকশন এইড এর সহায়তায় ‘বর্গা শিক্ষক’ নিয়ে প্রচুর কাজ হয়েছিল। এখন ‘বর্গা শিক্ষক’ হয়তো সেভাবে নেই, তবে স্কুল ছাত্রছাত্রীদের সন্তানের যতœ দিয়ে শিক্ষা দানকারী শিক্ষকের যথেষ্ট অভাব আছে। পাহাড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্কুল চলে, চলে না এমন অনেক পাওয়া যাবে। আমরা আসলে কাদের ঠকাচ্ছি? আমাকে ঠকিয়ে, আমাদের ঠকিয়ে আপনিও নিজেকে ‘ঠেগায়’ নিয়ে যাচ্ছেন নাতো?
খাগড়াছড়ি মাছের বাজারে জীবিত মাছ বিক্রেতার কাছে গেলে জিজ্ঞেস করে, ‘খাওয়ার জন্য নাকি ছেড়ে দেয়ার জন্য?’ সে জানে ছেড়ে দেয়ার জন্য বা ধর্মের জন্য কিনলে যত দাম চাওয়া হবে কেউ দরদাম করবে না। বলা আছে ‘ধর্মের জন্য দরদাম করতে নেই’। বিক্রেতাও সে মন্ত্র বুঝে গেছে। ফলে তাকে থামায় কে?
পাহাড়ে এ্যাক্টরের অভাব নেই। পরিচিত একজন মৌজা হেডম্যানকে দেখেছি, যিনি ব্রীজের নিচে ‘আসর’ জমাতেই বেশি আগ্রহী। আমাদের অনেকে পদ-পদবি ব্যবহার করে পাহাড়কে, জুম চাষীদেরকে নানা প্রক্রিয়ায় ঠকিয়ে চলেছি। শহরের মানুষজন নানা পন্থায় পয়সা বানাচ্ছে বলে আমাদেরকেও কেন তাদের মতো হতে হবে? তাদের মতো হতে গেলে আমাদের বলে আর কি কিছুই থাকে? অন্যদের অনুসরণ করতে গেলে আমাদের স্বতন্ত্র পরিচয় বলে কি কিছু থাকবে? দাদ-দাদীদের মুখে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় বাঙালি ব্যবসায়িদের চালাকি দেখে হতাশা নিয়ে বলতে শুনেছি —-‘তোমরা কেমনে বাঙলী’? এখন চারিদিকের নানা চিত্র দেখে দাদীদের সুরে বলতে ইচ্ছে করে —তোমরা কি গরিত কথা, কি গরিয়ে ওয়েই –তোমরা কে-মনে পাহাড়ি মানু’?
লেখক : উন্নয়ন গবেষক ও লেখক, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমাজ সংস্কৃতি অর্থনীতি ও জীবনাচারণ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম নিয়মিত লেখালেখি করেন।
( লেখায় প্রকাশিত সকল ভাবনার দায় একান্তই লেখকের)

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 5 =

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button