আলোকিত পাহাড়করোনাভাইরাস আপডেটব্রেকিংরাঙামাটি

ছোট মিশুর বড় হৃদয়

নিজের জমানো অর্থে সিলিন্ডার কিনলেন বিনামূল্যে সেবা দিতে

সেই করোনাকালের শুরুর সময় থেকেই পার্বত্য রাঙামাটিবাসির সবচে বড় বেদনার নাম ‘অক্সিজেন সিলিন্ডার’। কোভিড-১৯ এ জীবন বিপন্ন হওয়ার পর বাঁচার জন্য হাঁসফাঁস করতে থাকা মানুষগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সাপোর্ট দিতেই রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগকে। নিজেদের সামান্য কয়েকটা অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করে নিয়মিত রোগিদের পাশাপাশি করোনা আক্রান্তদের সাপোর্ট করাটা বেশ কঠিনই ছিলো বৈকি। অবস্থা এতটাই নাজুক ছিলো যে, শুধুমাত্র অক্সিজেন সংকটের কারণেও রোগিকে চট্টগ্রাম রেফার করতে হয়েছে। এমনকি যথাসময়ে অক্সিজেন সাপোর্ট না পেয়েই হয়তো ঘটেছে মৃত্যুও।

দিন বেড়েছে,বদলেছে পরিস্থিতিও। নিজস্ব অর্থায়নে ১০ টি সিলিন্ডার কিনেছে রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগ। পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডও কিনে দিয়েছে ১৫ টি সিলিন্ডার। আশিকা নামের একটি এনজিও সরবরাহ করেছে একটি সিলিন্ডার। সবমিলিয়ে ৮২ টি সিলিন্ডার মজুদ এখন। তবে তাও খুব প্রয়োজন মেটাচ্ছে সেটা বলাও কঠিন। কারণ ইতোমধ্যেই মারা যাওয়া এবং চিকিৎসাধীন বেশ কয়েকজন রোগি ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ,যথাসময়ে বা প্রয়োজনে অক্সিজেন সহায়তা পাননি তারা। যদিও চিকিৎসা বিভাগ বলছে,খুব প্রয়োজন না হলে তারা অক্সিজেন ব্যবহার করতে পারছেন না,সীমাবদ্ধতা-অপ্রতুলতা এবং রিফিল’র দীর্ঘসূত্রিতার কারণে।
অক্সিজেন সিলিন্ডারের এমন সংকটকালিন সময়ে সবচে প্রয়োজন ছিলো বেশি বেশি অক্সিজেন সিলিন্ডারের উপস্থিতি অথবা সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম স্থাপন। কিন্তু রূঢ় কঠিন বাস্তবতা হলো, যেনো কারোরই কোন দায় নেই ! স্থানীয় পর্যায়ে অসংখ্য কোটিপতি,শিল্পপতি এবং ধর্নাঢ্য রাজনীতিবিদ ও ঠিকাদার থাকলেও তারা কেউই এগিয়ে আসেননি একটি বা দুটি সিলিন্ডার কিনে দিয়ে রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগের পাশে দাঁড়াতে।

এমন বিপন্ন এক সময়ে রাঙামাটি শহরের রিজার্ভবাজার এলাকার সদ্য অনার্স শেষ করা এক তরুণ সংবাদকর্মী নিজের জমানো অর্থ ও পরিবারের সহায়তায় নিজ উদ্যোগেই কিনে এসেছেন ৫ টি সিলিন্ডার এবং ঘোষনা দিয়েছেন,বিনামূল্যেই যেকোন দরিদ্র ও সামর্থ্যবান নয় এমন মানুষকে সিলিন্ডারের অক্সিজেন ব্যবহার করে পাশে থাকবেন তিনি।

এখনো অধ্যয়নরত মিশু। করোনার কারণে আটকে আছে মাস্টার্স। এইসময়ে নিজের জমানো অর্থে আর মাত্র কমাস আগে প্রতিষ্ঠা করা নিজের সংগঠন ‘চেঙ্গী ট্যুরিজম’র নামে শুরু করে দিয়েছেন মানবতার আহŸানে অবাক করা এই কাজ। মিশুর এই কাজে অবাক শহরবাসিও। চেনা অচেনা অনেকেই বিস্ময়ে বিহ্বল।

