নীড় পাতা / পাহাড়ের অর্থনীতি / গ্যাসহীন কেপিএম’র উৎপাদনহীনতায় কাটলো ২৪ দিন!
parbatyachattagram

গ্যাসহীন কেপিএম’র উৎপাদনহীনতায় কাটলো ২৪ দিন!

এক সময় দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ কাগজকল কর্ণফুলী পেপার মিলস দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকছে। উৎপাদন কমে যাওয়া, ক্রমাগত লোকসানে নাজুক এ কারখানাটি সম্প্রতি ঘুরে দাঁড়ানোর পথেই ছিল। কিন্তু ৩ আগস্ট থেকে বকেয়ার কারণে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব পেপার মিলটি।

বৃহস্পতিবার সকালে কারখানা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ২০ দিন ধরে কারখানা বন্ধের কারণে শ্রমিকরা হতাশ হয়ে পড়েছে। বিশেষত কারখানাটির অস্থায়ী শ্রমিকরা সপ্তাহান্তে বেতন না পাওয়ায় অর্থাহারে দিন কাটাচ্ছে। এক সময় এই কারখানাকে ঘিরে লক্ষাধিক মানুষের আনাগোনায় কেপিএম এলাকায় বৃহৎ কর্মযজ্ঞ থাকলেও বর্তমানে মৃতপ্রায় কারখানা সংলগ্ন হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ। কেপিএম কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে গ্যাস বিতরণকারী কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (কেজিডিসিএল) সাথে কেপিএমের শীর্ষ কর্মকর্তারা বৈঠক করে বকেয়ার একটি অংশ পরিশোধ করলেও গ্যাস সংযোগ পুনঃস্থাপনের বিষয়ে কোন সুরাহা হয়নি। সর্বশেষ ২ আগস্ট কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন ছিল ২৮ টন কাগজ। এ অবস্থায় প্রায় ৬ কোটি টাকার কাগজ উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হয়েছে কেপিএম। অনিশ্চয়তার মুখে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে কেপিএম। কেপিএমের পক্ষ থেকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ দেয়া হলেও গ্যাস বিতরণকারী কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (কেজিডিসিএল) পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। উভয়পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই কাজহীন থাকায় অমানবিক জীবনযাপন করছেন এই কারখানার অস্থায়ী শ্রমিকরা।

জানতে চাইলে কেপিএমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এম এম কাদের বলেন, গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত্ব শ্রমঘন একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কেজিডিসিএলের সাথে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু কিছু বকেয়া পরিশোধের পরও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানটি। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসাবে কেজিডিসিএলের আচরণ অনাকাক্সিক্ষত। আমরা বিষয়টি নিয়ে কেমিক্যাল করপোরেশনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জানিয়েছি। আশা করছি, সংযোগ ফেরত পাওয়ার মাধ্যমে নতুন করে কেপিএমকে লোকসানের ধারা থেকে বের করে লাভের ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

যদিও কেপিএম ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্যের দ্বিমত পোষণ করেন কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খায়েজ আহমেদ মজুমদার। তিনি বলেন, কেপিএমের কাছে আমাদের বকেয়া প্রায় ৮০ কোটি টাকা। গ্যাস ট্রান্সমিশন মিটার স্টেশনটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ বন্ধ হয়েছে গেছে। এটি মেরামত করতেই অন্তত ৫ কোটি টাকার প্রয়োজন। আমরা তাদের মেরামতের জন্য সম্ভাব্য টাকা জমা দিতে বলেছি। কিন্তু অর্থ সংকটের কারণে কেপিএম সেটিও দিতে পারেনি। ফলে মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নেবে সেভাবেই আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

কেপিএম সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কেপিএমে স্থায়ী ৩০০ জন শ্রমিক, অস্থায়ী ৪০০ জন শ্রমিক, ৫০ জন স্থায়ী কর্মচারী, ৭৫ জন কর্মকর্তা রয়েছে। আসন্ন বই উৎসবকে সামনে রেখে এনসিটিবি-সহ কারিগরি বিশ^বিদ্যালয়, সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, শিক্ষাবোর্ড ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৩ হাজার টন কাগজের বিক্রয় আদেশ রয়েছে। এসব চাহিদা মেটাতে কারখানাটিতে উৎপাদনের জন্য মজুদ রয়েছে ২ হাজার টন পাল্প। আরও ৩ হাজার টন পাল্প পাইপলাইনে রয়েছে। এমতাবস্থায় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক-কর্মচারীরা মানবেতন জীবনযাপন করছে বলে জানিয়েছেন কেপিএমের কর্মকর্তারা।

