আলোকিত পাহাড়করোনাভাইরাস আপডেটব্রেকিংরাঙামাটিলিড

তিন বন্ধুর ‘অবাক ভালোবাসা’

মিনার-কামাল-আলম। যেনো গল্পের মতই জীবন তাদের। সেই ছোটবেলা থেকেই একসাথে মাটিতে গড়াগড়ি,রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে পুড়ে কিংবা ভিজে বড় হওয়া,একই পাড়ার বাসিন্দা। বড় হতে হতে বদলেছে বহুকিছুই, যে যার নিজস্ব সংসারে ঢুকেছেন সেই কবে,পেশাগত জীবনও যার যার আলাদা আলাদা। কিন্তু অকৃত্রিম বন্ধুতার টান যেনো হৃদয়ে হৃদয় গেঁথে জন্ম দিয়েছে প্রগাঢ় এক ভালোবাসারও। তাইতো এক বন্ধুর স্বপ্ন ছুঁয়ে যায় বাকি দুজনকেও।

রাঙামাটি শহরের এক প্রান্তের বাসিন্দা তারা। শহরের বিজিবি রোডের এই তিন তরুণ মেতে আছে এক অবাক ভালোবাসায়। কোভিড-১৯ এর দৈবদুর্বিপাকে মানুষের জীবন যখন চ্যালেঞ্জের মুখে,পৃথিবীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত মানুষ যখন ছুটছে বাঁচার তাগিদে,এক অজানা-অচিন ভাইরাস যখন বিপন্ন করে দিয়েছে পুরো মানব সভ্যতাকে,সেই সময় পার্বত্য এক ছোট্ট শহর রাঙামাটিতে দিনের পর দিন শহরের ছিন্নমূল মানুষ ও পাগলদের একবেলা অন্নের সংস্থান করছে এই তিন বন্ধু দিনের পর দিন। গত ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই অবাক ভালোবাসা চলছে এখনো,চলবে পুরো করোনাকাল !

শহরের পরিচিত সংগঠন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ স্মৃতি সংসদের সাধারন সম্পাদক মিনার। একইসাথে রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থারও নির্বাচিত সদস্য। ব্যক্তিগত জীবনে ব্যবসায়ি মিনারে মাথাতেই প্রথম ভাবনাটা আসে যে,শহরের সব হোটেল মোটেলগুলো তো বন্ধ ! এই বিপন্ন নাজুক সময়ে রাস্তায় ঘুরেবেড়ানো মানুষগুলো,যাদের জীবন এইসব প্রতিষ্ঠানের উপরই নির্ভরশীল,তারা কোথায় খাবে ! এই ভাবটানাই পেয়ে বসে এই তরুনকে। ভাবনাটা শেয়ার করলে বন্ধু কামাল ও আলমের সাথে। বন্ধুর কথায় কি আর দ্বিমত করে আশৈশবের বন্ধু ! যেই কথা সেই কাজ। শুরু হয়ে গেলো এক অবাক যুদ্ধ! ১৫ এপ্রিল থেকে প্রতিদিন নিজেদের বাসায় রান্না করা খাবার পৌঁছে দেন ভবঘুরেদের হাতে। কখনো খিচুরি ডিম,কখনো মুরগি বা মাছ,সাথে সাদাভাত। প্রতিদিন প্রায় ৩০ জনের খাবার। খরচও প্রায় ৮০০ টাকা। ভালোবেসে কেউ কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে সহযোগিতাও করেন। তবে মূলত: অর্থায়নটা নিজেদেরই।

‘কিন্তু কেনো ?’-এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত মিনার জানালেন-কোন কারণ নেই,শুধুই ভালোবাসা। চিরকালই চেয়েছি মানুষের পাশে থাকতে,এখানেও ঠিক সেই কারণেই। কি যে অদ্ভূদ ভালোলাগা কাজ করে বোঝাতে পারব না। খাবারের পর ওদের তৃপ্ত মুখের হাসিটিই হয়তো সবচে বড় অর্জন আমাদের।’
শহুরে ভবঘুরেদের খাওয়া খাওয়াতে অন্য এক জীবনের অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন তারা তিনজন। তাইতো সম্প্রতি শহরের রিজার্ভবাজারে আগুণে পুড়ে যাওয়া প্রতিটি পরিবারকেও ইতোমধ্যেই একবেলা রান্না করে খাইয়েছেন। ইচ্ছে আছে তাদের জন্য আরো কিছু করার।

মিনার বললেন,তিন বন্ধুর স্বপ্নের কথা। জানালেন-আমাদের ভবঘুরে ও পাগলদের জন্য এই পাগলামি দেখে,আশপাশের লোকজন আমাদেরকেই পাগল ডাকা শুরু করেছে ! আমরা এতো একটুও লজ্জিত নই। বরং এই ‘পাগল’ ডাকটিকে ভালোই লাগছে, মনে হয় বেলাশেষে কাজটি হয়তো সবারই মন ও হৃদয় জয় করে নিয়েছে। তাই আমরা ভাবছি,করোনাকাল শেষে এই কার্যক্রমকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিব। আমরা তিন বন্ধু মিলে গঠন করব একটি ‘পাগল ফাউন্ডেশন’,যাদের কাজ হবে পথের মানুষদের জন্য কিছু করা,তাদের পাশে থাকা,তাদের জন্য কথা বলা।’

মিনার-কামাল কিংবা আলমদের স্বপ্ন কতুটুক সফল হবে কিংবা আদৌ হবে কিনা আমরাও জানিনা। কিন্তু নিজেদের তুমুল তারুণ্যে ,জীবনের শ্রেষ্ঠতম কিছু দিন থেকে যেভাবে নি:স্বার্থভাবে কিছু দিন,কিছু সময় উৎসর্গ করে দিয়েছে এই তিন তরুণ,সেটাই হয়তো ইতিহাস হবে একদিন। ঘুনে ধরা মনন আর পচাগলা স্বার্থপর পৃথিবীতে আলো ছড়াক এইসব তরুণ,আরো বহুদিন…

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button
Close