ব্রেকিংরাঙামাটি

তবে বিদায় জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান

পার্বত্য জেলা রাংগামাটির জেলা প্রশাসক হিসাবে দেড় বছরের কাছাকাছি সময় দায়িত্ব পালন শেষে সরকারি নির্দেশনায় নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে যাচ্ছেন মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান। ৬ মার্চ মঙ্গলবার নবাগত জেলা প্রশাসকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব হস্তান্তরের পর তিনি যাত্রা করবেন নতুন কর্মস্থলের পথে। এরি সাথে জেলা প্রশাসক পদবির ইতি ঘটবে তাঁর কাছে। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের সদস্যদের কাছে জেলা প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাওয়া পরম কাক্সিক্ষত বিষয়। সে হিসাবে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের একজন দক্ষ কর্মকর্তা হিসাবে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক হিসাবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করলেন তিনি। সকলের প্রত্যাশা নবাগত জেলা প্রশাসক ও দক্ষতার সাথে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ হিসাবে মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানকে বিদায়ী শুভেচ্ছা এবং নবাগত জেলা প্রশাসক একেএম মামনুর রশীদকে সাদর আগমনী শুভেচ্ছা।

বিদায়ী জেলা প্রশাসক হিসাবে কেমন ছিলেন মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান? এ কথাটি এখন কম বেশি সবার কাছে আলোচ্য বিষয়। সোমবার রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বিদায়ী জেলা প্রশাসকের সাথে রাঙামাটির সুধী সমাবেশ এবং সংবাদকর্মীদের অনুষ্ঠিত মত বিনিময় সভায় এই কথাটি বারংবার উঠে এসেছে। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিদায় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে নিজ উদ্যোগেই এই ধরনের ব্যতিক্রম ধর্মী আয়োজন সকলের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। যেখানে পত্রিকার পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে অমুক জেলা প্রশাসকের রাজকীয় বিদায় সভা, বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের বন্যা বয়ে যায় সেখানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান ব্যতিক্রমভাবেই রাঙামাটিবাসীর কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন।

কেমন ছিলেন বিদায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান? এ কথার উত্তরে বলা যায় তিনি যেমনি ছিলেন কঠোর ঠিক তেমনি ছিলেন উদার। তিনি নিজেই বিভিন্ন অনুষ্ঠনে বলেছেন তাঁর চেহারার মধ্যে কিছুটা রাগী রাগী স্বভাব থাকলেও বাস্তবে কিন্ত তা নয়। দেড় বছরের তাঁর কর্মকালীন সময় তিনি তা প্রমাণ করেছেন।

জেলা প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই রাঙামাটি শহরের মহিলা কলেজ এলাকায় বিল্ডিং ধসে ৫ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তিনি যে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন সেটি প্রশংসার দাবি রাখে। জেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করে তিনি সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। যদিওবা তদন্ত কমিটির সুপারিশসমূহ যেসব কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। ফলে কাপ্তাই হ্রদ তীরবর্তী এলাকা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছে।

সাজেকের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় খাদ্য সংকট এবং খাদ্য সংকটের কারণে সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল সে সময় জেলা প্রশাসক হিসাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনী, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদসহ সংবাদকর্মীদের সহায়তায় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সে পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছিলেন।

তাঁর স্বল্পকালীন সময়ের দায়িত্ব পালনকালীন সময় ২০১৭ সনের ২ জুন এবং ১৩ জুন রাঙামাটিতে সংঘটিত দু’দুটি বিপর্যয় মোকাবেলায় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ২ জুন লংগদু সহিংসতা এবং অগ্নিকান্ডের ঘটনার প্রেক্ষিতে রাঙামাটিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টসহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার যে সে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল সকলের সহযোগিতায় তিনি তা প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন। সরকারের একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিগণসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনদের শান্ত করতে সক্ষম হোন। সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের গৃহ নির্মাণের বিয়টি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

জেলা প্রশাসক হিসাবে মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান ১৩ জুনের ভয়াব ভূমিধস এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরবর্তী সময়ে উদ্ধারকাজ পরিচালনাসহ ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এ তিনি বলিষ্ঠ কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সাথে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি স্থানীয় জেলা পরিষদ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, স্বাস্থ্য বিভাগ, ফায়ার ব্রিগেড, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, রাঙামাটি পৌরসভা, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এর পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনের সহায়তায় তিনি দৃঢ়তার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোকজনকে রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে লাগাতার তিনমাস সময় দু বেলা খাবারের আয়োজন করে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। রাঙামাটির সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, রেডক্রিসেন্ট, জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় তিনি এ দুরুহ কাজ সম্পাদন করতে পেরেছিলেন। পাশাপাশি তিনি এই দুর্যোগ মোকাবেলায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সর্বাত্মক সহায়তা পেয়েছিলেন। এই আশ্রয় কেন্দ্রেই উদযাপন করা হয়েছে ঈদ উল ফিতর এবং ঈদ উল আযহার মতো দুটি বড় উৎসব। আশ্রয় কেন্দ্রে জন্ম নেয়া নবজাতককে কোলে তুলে নিয়ে তিনি দেখিয়েছেন দুর্যোগের মাঝেও তোমার আগমন আমাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উম্মোচন করবে। ভূমিধসে মা-বাবা হারানো দুই অবুঝ শিশুর দায়িত্ব নিয়ে তিনি মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