কেপিএমের উৎপাদন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে কেপিএমে ৩ হাজার টন কাগজ উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনায় সর্বশেষ অর্থ বছরে উৎপাদন হয়েছে ৬ হাজার টন কাগজ। চলমান উৎপাদন (দৈনিক ২৫ থেকে ৩০ টন ) ধরে রাখা গেলে চলতি অর্থ বছরে কেপিএমের উৎপাদন ১০ হাজার টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু কোন ধরনের কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আবারোর লোকসানের আবর্তে সংকটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিজ করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানটি।

কেপিএমের শ্রমিক নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, কেপিএম দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে। গত এক দশক বছর ধরে লোকসানে থাকায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। নগদ অর্থের অভাবে নিয়মিত শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। এমতাবস্থায় গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় আরও বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে পড়েছে ৭০ বছরের পুরনো এই কাগজকলটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেপিএমের এক অস্থায়ী শ্রমিক বলেন, কারখানা বন্ধ থাকায় দিন মজুরের কাজ করে সংসার চালাতে হচ্ছে। পার্বত্য এ এলাকায় হঠাৎ বিপুল পরিমাণ মানুষ বেকার হয়ে পড়ায় দৈনিক ভিত্তিতে মজুরের কাজও জুটছে না। এতে অর্থাভাবে সংসার চালাতেই বেগ পেতে হচ্ছে। অনেকেই এরই মধ্যে চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি শহরে কাজের সন্ধানে চলে গেছেন। কারখানা চালু হলে আবার ফিরে আসবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

কেপিএম সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত কারখানাটির উৎপাদন কমতে থাকায় ১৯৯৭ সালে কারখানাটি সংস্কারে উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০০৮ সালে কেপিএমে ১৮১ দশমিক ৫ কোটি টাকায় ব্যালেন্সিং মডার্নাইজেশন রেনোভেশন অ্যান্ড এক্সপেনশন (বিএমআরই) এর কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নকালীন সময়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এরই মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলসহ কয়েক দফা কারখানার বিএমআরই প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ পরিদর্শন করেন। এতেও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়। কেপিএম বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কেনাকাটায় ব্যাপক লুটপাটের খোঁজ পাওয়ার পর ২০১২ সালে কমিটি জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মারুবেনি ও কেপিএমের জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। পাশাপাশি বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানোর সুপারিশ করা হলেও কোন শাস্তি হয়নি অভিযুক্তদের।

সৌদি আরবের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান আলরাজি গ্রুপ ২০১৬ সালে কেপিএমে দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে। এ বিষয়ে একই বছরের ২০ অক্টোবর শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাথে একটি সমঝোতা চুক্তিও স্বাক্ষর করে। দৈনিক এক হাজার টন কাগজ উৎপাদন ছাড়াও পেপার মিলস সংলগ্ন কারখানা নিজস্ব জমিতে ৩৬০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের কথা ছিল। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন অগ্রগতি না হওয়ায় উৎপাদন কমে ধুঁকছে পাঁচ একর জমিতে স্থাপিত কারখানাটি। সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ স্থগিত হয়ে যাওয়ায় তিন ধাপের একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা কেমিক্যাল করপোরেশনের মাধ্যমে শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে কেপিএম কর্তৃপক্ষ। এটি বাস্তবায়ন হলে আবারও এশিয়ার বৃহৎ এই কাগজকলের সুদিন ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

খাগড়াছড়িতে চারদিনের আয়কর মেলা শুরু

পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে শনিবার সকালে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী আয়কর মেলা। খাগড়াছড়ি অরুণিমা কমিউনিটি সেন্টারে …

Leave a Reply