ক্যাম্পাস ঘুড়িব্রেকিংরাঙামাটিলিড

ডিপিপি প্রণয়নের অপেক্ষায় আটকে আছে নির্মাণ কাজ

৭ বছরেও হয়নি স্থায়ী ক্যাম্পাস

জিয়াউল জিয়া
পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় চিকিৎসা বিদ্যার প্রসারে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ। প্রতিষ্ঠা পরবর্তী সময়ে অস্থায়ীভাবে ২০১৫ সাল থেকে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও দীর্ঘ সাত বছরেও স্থায়ী ক্যাম্পাসের মুখ দেখেনি এই উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এতে করে শিক্ষার্থীদের তৈরি হয়েছে আবাসন ও শ্রেণি কক্ষের সংকট। এছাড়া শিক্ষাকার্যক্রম শেষে হাতে কলমে (ইন্টার্নশিপ) প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে অন্যপ্রতিষ্ঠানে। তবে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, জমি হস্তান্তর ও আধুনিক জরিপসহ অন্যান্য জটিলতা নিরসন হলেও ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রণয়নের অপেক্ষায় আটকে আছে স্থায়ী ক্যাম্পাসের নির্মাণ কাজ।

সরেজমিন পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের জন্য নির্মিত পাঁচতলা বিশিষ্ট করোনারি ভবনে অস্থায়ীভাবে চলছে মেডিকেল কলেজের শিক্ষাকার্যক্রম। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে পাঁচ ব্যাচে আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহন করছে। ইতোমধ্যে প্রথম ব্যাচের ৪৫ জন শিক্ষার্থী এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করেছে। স্থায়ী ক্যাম্পাস ও পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ নির্মিত না হওয়ায় ইন্টার্নশিপ করতে হচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (চমেক)। আবার আবাসন সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা থাকছেন নিরাপত্তাহীনতায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে ও পাহাড়ে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার লক্ষ্য নিয়ে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) বিরোধীতা সত্ত্বেও ২০১৪ সালে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। ২০১৫ সাল থেকে শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হলেও পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাসে রূপ নিতে পারেনি আজও।

বিশিষ্টজনরা অভিযোগ করছেন, রাঙামাটিতে মেডিকেল কলেজ থাকার পরও স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকেও উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রান্তিক এই জেলার মানুষ। জেলা জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া জটিল কোন রোগের চিকিৎসা হচ্ছে না। হাসপাতালে আইসিইউ, ভেন্টিলেটরসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতিরও সংকট রয়েছে। তাই চিকিৎসাসেবার সংকট কাটাতে পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় সরকারকে তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।

রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের জন্য অধিগ্রহন করা জমি

রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী স্নেহাশীস চক্রবর্তী বলেন, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের ওয়ার্ডে সুযোগ-সুবিধা ভালো নেই। যে কারণে আমরা প্রথম ব্যাচের ৪৫ জন শিক্ষার্থী এই প্রতিষ্ঠান থেকে এমবিবিএস কোর্স শেষ করার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নি করতে হচ্ছে।

মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী অর্নব বড়ুয়া বলেন, আমরা স্বপ্ন নিয়ে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু এখানে স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই, হাসপাতালে বড় কোন অপারেশন হয় না। ভালো বিজ্ঞানাগার নেই। হোস্টেলের সুবিধাও ভালো না। এখানে সবকিছুতে সংকট আর সংকট।

একই ব্যাচের শিক্ষার্থী নাবিলা জানান, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজের সঙ্গে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকলেও রাঙামাটিতে ১০০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে, তাও আবার পুরনো হাসপাতাল। ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য যন্ত্রপাতি থাকলেও জায়গা সংকুলানের কারণে সেগুলোও স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে একটি মেডিকেল কলেজ চলতে পারে না। দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা স্থায়ী ক্যাম্পাস চাই।

তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী সুমাইয়া বিনতে আমিন বলেন, মেয়েদের হোস্টেলটি একটি পাড়ার মধ্যে অবস্থিত, যেখানে আমরা সন্ধ্যার পর বের হতে নিরাপত্তাহীনতায় ভূগি। স্থায়ী ক্যাম্পাস হলে শিক্ষার্থীদের জন্য স্থায়ী হোস্টেল থাকতো। আমরা বের হওয়ার আগে স্থায়ী ক্যাম্পাসে ক্লাস করতে পারবো বলে মনে হচ্ছে না।

রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজির বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন জানান, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত করতে হচ্ছে। স্বল্প সংখ্যক ক্লাস রুম দিয়ে ছয়টি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একটি মেডিকেল কলেজে যেসব জিনিসপত্র থাকা উচিত তার অর্ধেকও নেই এখানে। তাই যতদ্রুত সম্ভব এ সংকটের সুরাহা হওয়া জরুরি।

রাঙামাটি সচেতন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ও রাঙামাটি সরকারি কলেজের প্রাক্তন জিএস জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, মেডিকেল কলেজের ক্লাস শুরু করার জন্য আমরা রাজপথে আন্দোলন করেছি। আমাদের দাবির মুখে ক্লাস কার্যক্রম শুরু হলেও দীর্ঘ সাত বছরেও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি মেডিকেল কলেজটি। এতে করে শিক্ষার্থীরা যুগোপযোগী পাঠদান ও স্থানীয়রা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নানান সংকটের কথা উল্লেখ করে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক প্রীতি প্রসূণ বড়ুয়া জানান, বর্তমানে করোনার উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে অনলাইনে ক্লাস চলছে। অন্য সময়ে একটি ব্যাচের ক্লাস হলে আরেকটি ব্যাচকে অপেক্ষায় থাকতে হতো। মেডিকেল কলেজের যে পরিমাণ যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্রের প্রয়োজন তন্মধ্যে অর্ধেকও নেই আমাদের। যদি সঠিকভাবে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাগ্রহন করতে না পারে তাহলে সংকটের ফলাফল তো ভালো হয়না কোনভাবেই।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ডা. শহীদ তালুকদার বলেন, মেডিকেল কলেজের জন্য ভূমি অধিগ্রহন সম্পন্নের পর জেলাপ্রশাসন জমি হস্তান্তর করেছে। ডিজিটাল সার্ভেসহ অন্যান্য সব কাজও শেষ হয়েছে। তবে মেডিকেল কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর নাকি স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রণয়ন করবে; সেই নির্দেশনা দিবে মন্ত্রণালয়। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিদের্শনা পেলে ডিপিপি প্রণয়ন ও অন্যান্য কাজ শুরু করা যাবে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button