ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

কে এই মন্টু?

রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত সাতজনের একজন মন্টু চাকমা। ঘটনার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত গাড়িতে থাকা মন্টু চাকমাকে নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। কোন কোন গণমাধ্যমে নিহত মন্টু চাকমাকে পথচারী, আবার কেউ কেউ গাড়ির চালকের সহযোগি বা হেল্পার বলে প্রচার করা হলেও অনুসন্ধানে নিহত মন্টু চাকমার পরিচয় সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। মন্টু চাকমা কে কিংবা তিনি কি করে ওই গাড়িতে এলেন,সেটাই যেনো এক বিরাট রহস্য হয়ে দেখা দিয়েছে।

পুলিশ বলছে নিহত মন্টু চাকমা গাড়ির হেল্পার ছিল বলেই জেনেছে পুলিশ। কিন্তু জীপ (চাঁদের গাড়ি) চালক সমিতির সভাপতি বলছেন মন্টু চাকমা নামে কেউ চালক বা হেল্পার নেই এবং এই নামে গাড়ীর কোন স্টাফও ছিলো নাহ্ !

ঘটনার দিন আক্রান্ত বহরের চারটি গাড়ির একটি গাড়িতে ছিল শুধুমাত্র বিজিবির সদস্য; সেটি ছিল বহরের প্রথম গাড়ি। বাকি তিনটি গাড়িতে নির্বাচনের দায়িত্বপালনকারিরা ছিলেন। গাড়ি তিনটির দুইটির চালক আল আমিন এবং রুবেল। দুজনেই জানান, মন্টু চাকমা কোন গাড়ির চালক বা হেল্পার নয়। মন্টু কখন, কোথা থেকে গাড়িতে উঠেছে তাও তারা জানতেন না। তারা ভেবেছিলেন গাড়ির সকলেই নির্বাচন সংশ্লিষ্ট লোক। বাঘাইছড়ি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর গাড়ি থেকে হতাহতদের নামানোর সময় তারাহুরোর কারণে মন্টুর লাশ কোন গাড়ি থেকে নামানো হয়েছে তাও মনে নেই কারো। অপর গাড়ির চালক ইসমাইল গুলিবিদ্ধ হয়ে চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সঙ্গত কারণেই তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তবে বাঘাইহাট জীপ চালক সমিতির সভাপতি মো. রহিম জানান, ঘটনার শিকার বহরের তিনটি জীপ গাড়িই আমাদের সমিতির এবং নির্বাচনের দায়িত্ব পালনের জন্য দেওয়া হয়েছিল। রহিম বিডিনিউজকে জানান, গাড়ি তিনটির তিন চালক এবং তিন হেল্পারের মধ্যে একজন চালক ইসমাইল গুলিবিদ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম চিকিৎসাধীন এবং একজন হেল্পার গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। অপর দুই চালক এবং দুই হেল্পার অক্ষত আছেন। রহিম আরো জানান, চালক আল আমিনের গাড়ির হেল্পার সাদ্দাম, সে ঢাকায় চিকিৎসাধীন; সাদ্দামের বাড়ি বাঘাইহাটে। চালক রুবেলের গাড়ির হেল্পার পূর্নজীবন চাকমা, তার বাড়িও বাঘাইহাটে। চালক ইসমাইল চিকিৎসাধীন চট্টগ্রামে। ইসমাইলের গাড়ির হেল্পার ডিপজল চাকমা; তার বাড়ি বাঘাইহাটের হাগলাছড়া এলাকায়। মন্টু চাকমা নামে কোন চালক বা হেল্পার নেই বলেও নিশ্চিত দেন চালক সমিতির সভাপতি মো. রহিম।

মন্টু সম্পর্কে জানতে চাইলে বাঘাইছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এমএ মন্জুর বলেন, ‘মন্টুর পরিচয় পাওয়া গেছে, তার স্বজনরা লাশ নিয়ে দাহ করেছে।’ মন্টুর বিস্তারিত পরিচয় জানতে চাইলে তিনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা বাঘাইছড়ি থানার ওসি (তদন্ত) জাহাঙ্গীর আলম জানান, নিহত মন্টু চাকমা খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের তপতি চাকমার ছেলে। তার বাবা তপতি চাকমাকে সাথে নিয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলার রুপকারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তিনকিলো নামক এলাকায় মন্টুর লাশ বুঝে নিয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে জাহাঙ্গীর আলম মন্টু চাকমাকে গাড়ির হেল্পার বলে জানান, আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্টু হেল্পার বলে লোকমুখে শুনেছিলেন বলেও জানান তিনি।

