আলোকিত পাহাড়

তিনি অনাথের মহারাজ সনাতন ঋষি

রাজস্থলির বাঙ্গালহালিয়া ঋষি আশ্রম

ঝুলন দত্ত, কাপ্তাই
১৯৮১ সাল,  ৪০ বছর আগের সেই সময়টাতে একটু ফিরে যেতে হবে। রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার বাঙ্গালহালিয়া এলাকার যৌথ খামার এলাকায় এক সৌম্য, সুদর্শন, জ্যোতির্ময় সাধু আসেন একটি আশ্রম করার মনোবাসনা নিয়ে, যেখানে বসে তিনি নিরবে নিভৃতে ঈশ্বরের ধ্যান করবেন, স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করবেন এবং গীতা ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিবেন মানুষের মাঝে। তাই ঈশ্বর তার মনোবাসনা পূরণ করলেন। সেখানে তিনি একটা জায়গা কিনেন, সেইসময় সেই জায়গাটি ছিলো বন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ,  নানা রকম পশু পাখির আবাসস্থল ছিলো এই জায়গায়,  সন্ধ্যা নামলেই বন্য হাতির পাল এই জায়গায় এসে অবস্থান করতো, সেই রকম একটি বিপদ সংকুল জায়গায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাঙ্গালহালিয়া সনাতন ঋষি আশ্রম।
অবশ্য জায়গা কিনার আরোও ৪ বছর পর তিনি সামান্য একটি বেড়ার ঘর দিয়ে তৈরি করেন এই ঋষি আশ্রম। বর্তমানে সনাতনি সমাজ সহ নানা বর্ণের গোত্রের মানুষের কাছে একটি তীর্থ স্থানে পরিণত হয়েছে এই সনাতন ঋষি আশ্রম। কয়েক একর জায়গা জুড়ে এই আশ্রমের পরিধি, যে কেউ আসলে প্রকৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে নিয়ে যায় অন্য একটি জগতে। বর্তমানে মূল মন্দিরের পাশাপাশি আছে একটি প্রার্থনা মন্দির, আছে অনাথদের থাকার জন্য ঘর। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা এখানে কাসঁর ঘন্টা বাজে, প্রার্থনা হয়, গায়ত্রী মায়ের পুজা হয়, অনাথদেরকে গীতা, চন্ডী এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান করা হয়। বর্তমানে এখানে ১৩৭ জন অনাথ ছেলে মেয়ে আছে, যারা বেশীরভাগই ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের। তাদের ভরনপোষণ, স্থানীয় স্কুলে ভর্তি সহ যাবতীয় দেখভাল করেন সনাতন ঋষি আশ্রমের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ সনাতন ঋষি মহারাজ, যিনি সকলের কাছে ঋষি বাবা নামে সু- পরিচিত।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ চৌধুরী জানান, সনাতন ঋষি মহারাজ একজন সাধক পুরুষ, যিনি বিগত ৫ দশকের অধিক সময় ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকি ভারতবর্ষেও গীতা আলো এবং মানবতার জয়গান মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে আসছেন। যিনি রচনা করেছেন অসংখ্য ধর্মগ্রন্হ, রচনা করেছেন বহু  বৈদিক সংগীত। যাঁর হাজার হাজার ভক্ত শীর্ষ্য রয়েছে বাংলাদেশ সহ ভারতবর্ষে।  যিনি একজন মানবতার পুজারি হিসাবে তাঁর কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করে আসছেন।
কে এই সনাতন ঋষি মহারাজ?  
চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলার বারাসাত গ্রামে পিতা মাখন লাল দেবনাথ এবং মাতা আরতি বালা দেবীর গর্ভে জন্মগ্রহন করেন এই সনাতন ঋষি মহারাজ,  যার পূর্ব নাম ছিলো স্বপন কান্তি দেবনাথ। তাঁর দাদু ছিলেন পূর্ণ চন্দ্র দেবনাথ এবং আর এক দাদু ছিলেন চট্টগ্রামের সাধক পুরুষ বংশী বাবা। এই বংশী বাবাই ছিলেন তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু।
