ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

ছাত্রলীগ সভাপতি সুজনকে গ্রেফতারের আদেশ আদালতের

মামলা থেকে অব্যাহতির প্রার্থনা নামঞ্জুর

যুবলীগ নেতা নাসির হত্যাচেষ্টা মামলার পুলিশের দেয়া প্রথম চার্জশীট থেকে নাম বাদ পড়লেও চূড়ান্তভাবে মামলা থেকে রেহাই পেলেন না রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল জব্বার সুজন। মামলা থেকে তাকে বাদ দেয়ার আবেদন না মঞ্জুর করে তাকে গ্রেফতারে ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছে আদালত।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাঙামাটির কোতয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ কবির হোসেন।

ওসি জানিয়েছেন, ২৯ অক্টোবর সুজনকে গ্রেফতারে একটি পরোয়ানা আমরা গ্রহণ করেছি। তাকে গ্রেফতারে চেষ্টা করছে পুলিশ।

নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২৭ জানুয়ারি তারিখ রাঙামাটি পেীরসভার ৮ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ নাসিরকে হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে জখম করা হয়। এসময় তার মাথায় আঘাত ও পায়ের রগ কেটে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। গুরুতর আহত নাসিরকে প্রথমে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে এবং পরে অবস্থার অবণতি হলে চট্টগ্রামে পাঠানো হয় উন্নত চিকিৎসার জন্য। এই ঘটনার তিনদিন পর নাসিরের স্ত্রী সালেহা আক্তার বাদি হয়ে রাঙামাটির কোতয়ালি থানায় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ইকবাল হোসেন,ছাত্রলীগ নেতা আজমীর,দীপংকর দে, যুবলীগের পৌর কমিটির সেক্রেটারি আব্দুল ওয়াহাব খান, ৭ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মোঃ আরিফ, যুবলীগ নেতা মোঃ মিজান, ছাত্রলীগ নেতা শাকিল এবং জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল জব্বার সুজনের নাম উল্লেখ করে রাঙামাটির কোতয়ালি থানায় একটি সাধারন ডায়রি করেন। এই মামলায় পুলিশ মোঃ শাকিলকে প্রথমে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়,সেখান থেকে সে জামিনে মুক্ত হয়। পরে বাকি আসামীরা আদালতে জামিনের জন্য গেলে আদালত মোঃ মিজান এবং আরিফকে জেল হাজতে পাঠায় এবং বাকিদের অস্থায়ী জামিন প্রদান করেন।

এই মামলায় আদালতে দায়ের করা চার্জশীট থেকে ‘অজ্ঞাত’ কারণে বাদ পড়েন কিংবা বাদ দেয়া হয় জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সুজনকে। পুলিশের এই চার্জশীটে বিস্মিত হয় আদালতও । চার্জশীট ও নথি পর্যালোচনা করে বেশ কিছু অসঙ্গতি তুলে ধরেন আদালত।

রাঙামাটির জিআর কগনিজেন্স আদালতের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদউদ্দিন মোঃ আসিফ এর আদালত পুলিশের চার্জশীট পর্যালোচনা করে বলে-‘ এজাহার পর্যালোচনায় দেখা যায় এজাহার দায়েরকারি সর্বমোট ৮ জন আসামী এবং ৫/৬ জন আসামীর নাম উল্লেখপূর্বক তৎমধ্যে কোন আসামী কি মর্মে অপরাধ সংঘটন করেছে তার বিবরণ দিয়ে এজাহার দায়ের করেছেন। তৎমধ্যে এজাহারনামীয় ২নং আসামী আব্দুল জব্বার সুজন তার হাতে থাকা ছুরি দিয়ে ভিকটিমকে বাম পায়ের গোড়ালিতে রগ কেটে দেওয়ার সুস্পষ্ট অভিযোগ আছে। তদন্তকারি কর্মকর্তার দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে সাক্ষ্য স্মারকে উক্ত ভিকটিমকে রক্তাক্ত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে মর্মে সকল সাক্ষী ১৬১ ধারায় জবানবন্দীতে উল্লেখ করেছে এবং তদন্তকারি কর্মকর্তা তদন্ত প্রতিবেদনে ১৪৩/৩০৭/৩২৬/৫০৬ পেনাল কোড ১৮৬০ এর উপাদান পেয়ে চার্জশীট প্রদান করেছেন মর্মে দেখা যায়।’