মাছরাঙা টেলিভিশন ও দেশ রূপান্তরের জেলা প্রতিনিধি এবং দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রামের মফস্বল সম্পাদক শংকর হোড় বলেন, সাত বছর আগে আমাদের পত্রিকার শুরু থেকেই মিশু একজন রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত আছে। ছোট্ট মিশু যে বিশাল হৃদয়ের পরিচয় দিয়েছে তার জন্য শুধু আমি নই,আমাদের পুরো টীম গর্বিত। আমি মনে করি,মিশুর এই উদ্যোগ, এই শহরের তথাকথিত কোটিপতিদের বিবেককে হয়তো সামান্য হলেও জাগ্রত করবে।

সময় টেলিভিশনের রাঙামাটি প্রতিনিধি ও পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম’র নির্বাহী সম্পাদক হেফাজত সবুজ বলেন, টাকা হয়তো সবার থাকে,কিন্তু সেই টাকা খরচ করার সঠিক জায়গা যেমন সবাই দেখেনা,তেমনি সেই সততাও সবার থাকেনা।’ মিশু এই স্বার্থপর সময়ে জীবনের অন্য একটি মানবিক দিক দেখিয়ে দিলো সবাইকে।

সংবাদকর্মী মিশুর এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন রাঙামাটির সিভিল সার্জন বিপাশ খীসা। তিনি জানিয়েছেন, করোনা মোকাবেলায় এভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে সামর্থ্যবানরা এগিয়ে আসলে তবেই বৈশি^ক এই মহামারী প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ কারো বাসায় অক্সিজেন সেবা দিতে না পারলেও এই উদ্যোগে ব্যক্তিগতভাবে রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। আমরা সাথে উদ্যোক্তা মিশু’র কথা হয়েছে। তাকে যা সাপোর্ট দেয়া প্রয়োজন, আমরা তা দিতে প্রস্তুত।’

কেনো এই ব্যতিক্রমি উদ্যোগ নিলেন’-এমন প্রশ্নের জবাবে মিশু দে বলেন, আমি একজন সংবাদকর্মী হিসেবে করোনার শুরু থেকেই মাঠে থেকে দেখেছি রাঙামাটির মানুষ সবচে বেশি কষ্ট পাচ্ছে অক্সিজেন নিয়ে। স্বাস্থ্যবিভাগের সিলিন্ডার চাইলেও কেউ বাসায় নিতে পারছেনা,যদিও অনেকেই বাসায় আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। বেসরকারি পর্যায়ে কাউকে এগিয়ে আসতেও দেখছিলাম না। ফলে আমি আমার জমানো টাকা দিয়েই এই উদ্যোগটি নিলাম। আমার এই ছোট্ট উদ্যোগে যদি একটি প্রাণও বাঁচে তবেই আমার সার্থকতা।’

নিজের সহকর্মীদের সাথে মিশু

আত্মপ্রত্যয়ী এই তরুণ সাংবাদিকতা শুরু করেছেন পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম ও দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রামের হাত ধরেই। ক্যাম্পাসবার্তা’ নামের অনিয়মিত একটি সংবাদ বুলেটিন প্রকাশ করে। রাঙামাটি জেলা ছাত্রইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমানে  রাঙামাটি সরকারি কলেজ থেকে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত মিশু। করোনায় তার শিক্ষাজীবন যেমন আটকে গেছে,তেমনি তার নতুন শুরু করা পর্যটন ব্যবসার প্রতিষ্ঠান ‘চেঙ্গী ট্যুরিজম’ও স্থবির হয়ে পড়েছে। সারাবিশ্বের অসংখ্য উদ্যোক্তার মতো কিংবা সাধারন মানুষের মতো ক্ষতিগ্রস্ত সেও। কিন্তু বুকের ভেতর সাম্যবাদ আর মানবতা লালন করা এই তরুণ ঠিকই মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দিলেন, এই স্বার্থপর সময়েও কেউ কেউ থাকেই,ঠিক নীরবে নি:স্বার্থে ভালোবাসা বিলিয়ে যায়।’

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button