বান্দরবানলিড

জেলা পরিষদ-জেলা প্রশাসনের ‘অলিখিত দ্বন্দ্বে’ অকার্যকর বাজারফান্ড

আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান
পাহাড়ে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের অলিখিত দ্বন্দ্বে অকার্যকর হয়ে পড়েছে বাজারফান্ড সংস্থা। দীর্ঘ ৩৭ বছর আগে গঠিত এ সংস্থার অধিনে থাকা জমি রেজিস্ট্রেশন এবং ব্যাংক ঋণ সুবিধা বন্ধ থাকায় থমকে গেছে পাহাড়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা। ক্ষুব্ধ তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ের বাজারফান্ডের হাজার হাজার বাসিন্দারা। সংকট নিরসনে নেই কোনো কার্যকর ব্যবস্থাও।

তিন পার্বত্য জেলায় (বান্দরবান, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি) হাটবাজার পরিচালনা এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৯৮৫ সালে গঠিত হয় বাজারফান্ড সংস্থা। সংস্থাটি গঠনের পর প্রথমে জেলা প্রশাসন এবং ১৯৮৯ সালে সংস্থাটি পরিচালনার জন্য ন্যস্ত করা করা হয় পার্বত্য জেলা পরিষদে অধিনে। বাজারফান্ডের আওতায় থাকা জমি বন্দোবস্ত এবং ব্যাংক ঋণের অনাপত্তিপত্রও দেন এই সংস্থাটি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পরও চলছিল এই নিয়মেই। কিন্তু ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অলিখিত ভাবে বাজারফান্ডের অধিনে থাকা জমি রেজিস্ট্রেশন এবং জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম বন্ধ করে দেন জেলা প্রশাসক। এতে করে বন্ধ হয়ে গেছে বাজারফান্ডের জমিতে ঘরবাড়ি, স্থাপনা নির্মাণসহ সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকান্ড। জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণের সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় থমকে গেছে পাহাড়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকাও। অপরদিকে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়ায় ইতিপূর্বে ঋণ গ্রহিতারাও ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করে ব্যাংক থেকে দায়মুক্ত হতে পারছে না। উভয় সংকটে পড়েছে পাহাড়ের বাজারফান্ডের হাজার হাজার বাসিন্দা।

বাজারফান্ডের জমির মালিক ভূক্তভোগী সেলিম রেজা ও ইমরান উদ্দিন বাবু অভিযোগ করে বলেন, হঠাৎ করেই বাজারফান্ডের জমি রেজিস্ট্রেশন এবং জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করে দিয়েছেন প্রশাসন। এতে করে জেলার সাতটি উপজেলা, দুটি পৌরসভা এবং ৩৩টি ইউনিয়নে বসবাসরত বাজারফান্ডের বাসিন্দারা চরম বিপাকে পড়েছে। ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য কোনো প্রকার ব্যাংক ঋণ পাচ্ছে না বসবাসকারীরা। বাজারফান্ডের জমিতে বহুতল আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে কোনো ধরণের ঋণ দিতে পারছে না ব্যাংক। ফলে অকার্যকর হয়ে পড়েছে পাহাড়ের বাজারফান্ড সংস্থাটি। অথচ পাহাড়ের মৌজার জমি রেজিস্ট্রেশন এবং জমি বন্ধক রেখে ব্যংক ঋণ গ্রহণের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। একি দেশে দুধরনের নিয়ম। মৌজার জমির বাসিন্দাররা ঋণ পাচ্ছে, কিন্তু পাহাড়ের সবচেয়ে মূল্যবান বাজারফান্ডের বাসিন্দারা জমি বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণের সুবিধা পাচ্ছে না। এটি পাহাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে বৈষম্য তৈরি করছেন প্রশাসন ও পার্বত্য জেলা পরিষদ অলিখিতভাবে।

