নীড় পাতা / পার্বত্য পুরাণ / গরীবের ডাক্তার হয়ে তুমি রবে নীরবে
parbatyachattagram

গরীবের ডাক্তার হয়ে তুমি রবে নীরবে

মানুষ আজ মানুষের কাছেই এক বড় আতংকের নাম। সকল পেশার মানুষের মাঝেই রয়েছে অসততার উপাখ্যান। ডাক্তারদের নামেও আছে কলঙ্কের অপবাদ। কারণ কোথাও নেই মানবিকতার ছোঁয়া। অর্থের জন্য সবই আজ সম্ভব হচ্ছে। পিতা হয়ে নিঃষ্পাপ পুত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করতেও বুক কাঁপে না। বাংলা ব্যাকরণে ভাবসম্প্রসারণে পড়া ‘অর্থই সকল অনর্থের মূল’ এখন বাস্তবে দেখা প্রচন্ডভাবে দেখা দিয়েছে সমাজের সর্বস্তরে। কারণ সকল কিছুর উর্ধ্বে এখন অর্থ।
দাদু (অমূল্য চন্দ্র বণিক), তুমি আমাদের নেই আজ প্রায় ২৮ বছর! ২৮ বছর আগেই তুমি আমাদের ছেড়ে আকাশের তারা হয়ে গেছো। আর তোমার বিদায়ের সাথে সাথেই আমাদের পরিবারটা বেশ দৈন্যতায় পড়ে যায়! একদিকে অভিভাবকশূণ্যতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট। সবকিছু কাটিয়ে উঠতে সবাইকে খুব কষ্ট করতে হয়েছে। আরো বেশি কষ্ট করতে হয়েছে, কারণ সে সময় তোমার বড় ছেলের সংসারের প্রতি চরম উদাসীনতা আর মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে পরিবারটা প্রায় বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল। যাক এই ২৮ বছর, অনেক পথ পরিক্রমা পাড়ি দিয়ে আমরা সবাই এখনো জীবন যুদ্ধে টিকে আছি। সবার মুখে শুনেছি, তোমার বড় নাতি হিসেবে আমাদের জমজ দুই ভাইয়ের জন্য তোমার অন্তহীন দুচিন্তা ছিল। বড়দের মুখে আরো শুনেছি, তুমি সবসময় চিন্তা করতে, তোমার দুই নাতিকে যদি তুমি ম্যাট্রিক পাশ করিয়ে যেতে পারতে, তাহলে নাকি তুমি মরেও শান্তি পেতে! তবে দাদু অবশেষে শত প্রতিকূলতার মাঝেও আমরা দুই ভাই ম্যাট্রিক পাশ করেছি! এদিকে তোমার জীবন সায়াহ্নে তোমাকে অসুখ থেকে সুস্থ্য করে তোলার ব্যাকুলতায় তোমারই উপার্জিত যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে, তারপর আর এই সংসারটাকে স্বচ্ছলভাবে চালানোর মতো কোন সুব্যবস্থা ছিল না। শুনেছি, কিছুটা অভিমান থেকেই নাকি তুমি তোমার সারাজীবনের সঞ্চিত অর্থ-বিত্ত কিছুই রেখে যাও নি। কিন্তু তুমি তোমার স্বভাবজাত চিকিৎসা সেবার মহান আদর্শ আর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসার যে বটবৃক্ষ রেখে গেছো, সেই মহীরুহ বটবৃক্ষের সুশীতল বাতাসে আজো, আমরা প্রশান্তির পরশ খুঁজে পাই।

মানুষের কাছে তোমার নাতি হিসেবে বলতে গর্বিতবোধ করি, আর তোমার আদরের দুই নাতিই আজ শুধু ম্যাট্রিক পাশ নয়, ডাবল মাস্টার্স পাশ করেছে, কিন্তু আক্ষেপ আমাদের! তোমাকে শোনাতে পারি নি। তাই, দূর আকাশ পানে চেয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, দাদু, তুমি এসে দেখে যাও, তোমার নাতিরা ‘ম্যাট্রিক ‘পাশ করেছে।
দাদু, জানি না মানুষের সাথে মিশে মানুষের জন্য কিছু করার এই সহজিয়া তাগিদবোধটা তোমার থেকে আমাদের মাঝে কিভাবে সঞ্চারিত হলো? তবুও বাউল রশিদ উদ্দিনের লেখা আর শিল্পী বারী সিদ্দিকী’র কন্ঠে গাওয়া-
‘মানুষ ধর মানুষ ভজ,
শোন বলি রে পাগল মন,
মানুষের ভিতরে মানুষ,
করিতেছে বিরাজন।’ – গানের মাঝে, কিছুটা হলেও মানুষের জন্য কিছু করার মর্মভাব খুঁজে পাই।

সকল অপ্রাপ্তি আর বঞ্চণার মাঝেও গরীব আর সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি তোমার চিকিৎসা সেবার মমত্ববোধ আর দায়বদ্ধতা ভেবে স্বস্তি খুঁজে পাই মহাত্মা লালন সাঁইয়ের কথায় -,
‘‘সহজ মানুষ ভজে দেখনারে মন দিব্যজ্ঞানে
পাবিরে অমূল্য নিধি বর্তমানে,
ভজ মানুষের চরণ দুটি,
নিত্য বস্তু হবে খাঁটি,
মরিলে সব হবে মাটি,
ত্বরায় এই ভেদ লও জেনে।”

দাদু (ডা. অমূল্য চন্দ্র বণিক), তুমি আজ না ফেরার দেশের স্থায়ী বাসিন্দা; জানি আর কখনো, তোমার কুলে শুয়ে গল্প শোনা হবে না, তোমার মতো করে আমাদের কে নিয়ে কেউ ভাববে না। কিন্তু তবুও কেন যেন তোমার অম্লান স্মৃতিটুকু এতদিনে এতটুকুও মলিন হয়নি, বরং হৃদয়ের মনিকুঠায় তুমি আছো, তুমি ছিলে, তুমি থাকবে আমৃত্যু, কারণ তুমিই যে আমাদের অনন্ত অনুপ্রেরণার অনন্য মানুষ…।
কবিগুরু রবি ঠাকুরের ভাষায় –
‘তুমি ররে নীরবে হৃদয়ে মম,
নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমা নিশীথিনী সম।’

 

লেখক : সুমিত বণিক, উন্নয়নকর্মী। বান্দরবান।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

কবি প্রগতি খীসার পাশে দাঁড়ান

থায়রয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত রাঙামাটির গুনীজন প্রগতি খীসা (৪৪)। তিনি একজন কবি ও সাহিত্যিক। প্রকাশিত হয়েছে …

Leave a Reply