তবে এই পুলিশ কর্মকর্তার বিপরীত তথ্যই দিয়েছেন কথিত ‘মন্টু চাকমা’র উপজেলা দীঘিনালা থানার অফিসার ইনচার্জ উত্তম চন্দ্র দেব। তিনি জানিয়েছেন, পুলিশের নিয়ম অনুসারেই যদি কোন ব্যক্তি আহত,নিহত বা কোন ঘটনার শিকার হয়,তবে প্রথমেই ওই ব্যক্তির নিজের বাড়ির থানাকেই অবহিত করা হয়,সেই ব্যক্তি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে। আর নিহত হলে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তরের সময় সংশ্লিষ্ট থানার প্রতিনিধিও থাকেন। কিন্তু মন্টু চাকমা নামের কারো বিষয়েই আমাদের কাছে কোন তথ্য চাওয়া হয়নি,আমরা জানিওনা। সুতরাং এই নামের এই উপজেলার কেউ মারা যায়নি বলেই আমরা ধরে নিচ্ছি।’

এ ব্যাপারে জানার জন্য ‘মন্টু চাকমা’র লাশ গ্রহণ করা রুপকারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শ্যামল চাকমা বলেছেন, আমি তো মন্টুকে চিনি না। ঘটনার পর হাসপাতালে গেলে তার লাশ নেয়ার জন্য কয়েকজন আসে এবং পুলিশ আমাকে একটি কাগজে সাক্ষর করতে বললে, আমি সাক্ষর করেছি। কিন্তু সে কে আমি জানিনা।’

অন্যদিকে পুলিশ নিহত মন্টুর বাড়ি খাগড়াছড়ির দীঘিনালার মেরুং ইউনিয়নে বলে জানালেও মেরু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রহমান কবির রতন জানিয়েছেন, আমরা ইউনিয়নে এই নামের বা এই ঘটনায় কেউ মারা গেলে আমি অন্তত জানতাম,আমি কিছুই জানিনা,শুনিওনি।’

গাড়ীবহরে থাকা বাঘাইহাট কেন্দ্রের পোলিং অফিসার ইয়াসমিন আক্তারও জানাতে পারেননি,কে এই মন্টু চাকমা। তিনি জানিয়েছেন, আমাদের কেন্দ্রে এই নামে কেউ ছিলো না। আর গাড়ীতে তো নির্বাচনের কাজের জড়িতরা ছাড়া অন্য কেউই থাকার কথাও না। আমি শুনেছি মন্টু চাকমা গাড়ীর হেল্পার ছিলো।’

আক্রান্ত গাড়ি বহরের সর্বশেষ গাড়িতে ছিলেন আনসারের প্লাটুন কমান্ডার সাশুজ্জামান। সামশুজ্জামান জানান, বাঘাইহাট থেকে যাত্রা করার পর এবং গুলিতে আক্রান্ত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে কোন গাড়ি দাঁড় করানো হয়নি। সে কারণে নিশ্চিত নিহত মন্টু পথচারী নয়। পথচারী হলে তার লাশ পথেই পরে থাকার কথা ছিল। শামশুজ্জামান আরো জানান, তদন্ত কমিটি বৃহষ্পতিবার সরেজমিনে তদন্ত করেছেন। তখন তিনিও তদন্ত কমিটির নিকট ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। বৃহষ্পতিবার তদন্ত কমিটির সাথেই বেশি সময় কেটেছে সামশুজ্জামানের। সামশুজ্জামান জানান, তদন্তকালিন সময়ে ঘটনাস্থল থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলার সময় বেশ কয়েক কয়েকজনের নিকট নিহত মন্টু চাকমার বিষয়টি জানতে চেয়েছেন তদন্ত কমিটি। কিন্তু তার পরিচয় সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি।’ ফলে নিহত মন্টুকে নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছেইনা।

মন্টু চাকমার ব্যাপারে জানতে চাইলে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদিম সারোয়ার জানান, নিহত মন্টু যে নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারীদের কেউ নয় তা নিশ্চিত। তার পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই আসলে এ ব্যাপারে আমার বেশি কিছু জানা নেই।’

অন্যদিকে মন্টু চাকমা নিজেদের দলেরও কেউ নন বা এই নামের কাউকে চিনেন না জানিয়েছেন বাঘাইছড়িতে চেয়ারম্যান নির্বাচিত সুদর্শন চাকমার দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)র মুখপাত্র ও সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত চাকমা। তিনি জানিয়েছেন, আমরা গণমাধ্যমেই মন্টু চাকমার নামটি জেনেছি। সে কে সেটা আমরা জানিনা। আমাদের দলের আর সংশ্লিষ্ট কেউ হলে আমরা নিশ্চিত জানতাম।’

মন্টু চাকমার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারায় তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। মন্টু চাকমা হামলাকারিদেরই কেউ নাকি হামলাকারিদের প্রকৃত টার্গেট,নাকি তৃতীয় কোন পক্ষের,তা নিয়েও চলছে নানান আলোচনা। যদি শেষাবধি এই মন্টু চাকমার পরিচয় নাই মেলে,তবে পাহাড়ের রাজনীতির অসংখ্য বৈচিত্র আর ভূতরে ঘটনার মতো এই মন্টু চাকমাও হারিয়ে যাবেন সময়ের অতল অন্ধকারেই !

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button