অরণ্যসুন্দরীব্রেকিংলিড

‘ঠিক সন্ধ্যে নামার মুখে তোমার নাম ধরে কেউ ডাকে…….’

কেমন ঝুপ করে নেমে পড়ে সন্ধ্যা ইদানীং ! এখানেও! আর এই জনপদে সন্ধ্যা নামে অন্যরূপে। সন্ধ্যাতো নয় যেন দীর্ঘ রাত্রির ডাক। লাগামহীন সন্ধ্যা চট করে আছড়ে পড়ে রাতের বুকে। শহর থেকে অদূরে এই জনপদে প্রতিটা ক্ষন প্রতিটা বেলাই যেন এক একটা ভিন্ন গল্প! সুন্দর শান্ত প্রশান্ত অন্যজীবন।  অশ্বথ গাছের গোড়ায় প্রার্থনার শেষ মোমের আলোটা নিভু নিভু করছে হালকা হাওয়ায়। লেকের জলে আঁধার ঘনিয়ে আসছে। জোনাকেরা জাগছে। জুমের ব্যস্ততা গুটিয়ে ঘরে ফিরছে দম্পতি। হাতে করে প্রয়োজনীয় গৃহস্থালী রসদ। অন্য অনেকের সাথে পথের ধারে প্রমিলাও নিয়ে বসেছিলো নিজ বাগানে ফলানো নানা সবজি। বেচা কেনার হাট মিলিয়ে যায় সন্ধ্যা নামার আগেই। স্বল্প সংখ্যাক এবং সতেজ এসব সবজি বিক্রি হয়ে যায় খুব দ্রুতই। ঘরে ফিরতে হবে হেঁটেই। তাই তাড়াটা বেশী। প্রমিলার এক হাতে কেরোসিনে ভরা সেভেন আপের খালি বোতল অন্যহাতে চঞ্চলা কন্যা। পিছনে পিছনে ছুটছে পোষা টম। এই দিকটায় বিদ্যুৎতের আলো ছোঁয়নি এখনো। সোলার আর কেরোসিনের হারিকেনই ভরসা। চুলে চিরুনির শেষ আঁচড় কেটে ল্যাম্পে কেরোসিন ভরে বই নিয়ে শীতল পাটিতে বসবে কিশোরী। বিকেলের আলোতেই সাংসারিক ব্যতি ব্যস্ততা সেড়ে সন্ধ্যা নামতেই কারো কারো দেখা মেলে পাড়ার মোড়ের ছোট ছোট টং দোকানে!ওই দোকানেই যে একমাত্র চারকোণা রঙিন বাক্স! বিনোদন।

গৃহকর্তারা জমে আছে আড্ডায় আর কত্রীরা জমে আছে টিভি সিরিয়ালে। গরমে হাঁসফাঁস প্রাণ পা ছড়িয়ে বসে আছে রাস্তার পাশেও।গরমটা বেশ পড়েছেও ইদানীং! ছোট ছোট বাচ্চারা সেই মায়ের আশেপাশেই। উঠতি বয়সের যুবকেরা আবার নেই এসবে।তারা জমে অন্য কোন কোণে ক্যারামে নয়তো ব্রীজের উপরে স্ব-দলবলে আড্ডাবাজিতে! ভরা যৌবনা লেকের জলে হাওয়ায় আরাম খোঁজা।গরমে উষ্টাগত প্রাণে এর আর বিকল্পই বা কি! পাখির কলোরবে সন্ধ্যা নামা এ পথে মানুষের কলকাকলী থেমে গিয়ে এখন চারপাশ জুড়ে ঝিঁ ঝিঁ পোকার গান! রাতের নিস্তব্ধতা।পথ দেখাবে জোনাক পোকা। পথে ছুটতে ছুটতে বন্য প্রানীর দেখাও মিলে যেতে পারে ! দিনে যে পথে ভেড়া গরু দেখা যায় সন্ধ্যা নামলেই সে পথ হয়ে যায় শেয়াল কুকুর আর বন্য হাতির!আর রাশি রাশি জোনাক পোকার !

রাঙামাটি কাপ্তাই সংযোগ সড়কের ১৯ কিলোমিটার এই রাস্তা যেয়ে মিশে যায় কাপ্তাই মূল সড়ক আর নেভী ঘাট সড়কের স্রোতে……পুরো পথ জুড়ে পাবেন অদ্ভুদ মুগ্ধতা। যত দেখবেন ততই নতুন লাগবে সবটা। পাহাড়ের কোল বেয়ে নামা ঝিরি থেকে নিজস্ব উপায়ে চলছে খাবার পানি সংগ্রহ।পথের দুধারে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জেগেছে জুম।জুমের চূড়ায় ছোট্ট একটা খড় কুঁটোর ঘর!ফসল উঠানো অব্দী মোটামুটি ওটাই অস্থায়ী নিবাস। কেউ রাতেও থাকে আবার কেউ কেবল দিনের ক্লান্তিতে জিড়িয়ে নিতে।এলাকায় প্রতি ঘরে ঘরে অলিখিত নিয়ম হিসেবে থাকবে পোষা কুকুর। সন্ধ্যা রাত সেই মালিকের পায়ে পায়েই। পাহাড়ী রাস্তায় সন্ধ্যা রাতের আবেশ পাওয়ার দেখার সাহস করতে পারলে ছুটতে পারেন এ পথেই।জমিয়ে আড্ডা দিতে পারেন আপনিও এই মানুষগুলোর সাথে।অদ্ভুদ রোমাঞ্চকর কিছু অনুভূতি নাড়া দিবে ভেতর জুড়ে।মুগ্ধতারা জড়িয়ে রাখবে আবেশে।দূরের পথে চোখ মেললেই দেখবেন জোনাক পোকার মত জেগে উঠেছে কাপ্তাই উপজেলা আর এপাশে জোনাক জ্বেলে জেগেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বাসভবন। লেকের দুধার জুড়ে জোনাক আর জোনাক। আলোর জোনাক সোডিয়ামের জোনাক। আনমনা মুগ্ধতায় ভালোলাগায় ভালোবাসায় বাতাসে কান পেতে রক্তিম আকাশে চেয়ে মনে হবে-“ঠিক সন্ধ্যা নামার মুখে তোমার নাম ধরে কেউ ডাকে…….’

তানিয়া এ্যানি ,২৬.০৯.২০১৭

এই বিভাগের আরো সংবাদ

১টি কমেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − sixteen =

Back to top button