এদিকে বান্দরবান বাজারফান্ডের অধিনে সাত উপজেলায় ১৮টি ছোটবড় বাজার এবং প্রায় পাঁচ হাজারের মত জমি বন্দোবস্ত প্লট গ্রহিতা রয়েছে। বাজারফান্ড এলাকায় বসবাসকারীদের সংখ্যা  লাখের উপরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে মূল্যবান জমি এবং ব্যবসা বাণিজ্যগুলো বাজারফান্ডের অধিনেই। প্রায় তিন বছর ধরে বাজারফান্ডের জমি রেজিস্ট্রেশন এবং জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা থমকে গেছে পাহাড়ে। তিন পার্বত্য জেলায় বাজারফান্ডের বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভায়ও আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠে। সভায় বাজারফান্ডের জমি রেজিস্ট্রেশন ও ব্যাংক ঋণ প্রক্রিয়া পূর্বের ন্যায় চালু রাখতে কোনো বাধা নেই মর্মে পার্বত্য জেলা পরিষদ সমূহ ও জেলা প্রশাসকগনকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক একটি পত্রও দেয়া হয়েছে। তবে সংকট নিরসনে আজও কার্যকর কোনো প্রদক্ষেপ নিচ্ছে না তারা।
বান্দরবান ইসলামী ব্যাংকের ম্যানেজার সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, রেজিস্ট্রেশন ছাড়া ব্যাংক ঋণ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাজারফান্ডের জমি বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ব্যাংকগুলো বড়কোনো ঋণ দিতে পারছে না। গ্রাহকেরা ব্যাংকে ঋণের জন্য তদবির করছেন। কিন্তু ইচ্ছে থাকা সত্বেও কোনো ব্যাংকই ঋণ দিতে পারছেনা। এতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ কমে গেছে। অর্থনৈতিক ভাবে ব্যাংক এবং বাজারফান্ডের ভূমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী মুজিবুর রহমান বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং জেলা প্রশাসনের দ্বিমুখী আচরণের কারণে ক্ষোভ বাড়ছে পাহাড়ের মানুষের মাঝে। পরিকল্পিতভাবে পাহাড়ি বাঙালির মধ্যে বৈষম্য তৈরির অভিযোগ তোলা হচ্ছে প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে। মূলত সরকারের দুটি সংস্থার অলিখিত ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ভোগান্তিতে পড়েছে পাহাড়ের মানুষ। অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পার্বত্যবাসীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের স্বার্থে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে জমি রেজিস্ট্রেশন ও ব্যাংক ঋণ প্রক্রিয়া পূর্বের ন্যায় চালু রাখতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম কাওছার হোসাইন বলেন, অযৌক্তিকভাবে বাজারফান্ডের জমি রেজিস্ট্রেশন এবং মূল্যবান জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া বন্ধ রেখেছেন জেলা প্রশাসন। অথচ বাজারফান্ড প্রশাসক, ব্যাংক এবং জমির মালিক কারোর কোনো অভিযোগ আপত্তি নেই। বাজারফান্ডের জমি রেজিস্ট্রেশন ও ব্যাংক ঋণ প্রক্রিয়া পূর্বের ন্যায় চালু রাখতে কোনো বাধা নেই মর্মে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক একটি পত্রও দেয়া হয়েছে। খুব শীগ্রই আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসন করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, বাজারফান্ডের জমি লিজ চলমান রয়েছে। কিন্তু বাজারফান্ডের জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নেয়ার যে পদ্ধতি ছিলো, সেটি বন্ধ রয়েছে। কারণ স্বল্প মেয়াদী লিজ গ্রহীতা কখনো জমির মালিক হতে পারে না। তবে আগে কিভাবে চালু ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, জেলা থেকে একটি পত্র মন্ত্রণালয়ে গেছে। মন্ত্রণালয় সেটি বিশ্লেষণ করে দেখছে ঋণ দেয়া যায় কিনা।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × five =

Back to top button