লাইফস্টাইল

গোয়া……যে শহর ঘুমায় না!

তানিয়া এ্যানি

সলো ট্রাভেল কিংবা হানিমুন ডেস্টিনেশন হিসেবে গোয়া বেশ জনপ্রিয়।বলিউড সিনেমার সাথে আমরা যারা টুকটাক পরিচিত গোয়া তাদের জন্য এক অন্যরকম ফ্যান্টাসি। হাতের নাগালে অ্ন্যান্য ভিন্ন দেশের সমুদ্র শহরের চাইতে কম খরচে আয়েশেই ঘুরে আসা যাবে যে শহর ভারতর্ষের গোয়া তার মধ্যে অন্যতম।

আরব সাগরের কোলঘেষে বেড়ে উঠা এই শহর যেন একের মধ্যে সব।প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড় সমুদ্র, ঐতিহাসিক স্থাপনা, ধর্মীয় উপসানালয় এবং অতি অবশ্যই রাতের গোয়া।ন্যাশনাল জিওগ্রাফির হিসেবে পৃথিবীর যে দশটি শহর নাইটলাইফের জন্য বিখ্যাত গোয়া তার মধ্যে ষষ্ঠ।

ষোল শতাব্দীতে সমুদ্রে ভেসে পর্তুগীজরা এই অঞ্চলে আসে মূলত বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে তারপর এখানেই স্থাপন করে নিজেদের রাজত্ব।তারপর প্রায় ৪৫০ বছর ধরে এই রাজ্য ছিলো তাদের শাসনাধীন।

বর্তমান ভারতের দক্ষিনপশ্চিম উপকূলের রাজ্য গোয়া।এই রাজ্যের মানুষেরা কথা বলে “কনকানি” ভাষায়।সহক সরলা সাধারণ যাপন।পর্যটকই মূলত এই অঞ্চলের পুজি। উল্লেখ্য যে, অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় গোয়ার জিডিপি অনেকবেশী।

এতসব গল্পে ঘেরা যে শহর সে শহরে একবার পা না রাখলেতো নয়।ব্যাঙ্গালর থেকে বাসে যার দূরত্ব ১৩/১৪ ঘন্টা।আর আকাশপথে এক ঘন্টা পনের মিনিটের যাত্রা।ট্রেনতো রয়েছেই।তবে করোনার জন্য দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে ট্রেনযাত্রা।আমাদের যাত্রা তাই বাসেই।

দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা মাঝখানে ভেস্তে গেলো করোনার জন্য।এই বছরের শুরুতে করোনার ধকল কাটিয়ে যখন সবেমাত্র পৃথিবী খানিকটা সুস্থ,ফিরতে হয়েছে প্রাত্যহিক জীবনে।তখনই মনেহলো না এত ইচ্ছে বাকি রাখতে নেই।সকালেই টিকেট কনফার্ম সন্ধ্যায় যাত্রা গন্তব্য “সমুদ্র শহর গোয়া”।

আমি এবং বরাবরই হুঠহাঠ প্ল্যান করেই ছুটি।সকালে গোয়ায় যখন পৌঁছালাম তখন ঘড়ির কাটা দশটা পেরিয়ে।আগে ঠিক করতে হবে রুম।গোয়ার সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে শুধু আপনি ঘন্টা বা দিন হিসেবে ভাড়া নিয়ে  নিতে পারবেন সাইকেল,স্কুটি এমনকি কারও।তবে লাইসেন্স থাকতে হবে অবশ্যই।

করোনার জন্য যেমন কিছুটা শান্ত ছিলো বন্ধ ছিলো বেশ কিছু আয়োজন তেমন সদ্য লকডাউন থেকে ছাড়া পাওয়া মানুষজন যেন নিঃশ্বাস নিতে ছুটে এসেছে এই শহরে।

সমুদ শহর মানে গরমতো হবেই।প্রথমেই আমাদের খুজতে হবে রুম।লোকাল অটো ভাড়া করে রওনা দিয়েছি রুমের সন্ধানে।বাজেট প্রাইসে পেয়ে গেলাম পুরনো এক বাংলো বাড়ি টাইপ হোটেল।ব্যস আর কি লাগে হোটেলের ম্যানেজার আবার বাঙ্গালী,কলকাতার।জানালেন কলকাতার প্রচুর মানুষজন এখানে আছে জীবিকার প্রয়োজনে।

