রাঙামাটিলিড

চার মাস পর কাপ্তাই হ্রদে প্রাণচাঞ্চল্য

হেফাজত সবুজ ॥
চার মাস বন্ধ থাকার পর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদে বুধবার থেকে মৎস্য আহরণ শুরু হয়েছে। মৎস্য আহরণের প্রথম দিনেই হ্রদের বিভিন্ন স্থান থেকে জেলেদের আহরণকৃত মাছ বোটে নিয়ে এসে বিএফডিসির মৎস্য ঘাটে অবতরণ করা হচ্ছে। প্রথম দিনের মাছের আহরণ দেখে খুশি ব্যবসায়ীরা। বিএফডিসিরও আশা, গতবারের চেয়ে এবার মাছের রাজস্ব আহরণ বেশি হবে।

মূলত হ্রদে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও অবমুক্ত করা কার্পজাতীয় মাছের পোনার স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ১ মে থেকে ৩১ জুলাই এই তিন মাস কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য আহরণ ও বিপনন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু এবার হ্রদের পানি কম থাকায় পর পর তিনবার মেয়াদ বাড়িয়ে ৩১ আগস্ট মধ্য রাত থেকে মাছ আহরণের অনুমতি প্রদান করে প্রশাসন। ফলে দীর্ঘ চার মাস পর চিরচেনা রূপে ফিরেছে রাঙামাটির মৎস্য অবতরণ ঘাট। মধ্যরাত থেকে মাছ আহরণ শুরু হওয়ার পর জেলেদের আহরণকৃত মাছ ছোট ছোট বোটে করে নিয়ে আসছে অবতরণ ঘাটে। একদিন আগের অলস অবতরণ ঘাটটিতে এখন ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্যতা। ব্যবসায়ী, শ্রমিকদের হাঁকডাকে চির চেনা রূপে ফিরেছে ঘাটটি। শুধু অবতরণ ঘাটই নয়, ফিসারি ঘাটের চারদিকে চলছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। সচল হয়েছে বরফ কল। শ্রমিকরা ব্যস্ত একের পর এক বরফ ভাঙ্গতে। অবতরণকৃত মাছ সরকারি রাজস্ব মিটিয়ে ড্রামে প্যাকিং শেষে ট্রাকে তুলে দেয়া হচ্ছে। যার গন্তব্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। মৎস্য আহরণের প্রথম দিনেই মাছ আহরণ দেখে খুশি ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। প্রথমদিনেই কাচকি, চাপিলার আধিক্য ছিল সবচে বেশি। এভাবে সারাবছর মাছ আহরণ হলে ব্যবসায়ীসহ এই খাতে সাথে জড়িত সকলেই লাভবান হবেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তবে কার্প জাতীয় মাছ কম আসায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছেও তাদের।

রাঙামাটি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক উদয়ন বড়ুয়া বলেন, এবছর আমাদের দাবির প্রেক্ষিতে হ্রদে ৪ মাস মাছ আহরণ বন্ধ ছিল, আমরা আশা করি গত বছরের তুলনায় আমাদের ব্যবসা ভাল হবে। গত বছর হ্রদে পানি কম থাকায় এক সাথে প্রচুর মছ ধরা পড়ায় আমরা মাছ বিক্রয় করতে না পেরে প্রতিদিনই বেশ কিছু মাছ ফেলে দিতে হয়েছে। প্রথম মাসে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫ টন। এত আমাদের ও জেলেদের অনেক ক্ষতি হয়েছিল। শুধু তাই নয়, মৌসুমের শেষ দিকে তেমন মাছ পাওয়া না যাওয়ায় সেখানেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তিনি আরও বলেন, এরাব যেহেতু ৪ মাছ হ্রদে মৎস্য শিকারে নিষেধাজ্ঞা ছিল তাই এবার কার্পজাতীয় মাছও বেশি পাওয়া যাবে। এতে সরকার, জেলে এবং ব্যবসায়ী সবাই লাভবান হবে।

অবতরণ ঘাটে আসা ব্যবসায়ী রফিকুল ইসমাল বলেন, প্রথম দিনে প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ পেয়েছি। আশা করছি এরার ভাল ব্যবসা হবে। গত বছরের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠতে পারবো। অপর ব্যবসায়ী সমীর মল্লিক বলেন, প্রথম দিনে আহরিত মাছের মধ্যে কাচকি, চাপিলাই বেশি। আশা করেছিলাম বড় মাছও থাকবে তবে সেটা হয়নি। এখনো আশায় আছি কিছু দিনের মধ্যেই বড় মাছ আসা শুরু হবে।
১২০ দিন পরে কাজে ফিরে কর্মব্যস্ত দিন পার করছে শ্রমিকরা।

ঘাট শ্রমিক রহিম মিয়া বলেন, এতদিন কর্মহীন থেকে মানবেতর জীবন কাটিয়েছি, অন্য বছর বন্ধকালীন সময়ে অন্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতাম এবার সেটা হয়নি, করোনার কারণে প্রায় সব কিছুই বন্ধ ছিল। খুব কষ্টে এ সময়টা পার করতে হয়েছে। এখন ঘাটে কাজ শুরু হওয়াতে আমাদের কষ্টের দিন শেষ হলো। এই আয় দিয়ে বউ বচ্চা নিয়ে সুন্দরভাবে দিন কাটাতে পারবো।

অপর শ্রমিক কামরুল হোসেন বলেন, বন্ধকালীন সময়ে জেলেরা চাল পায়। আমাদের খবর কেউ রাখে না। অনেক কষ্টে অনেকটা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটিয়েছি। এখন আমাদের সুদিন এসেছে আর কষ্টে থাকতে হবে না।

বিএফডিসির উপ-ব্যবস্থাপক জাহিদুই ইসলাম বলেন, চার মাস পর মৎস্য আহরণ শুরু হওয়াতে চিরচেনা রূপে ফিরেছে অবতরণ ঘাট। ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টটা পর্যন্ত এই তিন ঘন্টায় ঘাটে ল্যান্ডিং হয়েছে প্রায় ২০ টন মাছ। যা গত বছরের তুলনায় বেশি। আশ করছি এবছর গতবারের চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হবে। তাছাড়া এবছর আশা করছি হ্রদে কার্পজাতীয় মাছের উৎপাদন বাড়বে। কারণ হ্রদে মৎস্য আহরণের সময় সীমা এক মাস বাড়তি ছিল। তাছাড়া এবছর হ্রদে ৪৬ টন কার্পজাতীয় মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত বছর কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য আহরণের প্রথম দিনে তিনটি ঘাটে ১২৮ মে.টন মৎস্য অবতরণ করা হয়। যা থেকে রাজস্ব আদায় হয় প্রায় ২২ লাখ টাকা।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button