পর্যবেক্ষনে আদালত আরো বলেছেন-‘ এজাহার পর্যালোচনায় দেখা যায়,সংবাদদাতা এজাহারে বলেছেন আসামীগণ আনুমানিক রাত আট ঘটিকায় অপরাধ সংঘটন করে ৮.৩০ ঘটিকায় আসামীগণ ভিকটিমকে রাঙামাটি সদর হাসপাতালের পশ্চিম পাশে অন্ধকারে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। অর্থাৎ আসামীগণ কর্তৃক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে ৮ টা থেকে সাড়ে আট ঘটিকার মধ্যে।’

আদালত বলেছেন-‘ তদন্তকারি কর্মকর্তা আদালতে যে দুইটি ছবি দাখিল করেছেন তা স্পষ্ট নয়। তদন্তকারি কর্মকর্তার ছবির উপরে লেখা ভাষ্যমতে ২ নং আসামী আব্দুল জব্বার সুজন ১৯.১৯.২৯ ঘটিকায় একটি কক্ষে প্রবেশ করেছেন এবং ২০.০০.২৪ ঘটিকায় উক্ত কক্ষ ত্যাগ করেছেন এবং এই কক্ষটিকে তদন্তকারি কর্মকর্তা দলীয় কার্যালয় বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ আদালতের নিকট প্রতীয়মান হচ্ছে ইহা শুধুমাত্র একটি কক্ষ। কিন্তু এজাহার এবং ১৬১ ধারার জবানবন্দী পর্যালোচনা করে দেখা যায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে ২০.০০ ঘটিকার পর।’

আদালত তার পর্যালোচনায় আরো বলেছেন,‘রেকর্ড পর্যালোচনায় আদালতের নিকট প্রতীয়মান হয় যে,সংঘটিত অপরাধটি সকল আসামীগণ ২২.০০ ঘটিকা থেকে ২২.৩০ ঘটিকায় সংঘটিত করেছেন। তদন্তকারি কর্মকর্তা সুকৌশলে ইচ্ছাকৃতভাবে শুধুমাত্র অস্পষ্ট ছবির উপর ভিত্তি করে সকল আসামীর মধ্যে শুধুমাত্র ২ নং আসামী আব্দুল জব্বার সুজনকে মামলা থেকে অব্যাহতির প্রার্থনা করেছেন। অথচ মামলার এজাহারে ২ নং আসামীর অপরাধ সুস্পষ্ট এবং সাক্ষীদের ১৬১ ধারার জবানবন্দীতে সকল আসামীর অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করেছেন। কিন্তু তদন্তকারি কর্মকর্তা এজাহার এবং ১৬১ ধারার সাক্ষীদের সাক্ষ্যকে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র ২ টি অস্পষ্ট ছবি আদালতে দাখিল করে ২ নং আসামীকে মামলা থেকে বাদ দেয়ার প্রার্থনা করেছেন যাহা মঞ্জুরযোগ্য নয়। কারণ উক্ত আসামী ঘটনাস্থলে ছিল না ইহা আসামীপক্ষের অপরাধের অনুষ্ঠানকালে অপাঠ্য থাকার অজুহাতে রেহাই পাবার দাবি,যা শুধুমাত্র আসামীপক্ষকেই প্রমাণ করতে হবে। ইহা প্রমান করার দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তার নয়। আসামীপক্ষ ডিফেন্স কেইস হিসেবে আদালতে প্রমাণ করবে। সুতরাং ২ নং আসামী আব্দুল জব্বার সুজনকে মামলা থেকে অব্যাহতির প্রার্থনা মঞ্জুর করা হলে ন্যায়বিচার বিঘিœত হবে। এজাহারভূক্তি ২ নং আসামী আব্দুল জব্বার সুজনের মামলার দায় থেকে অব্যাহতির প্রার্থনা না মঞ্জুর করা হল।’

একই আদেশে আদালত আব্দুল জব্বার সুজনের প্রতি ওয়ারেন্ট ইস্যু করার আদেশ দিয়ে তা আগামী ২ নভেম্বর পরবর্তী ধার্য্য তারিখের মধ্যে তামিলের নির্দেশ দিয়েছেন।’