রুমে ঢুকে ব্যাগ রেখেই গন্তব্য সমুদ্র।হোটেল থেকে এক মিনিটের দূরত্ব।প্রায় ৩৫টি বিচের এই শহরে আমাদের প্রথম দর্শন কালাঙ্গুটে বিচ।সমুদ্রে হারালে আসলে আর সময়ের হিসেব হয়না।প্রায় দুপুর গড়িয়ে গেলো,সমুদ্রে পাড়েই দুপুরের খাবার সেরে নিয়ে রুমে ফেরা।ফ্রেশ হয়ে বিকেলের গন্তব্য সূর্যাস্ত দেখা।হোটেলেই থাকে স্কুটির ব্যবস্থা লাইসেন্স দেখিয়ে সেখান থেকে স্কুটি নিয়ে নেয়া যায় দিন হিসেবে।২৪ ঘন্টার জন্য ৩০০ রুপি।

স্কুবা ডাইভিং-এ লেখক নিজে

এবার আমাদের গন্তব্য আগোডা ফোর্ট।আগোডা পর্তুগীজ ভাষায় যার অর্থ দাঁড়ায় জলসিক্ত। ১৬১২খ্রীষ্টাব্দে পর্তুগীজরা এই দূর্গ নির্মান করেছিল ডাচদের হতে রক্ষাকবজ হিসেবে। ক্যন্ডোলিম বীচ পাড়ের এই দূর্গে ঢুকতে হয় টিকেট কেটে।এখানে রয়েছে সুদীর্ঘ লাইট হাউস।বলা হয়ে থাকে এটি এশিয়ার অন্যতম পুরনো একটি লাইটহাউস।আগোডা ফোর্ট থেক সূর্যাস্ত দেখতে ততক্ষনে ভিড় জমে গেছে খুব।ডুবো ডুবো সূর্য দেখে বেরিয়ে এলাম আমরা । আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে এবারের গন্তব্য ‘পাড়া রোড’। বলিউডের বহু সিনেমায় দেখা যায় এই রাস্তা।শহর থেকে একটু দূরে রাস্তার দুপাশে সারি সারি নারিকেল গাছ ,পাম্প গাছ মাঝে বয়ে চলা ছিমছাম ছোট্ট রাস্তা।সূর্য ডুবে গেছে ততক্ষনে।শান্ত স্নিগ্ধ পথ পেরিয়ে আবার গন্তব্য শহরের দিকে।পথে আসতে আসতে চোখে পড়বে বেশ কিছু বড় বড় চার্চ।কারণ এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ মূলত খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী।

শহরে ফিরতে ফিরতে ততক্ষনে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত।গোয়া যাবেন আর সামদ্রিক খাবার খাবেন না তাতো হয়না।গোয়ায় খাবার দাবারের দাম একটু বেশি তুলনামূলক।যত সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি রেষ্টূরেন্টে যাবেন দাম তত বাড়তে থাকবে।তবে খাবারের টেস্ট অতুলনীয়।

রাতের খাবার শেষ করে আবার সমুদ্রের পাড়ে।এবার পা রাখতেই এক অন্য ঝলমলে আলো এসে লাগলো।এত রাতেও জেগে আছে বীচ।জোরে জোরে বাজছে গান সবাই ব্যস্ত যার যার মত।কেউ হয়তো সমস্ত বিষন্নতা নিয়ে বসে আছে একটু নির্জনতা খুঁজে আর কেউ কেউ মজে আচে নাচে গানে।একপাশে হয়তো ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে একান্ত সময়ে ব্যস্ত সদ্য বিবাহিত দম্পতি অন্যপাশে সদ্য তারুন্যে পা দেয়া এক ঝাঁক উচ্ছল বন্ধুদের দল ব্যস্ত আড্ডায়,নাচে।

তবে সত্যি হচ্ছে গোয়া মন খারাপ হতে দেয় না।গোয়া কোন বয়স মানে না।তরুন থেকে বুড়ো সবাই সজীব সবাই উচ্ছল এখানে।জীবনটাকে পুরোপুরি উদযাপনের ব্রত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গোয়া।অনেক রাত অব্দি বীচের পাড়ে বসে আড্ডা দিয়ে আমরা ফিরলাম রুমে।

