রাঙামাটিলিড

কেমন আছে শিক্ষার্থীরা!

শংকর হোড় ॥
মুক্তি ঘোষ। রাঙামাটি শহরের আলফেসানী স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। করোনাকাল না হলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় বসার কথা ছিল। কিন্তু মহামারী করোনার কারণে নষ্ট হল তাদের এক বছর শিক্ষাজীবন। গত বছরের ১৮ মার্চ থেকে বন্ধ হওয়া স্কুল এখনো পর্যন্ত খুলেনি। স্কুল বন্ধ হওয়ার পর ঘরের কাজে মাকে সহায়তা, টিভি-ইন্টারনেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তার জীবন। জীবন বুঝতে পারার পর থেকে স্কুলজীবনে এতটা লম্বা বিরতি পায়নি সে। তাই তো হঠাৎই জীবনে চলে আসলো ছন্দপতন। মুক্তি জানান, স্কুল বন্ধ হওয়ার পর থেকে পড়ালেখায় তেমন একটা মনোযোগ বসাতে পারছি না। পরীক্ষা আদৌ হবে কিনা, হলেও কিভাবে হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। শেষ পর্যন্ত জানতে পারলাম সিলেবাস কাটছাট করে আগামী জুনে পরীক্ষা নেয়া হবে। অথচ তখন আমাদের কলেজে উঠার সময় ছিল।

মুক্তি আরো জানান, স্কুল বন্ধ হওয়ার পর বাসায় তেমন একটা পড়ালেখা হয়নি। সারাদিন মাকে সাহায্য, টিভি-ইন্টারনেটে সময় কেটেছে। প্রথম দিকে প্রাইভেট টিউটর বন্ধ থাকলেও কয়েক মাস আগে থেকে সেটা আবার শুরু হয়েছে। স্কুল যেতে না পারায় মনটা খুব খারাপ ছিল। বন্ধুদের সাথে দেখা হয় না একটা বছর। তবে অনলাইনে মাঝে মধ্যে ক্লাস হয়েছে, যেটা ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা বলে সে জানায়।

মুক্তির মত এমনই অবস্থা সারা দেশের শিক্ষার্থীদের। স্কুল জীবনে এমন লম্বা বিরতিতে পড়েনি কোনও শিক্ষার্থী। যে শৃঙ্খলার মধ্যে এতদিন তারা তাদের শিক্ষাজীবন কাটিয়েছে, গত এক বছরে সেই শৃঙ্খলায় পড়েছে ছেদ। আর এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অলসতা, স্থুলতা বেড়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার কারণে মনোবৈকল্য দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এছাড়া শিশুদের মোবাইল ও ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি বেড়েছে বলে জানান অভিভাবকরা।

ঢাকার নটরডেম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জয়ন্ত বিশ্বাস। থাকে রাঙামাটিতেই। গত এক বছর ধরে ঘরবন্দী সে। অনলাইনে ক্লাস শুরু হলেও বর্তমানে বোর(বিরক্ত) লাগছে বলে জানায় সে। জয়ন্ত বলেন, কলেজে শিক্ষকদের আদর ও শাসনের মধ্যে যে শৃঙ্খল জীবনটা ছিল, সেটা মিস করছি। ক্লাসে বসে যেটা শিখতে পারি, অনলাইনে ক্লাসে সেটা শেখা সম্ভব হয় না। ক্লাস শুরু জরুরি হলেও করোনাকালে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টির পর তবেই ক্লাস শুরুর কথা জানাল জয়ন্ত।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সিল সেন্টারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ইসরাত শারমিন রহমান বিবিসিতে এক সাক্ষাতকারে বলেন, হঠাৎ করে জীবনযাপনের পরিবর্তন শিশুদের উপর প্রভাব ফেলে। অনেক সময় আমরা দেখি যে, অনেকের আচরণগত সমস্যা হচ্ছে, অনেকে প্রচন্ড জেদ করছে, ইমোশনাল রিঅ্যাকশন হচ্ছে, কান্নাকাটি করছে কেউ কেউ, কেউ হয়তো জেদ করে কোন কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে, ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যবহার বাড়ছে।

তিনি বলেন, বয়সে কিছুটা বড় বা কিশোরদের মধ্যে এই প্রতিক্রিয়া কিছুটা ভিন্ন হচ্ছে। একটু বড়রা পরিবারের অন্যদের সাথে দূরত্ব তৈরি করছে, আইসোলেটেড হয়ে আছে, তারা তাদের রুমেই বেশি সময় কাটাচ্ছে, এই বিষয়গুলো হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরণের আচরণগত পরিবর্তন শিশুদেরকে মহামারি পরবর্তী জীবনেও তাদের খাপ-খাইয়ে নিতে অসুবিধার সৃষ্টি করবে।

তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেও সেখানে অন্য শিশুদের সাথে খাপ খাওয়ানো এবং শ্রেণীকক্ষে মনোযোগ বজায় রাখা কষ্টকর হবে শিশুদের জন্য। বছর খানেক ধরে বাচ্চারা যদি একটা রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তারপর যদি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়, সেখানে কিন্তু তাকে খাপ-খাওয়াতে বেগ পেতে হবে। তিনি বলেন, কারণ তখন তারা একা থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। অনেকেই তখন স্কুলে যেতে চাইবে না, বন্ধুদের সাথে মেলামেশা এবং সামাজিকীকরণেও এক ধরণের সমস্যা তৈরি হতে পারে।

আলফেসানি স্কুলের গণিত বিভাগের শিক্ষক উত্তম গোমেজ বলেন, ক্লাস শুরুর পর শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মন বসানোয় আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিবে। এক বছর ধরে ঘরবন্দী থাকার কারণে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলজীবন থেকে তারা বের হয়ে গেছে। এছাড়া বিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ালেখার আগ্রহটা কম তবে তারা বিদ্যালয়ে ফিরতে উদগ্রীব বলে জানান এই শিক্ষক।

এদিকে ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্লাস শুরুর প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে তাদের কক্ষ পরিষ্কারসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

এ বিষয়ে রানী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রণতোষ মল্লিক বলেন, ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ক্লাস শুরুর প্রস্তুতি নিতে সরকারি নির্দেশনার পর আমরা প্রতিটি ক্লাস এন্টিসেপটিক দিয়ে পরিষ্কার করছি। আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। সরকারি নির্দেশনা পাওয়ামাত্র নিরাপদ পরিবেশে আমরা ক্লাস শুরু করবো।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button