তবে একথা ঠিক দুর্যোগকালীন ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তাদের সকলকে সরকারি উদ্যোগে পরিপূর্ণ পুনর্বাসনের সে প্রতিশ্রুতি শতভাগ পালন হয়নি। এটি জেলা প্রশাসকের পক্ষে সম্ভব ছিল না পাশাপাশি এতো বিপুল সংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরকারি উদ্যোগে পরিপূর্ণভাবে পুনর্বাসনের বিষয়টিও দুরুহ ছিল। বিশেষ করে পুনর্বাসনের জন্য যে পরিমাণ জায়গার দরকার রাঙামাটিতে তা নেই। তবে পুনর্বাসনের এ প্রতিশ্রুত পূরণ না হলেও সরকারের ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দকৃত নগদ অর্থ, ঢেউটিন, খাদ্য শষ্য সকল পরিবার পেয়েছে। পাশাপাশি ইউএনডিপিসহ আরো একাধিক সংগঠনের মাধ্যমে সমন্বয় সাধন করে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসমূহকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ প্রাপ্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। দুর্যোগকালীন সময় জেলা প্রশাসক হিসাবে তিনি রাঙামাটির বাজার ব্যবস্থাকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রেখে ছিলেন যার কারণে অধিক মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করলেও তা বিফলে যায়। রাঙামাটি থেকে বিকল্প উপায়ে কাপ্তাই হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন, নদী পথে জ্বালানি তৈল এনে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার বিষয়গুলো রাঙামাটিবাসী অনেক দিন মনে রাখবেন।

দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি বিশেষ ফান্ড গঠনে উদ্যোগ নিয়েছিলেন যেখানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একদিনের বেতন প্রদান সহ বিভিন্ন সংস্থা নগদ অর্থ প্রদান করেছিলেন। প্রায় ২৪ লক্ষ টাকা এই ফান্ডে জমা হয়। দুর্যোগকালীন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় এ ফান্ড থেকে কিছু অর্থ খরচ করা হলেও বর্তমানে পরবর্তী যে কোন দুর্যোগ মোকাবেলায় তিনি এ ফান্ডের স্থিতি হিসাবে ২০ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা রেখে যাচ্ছেন। একই সাথে ভিক্ষুক পুনর্বাসন খাতেও রেখে যাচ্ছেন ২৩ লক্ষের অধিক টাকার ফান্ড। দুর্যোগকালীন সময় তিনি তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় এর সূত্রেও বন্ধুবান্ধব এবং শুভাকাক্সক্ষীদের কাছ থেকে অনেক ত্রাণ যোগাড় করে তা বিতরণ করেছিলেন। বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তির জমকালো আয়োজন এর সফল উদ্যোক্তা ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান। তাঁর সরাসরি নির্দেশনায় স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ড. প্রকাশ কান্তি চৌধুরীসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ এবং প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক নিরূপা দেওয়ান, অঞ্জুলিকা খীসা, সংগঠক অঞ্জন কুমার দে, প্রাক্তন শিক্ষার্থী নাজনীন আনোয়ার নিপুন, প্রধান শিক্ষক সরিৎ চাকমাসহ আরো অনেকে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তির যে জমকালো আয়োজন করেছিল তা রাঙামাটিবাসীর কাছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আয়োজন হিসাবে বিবেচিত হবে।
রাঙামাটির মতো একাধিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় সাধন করে এখানে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন দুরুহ বিষয় একথাটি তিনি তাঁর বিদায়ী বক্তব্যে স্বীকার করেছেন। তথাপি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর বেশ কিছু সরাসরি বক্তব্যে অনেকে নাখোশ হলেও তিনি তাঁর বক্তব্যে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতেন।

সোমবার বিদায়ী বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান বলেছিলেন, তিনি তাঁর ২৩ বছরের সরকারি চাকুরিতে দায়িত্ব পালনের সময় ১১টি জেলায় কাজ করেছেন। তবে রাঙামাটি জেলায় দেড় বছরের এই কর্মকালীন সময়টি ছিল তাঁর কাছে স্মরণীয়। তিনি রাঙামাটিকে ভালোবেসেছেন, ভালোবেসেছেন রাঙামাটিবাসীকে। রাঙামাটির রাঙা মনের মানুষের আতিথেয়তায় তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। রাঙামাটির বর্ণিল প্রাকৃতিক রূপ বৈচিত্রে তিনি বিমোহিত হয়েছেন। তাই তিনি বিদায় বেলায় অকপটে স্বীকার করলেন রাঙামাটি হচ্ছে তাঁর কাছে কর্মকালীন সেরা জেলা।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক হিসাবে ইতিপূর্বে যারা দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাদের মধ্যে শ্রদ্ধেয় এইচ.টি. ইমাম, মরহুম আবু হায়দার খান, শফিকুল ইসলাম, আফতাব উদ্দিন আহমেদ, ড. জাফর আহমেদ খান, গাজী মো: জুলহাস, নূরুল আমিন, সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, মো: মোস্তফা কামাল, মো: সামসুল আরেফিন এর মতো জেলা প্রশাসকের বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে রাঙামাটিবাসীর হৃদয় কোঠায় ঠাঁই করে নিয়েছেন। এবার এই তালিকায় ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে নাম উঠলো মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানের।

জেলা প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এবং সরকারের নির্দেশনার বাস্তবায়নে একসাথে সকলকে সন্তুষ্ট রাখা কখনো সম্ভব নয়। আবার সকল কাজে শতভাগ সফলতাও সম্ভব নয়। এর পরেও জেলা প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানের ভালো কাজগুলোই আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button