পরদিন আমাদের সবচেয়ে এ্যাডভেঞ্জারাস ডে। গোয়া ওয়াটার এ্যাক্টিভিটিস ডে।সোজা বাংলায় বললে জল কার্যক্রম,পানিতে নানাবিধ কর্ম। হোটেল ম্যানেজারেই জানান দেয় নানা প্যাকেজ সম্পর্কে।আপনি পছন্দের প্যাকেজ পছন্দ করবেন টাকা(রুপী) জমা দিবেন,পরদিন একদম ভোরে গাড়ি এসে নিয়ে যাবে আপনাকে অন্য এক দ্বীপে।শহর ছেড়ে খানিকটা দূরে।

আমাদের প্যাকেজে ছিলো স্কুবা ড্রাইভিং,প্যারাসাইলিং, জেট স্কি,বোট রাইড, ব্যানানা টিউব এবং সেই সাথে সারাদিনের খাবার দাবারও তাদের।প্রচন্ড উত্তেজনা নিয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম।দু ঘন্টার রাস্তা পেরিয়ে গন্তব্য।সেখানে কিছু ব্যাসিক ধারনা দেয়া হয় সবগুলো এ্যাক্টিভিটিস সম্পর্কে।তারপর বোটে করে নিয়ে যাওয়া হলো অন্য এক দ্বীপে।আগে থেকেই রেডি সব ট্রেইনাররা।

জীবনের প্রথম স্কুবা ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা নিতে যাচ্ছি,সাঁতার জানিনা তবু ইচ্ছে বলে কথা।অক্সিজেন সিলিন্ডার মাস্ক পড়িয়ে পানিতে নামিয়ে আমাদের কিছু সাধারন নিয়ম কানুন শিখিয়ে দেয়া হয়।সবচেয়ে মজা লেগেছে যখন তারা বলেছে পানির নিচ থেকে তাদের ভিডিগ্রাফার আমাদের ভিডিও করে রাখবে। ব্যস  উৎসাহ আরো বেড়ে গেলো। সাহস করে নেমে পড়লাম জ্লে। আগে থেকেই শ্বাস প্রশ্বাসের খানিকটা সমস্যা থাকাই শুরুতে একটু সমস্যা হচ্ছিলো অভয় দিলেন ট্রেইনার ভাইটি।কি সুন্দর ইংলিশ বলে তারা।

ভয় কাটিয়ে দিলাম ডুব।যত গভীরে যাচ্ছি সমুদ্রে অপার্থিব সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি।ঝাঁকে ঝাঁকে রঙ বেরঙয়ের মাছ মাছেদের পোনা এসে হাজির চোখের সামনে ধরার চেষ্টা করছি হাত দিয়ে।হুট করে কোথা থেকে ভিডিওগ্রাফার এসে হাজির।প্রায় ৫মিনিট পানির নিচে থেকে উঠে এলাম।পাশে সেই ট্রেইনার ভাইটিও ছিলো যেহেতু আমি সাঁতার জানতাম না।এ এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা।শব্দে সবটা লিখে প্রকাশের সাধ্য আমারো নেই।

তারপরের গন্তব্য অন্যদ্বীপ।সমুদ্রের মাঝখানে হঠাং বোট বন্ধ করে দিয়ে বলা হয় এখান থেকেই শুরু হবে প্যারাসাইলিং। অবাক হলেও মজা লেগেছে এই ভেবে যে পুরো ব্যাপারটাকেই তারা এ্যাডভেঞ্চারের মতই রেখেছে।মাঝ সমুদ্রে শূরু হলো প্যারাসাইলিং।আকাশে উড়াতে উড়াতে ধপাস করে ফেলে দিচ্ছে মাঝ সমুদ্রে। মাঝ সমুদ্রে ডুবিয়ে ফের উঠিয়ে নিচ্ছে আকাশে তারপর বোটে।এমন করে শেষ হলো প্যারাসাইলিংও।তারপর এক এক করে বাকি সব ওয়াটার এ্যাক্টিভিটিসও।

