নীড় পাতা / পাহাড়ের রাজনীতি / কোন পথে পাহাড়ের রাজনীতি?
parbatyachattagram

কোন পথে পাহাড়ের রাজনীতি?

তিন পার্বত্য জেলায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও এলাকা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়তই প্রাণ ঝরছে সবুজ পাহাড়ে। তবে এবার খোদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরই হামলা চালিয়েছে অবৈধ অস্ত্রধারীরা। শান্তি চুক্তির দুইশতকে প্রথমবারের মতো গত ১৮ আগস্ট রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলায় গুলিতে এক সেনাসদস্য নিহত হয়েছে। ঘটনার ৫ দিনের মাথায় গত ২৩ আগস্ট রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে সেনাবাহিনীর সাথে গোলাগুলিতে সুমন চাকমা নামের ইউপিডিএফের সশস্ত্র কর্মী নিহত হয়। বাঘাইছড়িতে ফের সেনাটহলে হামলার পর গত ২৬ আগস্ট খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বড়াদম এলাকায় গোলাগুলিতে ইউপিডিএফের তিন সশস্ত্র কর্মী নিহতের ঘটনায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে পাহাড়জুড়ে। প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ করে কেনই বা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে অবৈধ অস্ত্রধারীরা। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে শঙ্কা জেগেছে। অবশ্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করছে, এখনো পাহাড়ের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।

এদিকে বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালার ঘটনায় নিরাপত্তাবাহিনীর সূত্র ইউপিডিএফ দায়ী করলেই ইউপিডিএফ নিহতদের নিজেদের কর্মী স্বীকার করে এসব ঘটনায় উল্টো নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ে এ ধরণের ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতার সাথে এখন প্রশ্ন উঠেছে, কোন পথে এগুচ্ছে পাহাড়ের রাজনীতি?

ফিরে দেখা পাহাড়:
দুই দশক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর হয় যা পরবর্তী শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধি প্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার সঙ্গে এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়। সেই সময় গেরিলা বাহিনীর নেতা তার সকল সদস্যরা অস্ত্র জমা দেয় সরকারকে। চুক্তি পরবর্তী সময়ে সময়ে পাহাড়ের মানুষের মধ্যে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করে। কিন্তু চুক্তি বিরোধীতা করে সন্তু লারমার সংগঠন থেকে বের হয়ে ১৯৯৮ সালে ২৬ জুন ঢাকায় এক কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) আত্মপ্রকাশ করে।

পরবর্তী ২০০১ সালে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা থেকে তিন বিদেশিকে অপহরণের মাধ্যমে ইউপিডিএফ তাদের সংগঠনের জানান দেয়। সেই থেকে শুরু। পাহাড়ে অপহরণের রাজনীতি। আস্তে আস্তে শান্ত পাহাড় আবারো অশান্ত হয়ে উঠে থাকে। শুরু হয় নতুন করে খুন, গুম, অপহরণ ও চাঁদাবাজি, আধিপত্যের খেলা। ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে প্রাণ হারায় কয়েক’শ মানুষ।

২০১০ সালে আবারো সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমতি (জেএসএস) ভেঙে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) নামে নতুন সংগঠন আত্মপ্রকাশ। সর্বশেষ ২০১৭ সালে নভেম্বরে খাগড়াছড়ি জেলায় সাংবাদিক সম্মেলন করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ভেঙে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামের নতুন সংগঠন জন্ম নেয়। এ নিয়ে বর্তমানে পাহাড়ে চারটি আঞ্চলিক দলের তৎপরতা চলছে।

আঞ্চলিকদলগুলো সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সময়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীণ জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও প্রসীত বিকাশ খীসার ইউপিডিএফ এক হয়ে সুধাসিন্ধু খীসার নেতৃত্বাধীন জেএসএস (এমএনলারমা) ও শ্যামল কান্তি চাকমার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) কে চাপে ফেলতে চুক্তির পক্ষের সংগঠন ও বিপক্ষের সংগঠন এক হয় কাজ করতে থাকে।

কতটা শক্তিশালী ইউপিডিএফ:
২০১৮ সালের ৩ মে জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) সহ-সভাপতি ও নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর দিন ৪ মে শক্তিমানের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের যোগদানের পথেই ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর প্রতিষ্ঠাতা তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ ব্রাশফায়ারে ৫জন নিহত হয়। এই আলোচিত দুই হত্যাকান্ডের ঘটনায় ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় হওয়ায় অভিযোগের তীরে থাকে ইউপিডিএফ। তবে জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) হত্যার ঘটনায় ইউপিডিএফকে দায়ী করে।

এর গত ১৮ মার্চ রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে দ্বিতীয়ধাপে উপজেলা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে ফেরারপথে ব্রাশফায়ারে নির্বাচন কর্মকর্তা আটজনকে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায়ও অভিযোগের তীরে ইউপিডিএফ। অবশ্য সবকটি ঘটনা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় হলেও হত্যাকান্ডের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করে ইউপিডিএফ।