শ্রীমৎ সনাতন ঋষি মহারাজ জানান, পাকিস্তান আমলে সেই ছোটবেলায় তিনি প্রথম বোয়ালখালী উপজেলার কদুরখীল গোমদন্ডী গ্রামে হরিবাবুর আশ্রমে প্রথম গীতাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন এবং প্রথম স্হান লাভ করেন।  সেইসময় শ্রীমৎ স্বামী বিশ্বেশরান্দ মহারাজের কাছ থেকে পুরস্কার নেন এবং তাঁর হাত ধরে গীতা শিক্ষা শুরু করেন। পরবর্তীতে নিজ পৈত্রিক বাড়ীর হরি মন্দিরে ভারত হতে আগত যোগী পুরুষ শ্রদ্ধানন্দ মহারাজ এর কাছ দীক্ষা নেন। তিনি আরোও জানান, সেই সময় ভারত হতে আগত অজ্ঞাতনামা আরোও ৩ জন সাধু কদুরখীল গোমদন্ডী গ্রামে এসেছিলেন, তিনি তাদের কাছে সাধন মন্ত্রে, গীতা, বেদ এবং ঔপনিষদ এর শিক্ষা লাভ করেন। উল্ল্যেখ যে, কদুরখীল গোমদন্ডী গ্রামে ঋষি মহারাজ তাঁর মামার বাড়ীতে থেকে  পড়ালেখা করেছেন।
সাধক পুরুষ ঋষি মহারাজ প্রাচীন সনাতনী আর্য ঋষিদের বৈদিক  কর্মকান্ড জানার মনোবাসনায় স্বাধীনতার পর ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষার মাত্র ৪ টি বিষয় অংশ নিয়ে ভারত বর্ষে চলে যান। সেখানে তিনি বিভিন্ন প্রদেশে বহু তীর্থ স্থান পরিভ্রমন করেন, বহু যোগী সাধু সন্ন্যাসীদের সান্নিধ্যে আসেন এবং আহরণ করেন গীতা, বেদ, ভাগবতীয় রসামৃত সহ প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র।
পরবর্তীতে তিনি ১৯৮১ সালে প্রথমে রাজস্হলী বাজারে আসেন, সেখানে অমল সাধু নামে একজন সাধু তাঁকে দিয়ে প্রথম গীতাপাঠ করান। এরপর তিনি বাঙ্গালহালিয়া যৌথ খামার এলাকায় এই আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন। যেটা আশ্রম পাড়া নামা পরিচিত। বর্তমানে এই এলাকায় জ্যোতিশ্বর বেদান্ত মঠ, ওমঁকারেশ্বর বেদান্ত মঠ, জগন্নাথ আশ্রম এবং সত্য নারায়ণ আশ্রম রয়েছে।
সাধক পুরুষ ঋষি বাবা সম্পর্কে  বাঙ্গালহালিয়া জ্যোতিশ্বর বেদান্ত মঠের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ স্বামী অভেদানন্দ মহারাজ জানান, আমাদের প্রাচীন যুগের ঋষিরা যেভাবে দরিদ্র দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতেন, ঋষিদের সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করে সনাতন ঋষি মহারাজ মানব কল্যানে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন, তিনি সমাজকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করছেন।
ঋষি আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সমাজ সেবক বিমল দে জানান, তিনি যখন এই আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেছেন তখন এটা ঘনজঙ্গলে পরিণত ছিলো, হাতির উপদ্রব ছিলো। কিন্ত ঋষি মহারাজ সকল ভয়কে দূরে ঠেলে এই আশ্রমের কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছেন। তিনি অনাথদের রেখে নিজ খরচে ভরনপোষণ করছেন, এটা একটি সনাতনি শিক্ষা।
বাঙ্গালহালিয়ার বাসিন্দা সমাজসেবক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নয়ন চৌধুরী জানান, এই আশ্রমে যারা ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের অনাথ ছেলে মেয়ে আছেন তারা সকলেই সনাতনী সম্প্রদায়ের। কিন্ত তাদের আর্থিক অনটনের কারনে কোন এক ধর্মীয়গোষ্ঠী তাদেরকে ধর্মান্তরিত করতে চাইছে, এই অবস্থায় সনাতন ঋষি মহারাজ এই সম্প্রদায়ের অনাথ ছেলে মেয়েদেরকে আশ্রমে নিয়ে এসে ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন মানবতার সেবক।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button