দিন গড়িয়ে বিকেল প্রায়।দুপুরের খাবার শেষ করে ফের রওনা হোটেলের উদ্দেশ্যে।রাতেই বেক করার কথা থাকলেও ওইযে বলেছিলাম এত মানুষের চাপ টিকেট না পাওয়ায় সম্ভব হয়নি।থাকতে হবে আরো একদিন।রাতে গোয়া ঘুরে ঘুরে দেখলাম পুরো শহরটা। নানা টাইপের ক্যাসিনো, ক্লা্‌ব, বার রয়েছে এখানে।মোটামুটি দাম থেকে একদম উচ্চ পর্যায়ের।প্রচন্ড ক্লান্ত থাকায় রুমে ফিরে গেলাম জলদি টুকটাক শপিং শেষ করে।

একদিন বেশি সময় পেয়ে গন্তব্য ঠিক করলাম গোয়ার রাজধানী শহর পানজিম এবং ওল্ড গোয়া।এই ওল্ড গোয়াতেই রয়েছে ‘ব্যাসিলিকা অফ বম জেসাস” গোয়া এবং ভারতের অন্যতম পুরাতন চার্চ। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবেও এই চার্চ তালিকাভূক্ত।এই ওল্ড গোয়ায় দেখা মিলবে পর্তুগীজদের আমলে তৈরি বাসস্থান ঘরবাড়ি।এখনো আছে সেই আদল মানুষজন থাকলেও ঘরের নকশায় কোন পরিবর্তন আনেনি তারা।পর্তুগীজ কলোনি হিসেবে এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন রূপে।

সমুদ্রের পাশ ঘেষে রাস্তা ধরে যেতে হবে ওল্ড গোয়া থেকে পানজিম।ছোট্ট শহর পানজিমের রাস্তা ঘাট বেশ উন্নত।এই শহরে সবচেয় বড় সেতু ‘আতুল সেতুর’ দেখা মেলে যেটি মূলত শহর পানজিম এবং পরভোরিমের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।শহরে ঘুরে এবার আমাদের ফেরার পালা।

পানজিম থেকে এবার আমাদের গন্তব্য বাগা বিচ।গোয়ার সবচেয় ব্যস্ত এবং জনবহুল বিচ বাগা।সেটা বিচে পা রেখেই খুব টের পাওয়া গেলো।অন্যান্য যেকোন বিচের চেয়ে ভীড়টা অনেকবেশি।নানা ধরনের ওয়াটার এ্যাক্টিভিটিস চাইলে এই বিচেও করা যায়।বিদেশিদের আনাগোনাও বেশি এই বিচে। এছাড়া আনজুনা বিচেও রয়েছে বিদেশিদের আনাগোনা।বাগা বিচ থেকে বোট নিয়ে খানিকটা সামনে গেলে দেখা পাওয়া যায় ডলফিনের।

সমুদ্রের পাড়ে মূলত খানিকটা নীরবতাই বেশি ভালো লাগে।এই বিচে বেশিক্ষন থাকা হলোনা। একপাশের পাথুরে বিচে খানিকটা সময় বসে সূর্য ডূবি ডুবি বেলায় এবার ফেরার পালা।এবং ফেরার আগে অবশ্যই বিচের বাইরে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করা কাঁচা কিন্তু মিষ্টি আমের স্বাদ নিতে হবেই।

বহু কাঙ্ক্ষিত গোয়া ভ্রমন শেষের পথে,রুমে ফিরে গোছগাছ করেই বেরিয়ে পড়লাম।বাস ধরতে হবে।প্রতিটা ভ্রমনই অসাধারন কিছু স্মৃতির ঝাপি তুলে দেয় হাতে।গোয়া স্মৃতির সাথে সাথে দিয়েছে অসাধারন সব অভিজ্ঞতাও। সেই সাথে সূর্যের খুব ভালোবাসায় কয়েক পড়ত পোরা চামড়া।

গাড়ী ছুটছে বাস স্টেশনের দিকে ,জানালায় আছড়ে পড়েছে শেষবেলার আলো যেন জানান দিচ্ছে – হাসতা-লা-ভিস্তা ফড়িং….ফের দেখা  এই শহর কিনবা অন্য শহরে……

লেখক : ভারতের ব্যাঙ্গালোর ইউনিভার্সিটির মিডিয়া এন্ড জার্নালিজম বিভাগে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী, পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম’র সাবেক ফিচার সম্পাদক

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button