গত ২৩ ও ২৬ আগস্ট সেনাবাহিনীর সাথে গোলাগুলিতে ইউপিডিএফ পৃথক ঘটনায় চার কর্মী নিহতের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ইউপিডিএফের শক্তি। তবে ইউপিডিএফ বলছে, কথিত গোলাগুলির নাটক সাজিয়ে ঠা-া মাথায় গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। গোলাগুলির ঘটনা সংঘটিত হয়নি। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকা- ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা এঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার চরম লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছে।

ইউপিডিএফের খাগড়াছড়ি জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা বলেন, ‘গত ২৩ আগস্ট নিহত সুমন তাদের সাবেক কর্মী এবং গত ২৬ আগস্ট নিহত ভুজেন্দ্র লাল চাকমা, নবীন জ্যোতি চাকমা ও রমিল চাকমাকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে। এটি রাষ্ট্রে কাছে সাধারণ মানুষের কাম্য না। যদি সে অপরাধী হয়ে থাকে দেশের প্রচলিত আইনের বিচারের ব্যবস্থা না করে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করা হচ্ছে।’

এসব বিষয়ে কথা হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা সাথে। তিনি বলেন, ‘অস্ত্র হাতে থাকলে সুষ্ঠু ধারায় রাজনীতি আশা করা যায় না। আমরা মনে করি ইউপিডিএফ এর কাছে অবৈধ অস্ত্র আছে এবং তারা সন্তু লারমার জেএসএস সাথে মিলে আমাদের কর্মীদের হত্যার মিশনে নেমেছে। এ বছরের ১৮ মার্চ নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে সরকারি দায়িত্বরদের ওপর সন্ত্রাসী হামলায় সন্তু লারমার জেএসএস ও প্রসীত গ্রুপের ইউপিডেএফ জড়িত। সম্প্রতি সময়ে তারা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায়ও ঘটিয়েছে, যেটা বিভিন্ন মাধ্যমে শুনতে পাচ্ছি। প্রসীত গ্রুপের ইউপিডিএফ কখনো পাহাড়ে শান্তি চাইনি বলে চুক্তির বিরোধিতা করে আসছে।’

অবশ্য এ বিষয়ে কথা বলতে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলের দায়িত্বশীল কোনো নেতা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কী বলছেন সুশীল সমাজ:
রাঙামাটি প্রেসক্লাব সভাপতি সাখাওয়াৎ হোসেন রুবেল বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিস্তীর্ণ গহীন অরণ্য রয়েছে। যেকোন অপরাধ করে লুকিয়ে থাকার সুযোগ রয়েছে। সন্ত্রাসীদের কাছে অবৈধ অস্ত্রের মজুদ অনেক। তারা সরকারকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে বলে আমি মনে করি। সরকারকে নতুন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ভাবতে হবে।

নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ও রাঙামাটি সরকারি কলেজের সাবেক জিএস জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, ‘বিনা যুদ্ধে বিনা কারণে সেনাবাহিনীর একজন সৈনিককে জীবন দিতে হলো। গত ১৮ মার্চ বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারীদের ওপর ব্রাশফায়ার করলো সেই ঘটনায় ৮জনের প্রাণহানির ঘটনার পরই ধারণা করেছিলাম এর চেয়ে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা ছিল আমাদের; এটা তারই বহিঃপ্রকাশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারকে এখনই এই বিষয়ে ভাবতে হবে। নতুন করে যাতে আর একটি প্রাণও অকালে ঝরে না যায়।’

রাঙামাটি পাবলিক কলেজের অধ্যক্ষ তাছাদ্দীক হোসেন কবির বলেন, ‘এখানে যতগুলো আঞ্চলিক সংগঠন আছে, তাদের আদর্শিক কোন দ্বন্দ্ব না। বিভিন্ন সময় সন্ত্রাসীরা আইনে আওতায় আসলেও যথেষ্ট প্রমাণ না থাকায় এরা আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে আবার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যুক্ত হচ্ছে। এসব বিষয়ে সরকারকে যথেষ্ট খেয়াল দেওয়া এখনই উপযুক্ত সময়। পরে এমন একটা অবস্থা তৈরি হবে যাতে সরকার পার্বত্য এলাকায় যে লক্ষ নিয়ে চুক্তি করেছিল সেটি ব্যাহত হবে এবং চুক্তির পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায় কিনা সেটা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।’

রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ছুফি উল্লাহ জানিয়েছেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিছু ঘটনা ঘটছে সে সব ঘটনায় মামলা হচ্ছে। আমরা আপরাধীদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছি।’

Micro Web Technology

আরো দেখুন

অস্ত্রের মুখে রুমায় ৬ গ্রামবাসীকে অপহরণ 

বান্দরবানের রুমায় অস্ত্রের মুখে ৬ গ্রামবাসীকে অপহরণ করেছে সন্ত্রাসীরা।  রোববার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে পুলিশ …

Leave a Reply