খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়িতে প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষক নিয়োগ !

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৩৫৮টি শূন্যপদে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ করা হচ্ছে। এ জন্য গত ২৫ আগস্ট লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, লোক দেখানো পরীক্ষা নেওয়া হলেও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে টাকার ভিত্তিতে। প্রতিটি পদের জন্য সাত লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। জেলা পরিষদের প্রভাবশালী কয়েকজন সদস্য এ টাকা নিচ্ছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পার্বত্য চুক্তির ফলে সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগটি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীন হস্তান্তরিত হয়। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রাক-প্রাথমিক ও শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি ৩) অধীন দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে এবং অন্যান্য রাজস্ব খাতে এসব শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। জেলায় ৩৯২টি শূন্যপদের বিপরীতে ৩৫৮টি নিয়োগ হবে। এ জন্য গত ২৫ আগস্ট জেলা সদরের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন হাজার ২৮৩ পরীক্ষার্থীর জন্য লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। তবে একই দিন শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা থাকায় এক হাজার ৩৫৭ পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন।

কয়েকজন নিয়োগপ্রত্যাশী অভিযোগ করেন, মেধাবিদের বাদ দিতে কৌশল হিসেবে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার দিন লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।

পরীক্ষার্থী চয়নিকা চৌধুরী ফেসবুকে লেখেন, ‘১০টায় পরীক্ষা শুরুর কথা। অথচ ৩০ মিনিট পর প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। সব কেন্দ্রে এ নিয়ম ঘটে। এর আগেই কেন্দ্রের বাইরে কাক্সিক্ষত স্মার্টফোনে প্রশ্নপত্র এসে যায়। এমন বিরল ঘটনার মধ্য দিয়ে পরীক্ষা শুরু হয়। এমনকি খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ কেন্দ্রে ১ নম্বরের জন্য এক হাজার টাকা এই নিয়মে উত্তরপত্র সরবরাহ করা হয়। এমনও প্রার্থী আছেন, যাঁরা ৮০ নম্বরের জন্য ৮০ হাজার টাকা দিয়েছেন। ঘটনাটি সরাসরি দেখার সুযোগ হলেও গোপনীয়তার স্বার্থে পরীক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নাম প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। ’

স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করে, জেলা পরিষদের কতিপয় প্রভাবশালী সদস্য এবং সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের মাধ্যমে পরীক্ষার আগে গভীর রাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। মূলত চার-পাঁচজন সদস্যের কাক্সিক্ষত প্রার্থীদের পাস করাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়েছিল। জনৈক শিক্ষকের মাধ্যমে পরে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র বেচাকেনা হয়। প্রভাবশালী প্রার্থীদের পাস করিয়ে আনতে খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও নতুন কুঁড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকটি কক্ষ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।

পরীক্ষায় অংশ নেওয়া লাকী চাকমা বলেন, ‘প্রশ্নপত্র আগে ফাঁস হয়েছে, এটা শতভাগ নিশ্চিত। না হলে একজন কিভাবে ধারাবাহিকভাবে নকল করছিল?’

খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের জনৈক পরীক্ষার্থী বলেন, ‘যাঁরা স্মার্টফোন সঙ্গে নিয়েছেন, তাঁরা ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ভাইবার, ফেসবুকের ইনবক্স প্রভৃতির মাধ্যমে উত্তর পেয়ে যান। এমনটা সরকারি কলেজ কেন্দ্রেও ঘটেছিল। ’

২৮ আগস্ট ফল প্রকাশিত হলে ক্ষুব্ধ হন অনেক মেধাবি পরীক্ষার্থী। প্রায় দুই হাজার পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সত্ত্বেও মাত্র ৭১০ জনকে পাস দেখানো হয়েছে।

জগৎ চাকমা বলেন, লিখিত পরীক্ষাটি নিছক প্রহসন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সে জন্যই মাত্র ১ঃ২ লোককে মৌখিক পরীক্ষার জন্য বাছাই করা হয়েছে।

স্থানীয় সংবাদকর্মী রুপায়ন তালুকদার জানান, মৌখিক পরীক্ষায় সরকারি বিধিমতে ১ঃ৩ বাছাইয়ের কথা থাকলেও তা ভঙ্গ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সাধন কুমার চাকমা বলেন, ‘সরকারি বিধিমতে যেকোনো নিয়োগে ১ঃ৩ জনকে নির্বাচিত করতে হয়। ’

অবশ্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন বলেন, ‘উপজেলাওয়ারি কোটা সংরক্ষণের সুবিধার্থে জেলা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ঃ৩ বিধি অনুসরণ করা হয়েছে। ’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত সচেতন নাগরিক কমিটির জেলা সভাপতি অধ্যাপক ড. সুধীন কুমার চাকমা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগের নামে ওপেন সিক্রেট টাকার খেলা চলছে। জেলা পরিষদের এমন অনিয়মের পরিবর্তন ঘটানোর আহ্বান জানাই। ’

শিক্ষাবিদ ধর্মরাজ বড়ুয়া অভিযোগ করেন, ‘আগে ফাঁস হওয়া প্রশ্নে লিখিত পরীক্ষায় কী আর যোগ্যতার প্রমাণ মিলবে? জেলা পরিষদের নিয়োগপ্রক্রিয়া অস্বচ্ছ ও অনিয়মের মেধা যাচাই। ’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জেলা সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শিক্ষকের মতো পেশার চাকরিতে বেচাকেনা গ্রহণযোগ্য নয়। অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এ পরিষদেরও অতীতের নিয়োগ মেকানিজম থেকে বেরিয়ে আসতে না পারাটা দুঃখজনক। ’

এ বিষয়ে জেলা পরিষদের সদস্য ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের আহ্বায়ক মংক্যচিং চৌধুরী বলেন, ‘অত্যন্ত স্বচ্ছতার মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া চলছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া বা অনিয়মের সুযোগ নেই। এর চেয়ে ভালোমানের নিয়োগ পরীক্ষা আর সম্ভব নয়।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 5 =

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button