আদালতের নির্দেশনার সন্তোষ প্রকাশ করে ভিকটিম ৮ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ নাসির বলেছেন, আমি মাননীয় আদালতের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। কারণ আমাকে যারা হত্যা করতে চেয়েছে তাদের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড এই সুজন। তাকে প্রভাবশালীদের তব্দিরে মামলা থেকে বাদ দেয়ার অপচেষ্টা মাননীয় আদালতের কারণে রোধ করা গেলো। আমি চাই সুজন গ্রেফতার হোক,তাকে রিমান্ডে নিলেই ঘটনার সাথে নেপথ্যে কে বা কারা জড়িত সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা এসআই জিয়াউল হক জানিয়েছেন, অনেক সময় অনেক কিছু আমাদের করতে হয় নানা কারণে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে। এখানে সেইরকম কিছু হয়েছে।  আদালত আমাকে যদি ডাকেন আমি আমার অবস্থান পরিষ্কার করব। আমি শুনেছি তাকে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন না মঞ্জুর করে আদালত ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছে। তবে আমি অফিসিয়ালি কিছু জানিনা এখনো।’

কোতয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ কবির হোসেন আদালত থেকে ওয়ারেন্ট পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার আমরা ওয়ারেন্ট আদেশটি গ্রহণ করেছি। এখন আদালতের নির্দেশনা মতো আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব।’

রাঙামাটি সদর সার্কেলের সহকারি পুলিশ সুপার তাপস রঞ্জন ঘোষ ওয়ারেন্ট আদেশ হাতে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, আমরা একটু বিলম্বে আদেশটি পেয়েছি। এখন আইন তার নিজের গতিতেই চলবে।’

রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক প্রকাশ চাকমা বলেছেন, আমি শুনেছি আমার সভাপতি সুজনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। এর বেশি কিছু এখনো জানিনা। দেখা যাক কি হয়।’ ‘তার বিরুদ্ধে কি সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিবেন’-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জেলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা একমাত্র কেন্দ্রীয় কমিটির। তারা যে নির্দেশনা দিবে সেটাই পালন করতে বাধ্য আমরা।’

রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হাজী মুছা মাতব্বর জানিয়েছেন, ছাত্রলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে যুবলীগ নেতা নাসির হত্যাচেষ্টা মামলায় ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে বলে শুনেছি। এই বিষয়ে আমরা কোন পক্ষেই অবস্থান নিব না। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কারো ব্যক্তিগত কিংবা সাংগঠনিক অপকর্মের দায় নিবেনা। সুজনের বিষয়টি আমরা দাদার (দীপংকর তালুকদার) সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিব।’

এদিকে গত ২০ অক্টোবর আদালত ওয়ারেন্ট ইস্যুর নির্দেশনা দিলেও কোতয়ালি থানায় সেই ওয়ারেন্ট পৌঁছেছে ২৯ অক্টোবর। এর মধ্যে শহরে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে সুজনকে। বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবারও শহরের একাধিক স্থানে তাকে দেখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন একাধিক সূত্র।

যোগাযোগ করা হলে রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, আমি রাঙামাটি ছিলাম না। এখনই খোঁজ নিব বিষয়টি কি হচ্ছে। অবশ্যই আইন তার নিজের গতিতেই চলবে।’

প্রসঙ্গত,২০১৫ সালে কাউন্সিল ছাড়াই সভাপতি হিসেবে মনোনীত আব্দুল জব্বার সুজন শুরু থেকেই একের পর এক ঘটনার জন্ম দিয়ে শহরে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়ে আসছেন। পুলিশের গাড়ী থেকে আসামী ছিনতাই,ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে গাড়ী ছিনিয়ে আনা,সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই বিষোদগার-উস্কানি ও মিছিল সমাবেশ,বিভিন্ন সরকারি ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদারি কাজে প্রভাববিস্তারসহ অসংখ্য অভিযোগ তার এবং তার অনুসারিদের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ ভিন্ন নেতার অনুসারি হওয়ায় যুবলীগ নেতা নাসিরের উপর হামলা ও পায়ের রগ কেটে দেয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত হলেন তিনি।

 

 

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button