নীড় পাতা / ব্রেকিং / কেন প্রতিবছরই ডুবছে ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’
parbatyachattagram

কেন প্রতিবছরই ডুবছে ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’

টানা বৃষ্টি ও উজানের পানিতে কাপ্তাই হ্রদে অস্বাভাবিকভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় ডুবে গেছে রাঙামাটির পর্যটন শিল্পের আকর্ষণ ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’ খ্যাত ঝুলন্ত সেতুটি। গত ১৬ জুলাই বিকেল থেকে সেতুর উপরে ক্রমান্বয়ে পানি উচ্চতা বাড়তে থাকলে ওইদিন বিকেল থেকেই সেতুতে পর্যটক ও জনসাধারণের চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কর্তৃপক্ষ। প্রতিবছরই এই সময়টাতে বিশেষ করে জুলাই-আগস্ট মাসে হ্রদের পানি বাড়লে সেতু ডুবে থাকার কারণে অনেক টাকা রাজস্ব হারাতে হচ্ছে সরকারকে।

জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে রাঙামাটি জেলা শহরের তবলছড়ি এলাকায় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ নয়নাভিরাম সেতুটি নির্মাণ করে। দুই পাহাড়ের মাঝখানে দুটি পিলারের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা দৃষ্টিনন্দন এই সেতুটি পর্যটন শহর রাঙামাটির প্রতীক হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে। কাপ্তাই হ্রদের পানির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১০৯ এমএসএল। স্বাভাবিক নিয়মে কাপ্তাই হ্রদে ১০৪.৬ এমএসএল (মিনস সী লেভেল) পানি থাকলে হ্রদের পানি কাপ্তাই বাঁধের নিগর্মন পথের মাধ্যমে ছেড়ে দিতে হয়। এ বছরও হ্রদের পানি ১০৬ এমএসএল হওয়ায় কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি নির্দেশ মোতাবেক ১২০ এমএসএল পানির উচ্চতার নিচে কোনো ধরণের স্থাপনা নির্মাণের বিধান নেই।

রাঙামাটির পর্যটনশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯৮৬ সালে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিলো কোনো ধরণের পরিকল্পনা ছাড়াই। কাপ্তাই হ্রদে পানির ধারণক্ষমতার নিচে সেতু নির্মাণ করায় প্রতিবছরই এটি ডুবে থাকে। পরিকল্পনাবিহীন ভাবে সেতুটি নির্মাণে কাপ্তাই হ্রদের সর্বোচ্চ স্তরে যাওয়ার পূর্বে ঝুলন্ত সেতুটি পানিতে ডুবে যাচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদের ১০৯ এসএমএল পানির মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের নিয়ম না থাকলেও খোদ তা অমান্য করেছে এই সংস্থাটি। তাই কাপ্তাই হ্রদের পানি সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পূর্বেই ঝুলন্ত সেতুটি ডুবে যায়।

জেলা পর্যটন কমপ্লেক্স সূত্র জানিয়েছে, প্রত্যেকমাসেই ঝুলন্ত সেতুর বিভিন্ন সংস্কার কাজ করতে হয়। এরমধ্যে প্রতিবছর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর হ্রদের পানি কমতে থাকলে সেতুর পানি নেমে যায়। এরপর আমাদের সেতুর পাটাতনসহ বিভিন্ন সংস্কার কাজ করতে হয়। এতে করে প্রতিবছরই সেতু ডুবে থাকার কারণে ৫০-৬০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়।

রাঙামাটির পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লে¬াবাল ভিলেজের পরিচালক হেফাজত সবুজ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারের কোনো ধরণের পরিকল্পনা আমরা দেখছি না। অপরিকল্পিতভাবে এই সেতু নির্মাণ করায় প্রতিবছরই এটি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকার কারণেই এখানে এই শিল্পের উন্নয়ন হচ্ছে না।

উন্নয়নকর্মী লিলিত সি চাকমা বলেন, বলতে গেলে একবার প্রকার পরিকল্পনাহীনভাবে ঝুলন্ত সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ সারাদেশের মানুষ এটিকে ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’ হিসেবে জানে। ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’ যদি এভাবে প্রতিবছর পানিতে ডুবে থাকে তাহলে এটা সিম্বল হলো কীভাবে? এক্ষেত্রে আমি বলবো, এটি ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও অত্যাধুনিক ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা করে নতুনভাবে কিছু করতে করতে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিলেই এ শিল্পের প্রসার ঘটবে। না হয় দিনদিনই পার্বত্য এই শিল্পের অধঃপতন হবে।’

রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়–য়া জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার বিকেল থেকে কাপ্তাই হ্রদের পানি অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় ঝুলন্ত সেতুটি পানিতে তলিয়ে গেছে। যার কারণে সেতুতে পর্যটক ও জনসাধারণের চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে সেতুর আশ-পাশের স্থানে নোটিশ টানিয়ে দিয়েছে। সাধারণত হ্রদের পানি ১০৪ এমএসএল হলে আমাদের ঝুলন্ত সেতুটি পানিতে ডুবে যায়।

তিনি জানান, সেতুটি আরও ওপরে উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আমরা আগেও নির্মাণকাজে নিযুক্ত প্রকৌশলীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করেছি। তারা যেটা জানিয়েছেন, সেতুটি এখন আরও ওপরে তুলে নেওয়ার মত তেমন কোনো অবস্থা নেই। সেতুটি তোলার চেষ্টা করলে বিভিন্নভাবে ভেঙে যাবে। তাই এখন এটি নতুন করে পরিকল্পনা করে এটি তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে বর্ষায় রাঙামাটিতে পর্যটক কিছুটা কম আসে। এরমধ্যে সেতুটি পানিতে ডুবে থাকার কারণে পর্যটক সংখ্যা আরও হ্রাস পায়। এক্ষেত্রে আর্থিকভাবেও আমাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারকেই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাতে হচ্ছে।

এদিকে হ্রদে পানি বৃদ্ধির কারণে হ্রদের পানি সামাল দিতে গত মঙ্গলবার থেকে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। ১৬টি জলকপাট দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ২৫ হাজার কিউসেক পানি কর্ণফুলী নদীতে নিগর্মন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্ণফুলী জল বিদ্যুৎ কেন্দের ব্যবস্থাপক এটিএম আব্দুজ্জাহের।

কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা বিভাগীয় কমিটির সদস্য ও রাঙামাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারি নির্দেশ মোতাবেক হ্রদের পানির রুলকার্ড অনুসারে ১২০ এমএসএল এর নিচে ঘরবাড়ি কিংবা যেকোনো স্থাপনা নির্মাণের কোনো ধরনের বিধান নেই। আমি ঠিক জানি না পর্যটন কর্তৃপক্ষ কীভাবে রুল কার্ডের নিয়ম উপলব্ধি না করে ঝুলন্ত সেতুটি নির্মান করেছেন।

এদিকে গতকাল সকালে রাঙামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণে বৃক্ষ মেলায় আয়োজিত আলোচনা সভায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এস এম শফি কামাল বলেছেন, কাপ্তাই হ্রদের রুলকার্ড অনুসারে ১০৯ এমএসএল এর নিচে যেসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে সেসব স্থাপনা সবই অবৈধ। এছাড়া সরকারিবিধি মোতাবেক ১২০ এমএসএল নিচে ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে যেকোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

বিএম স্পোর্টিং ক্লাবের সহজ জয়

রাঙামাটি ফুটবল একাডেমিকে হারিয়ে টুর্নামেন্টে শুভ সূচনা করল বিএম স্পোর্টিং ক্লাব। ১-০ গোলের ব্যবধানে জয় …

Leave a Reply