রাঙামাটিলিড

কাপ্তাই হ্রদ : কচুরিপানায় বিপর্যস্ত এক দু:খবতী হ্রদ

মিশু মল্লিক
পার্বত্য শহর রাঙামাটিকে ঘিরে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাই হ্রদ। মোট ৭২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই হ্রদের অবস্থান। এই হ্রদ দিয়েই জেলা শহর রাঙামাটির সাথে নৌপথে যোগাযোগ রয়েছে উপজেলাগুলোর। যেখানে বেশিরভাগ উপজেলায় যাতায়তের জন্য এই কাপ্তাই হ্রদই ভরসা। পাশাপাশি কাপ্তাই হ্রদ পর্যটকদের কাছে আকষর্ণের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও সমাদৃত। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত কচুরিপানা যেন গিলে খাচ্ছে কাপ্তাই হ্রদের সৌন্দর্য্যকে। পাশাপাশি কচুরিপানার কারণে লঞ্চ চলাচলও ব্যহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
শহরের রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি ঘাট, ফিসারী ঘাট সংলগ্ন হ্রদ এলাকা, আসামবস্তী, ঝুলন্ত সেতু, সমতাঘাটসহ বেশিরভাগ হ্রদের এলাকাই এখন কচুরিপানাতে পরিপূর্ণ। হ্রদের কিছু অংশের পাড়ে দাড়িঁয়ে যতদূর চোখ যায় শুধু কচুরিপানার জটলা। এতে করে একদিকে যেমন সৌন্দর্য্য হারাচ্ছে কাপ্তাই হ্রদ অন্যদিকে নৌযান চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে।
রাঙামাটি ট্যুরিস্ট বোট চালক সমিতির সিনিয়র সদস্য মোঃ নাছির উদ্দিন বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাপ্তাই হ্রদে কচুরিপানার পরিমাণ খুব বেশি হয়ে গেছে। এতে করে আমাদের বোট নিয়ে চলাচল করতে মারাত্মক অসুবিধা হচ্ছে। কচুরিপানাগুলো আমাদের ছোট বোটগুলোর ফ্যানে আটকে গিয়ে মাঝপথেই ইঞ্জিন বিকল করে দিচ্ছে।
টুরিস্ট বোট সার্ভিস প্রোভাইডার আহমদ রশিদ বলেন, রাঙামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে আকষর্ণের মূল কেন্দ্র হচ্ছে কাপ্তাই হ্রদ। বোটে করে কাপ্তাই হ্রদে ভ্রমণ করতে আগ্রহ বেশি থাকে পর্যটকদের। কিন্তু ইদানিং হ্রদে যে পরিমাণ কচুরিপানা হয়েছে তাতে করে হ্রদ প্রায় দেখা যায়না বললেই চলে। পর্যটকরা এতে হতাশা বোধ করেন। তাছাড়া বোটের ফ্যানে কচুরিপানা আটকে গিয়ে ইঞ্জিন নষ্ট হওয়ার মত ঘটনা তো হারহামেশাই ঘটছে। প্রশাসন যদি কচুরিপানাগুলো অপসারণের ব্যবস্থা করে তাহলে খুবই উপকার হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় সিম্বল অব রাঙামাটি খ্যাত ঝুলন্ত সেতুর নিচেও কচুরিপানার জটলা। ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক রুবেল মিয়া বলেন, রাঙামাটির সৌন্দর্য্যই হচ্ছে কাপ্তাই হ্রদকে ঘিরে। সেই হ্রদে যদি কচুরিপানা জমা হয়ে থাকে তাহলে হ্রদে আর দেখার মত কিছুই থাকেনা। ঝুলন্ত সেতুর আশেপাশেও কচুরিপানার জটলা সত্যিই হতাশাজনক। পর্যটন কর্পোরেশনের এই ব্যাপারে আরো মনযোগী হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা রাঙামাটি জোনের চেয়ারম্যান ও রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দিন সেলিম বলেন, কাপ্তাই হ্রদে কচুরিপানার পরিমাণ দিন দিন আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাহাড়ি ঢলের সাথে এই কচুরিপানাগুলো নিচে নেমে এসে হ্রদে স্থির হয়ে থাকছে। জেলার দশ উপজেলার মধ্যে সাত উপজেলার সাথেই নৌপথে যাতায়াত করতে হয়। কিছু উপজেলা আছে যেখানে নৌপথ ছাড়া আর কোন পথ নেই। কিন্তু কচুরিপানার জটে নৌপথে ট্যুরিস্ট বোটসহ ইঞ্জিনচালিত ছোট-বড় যাত্রী এবং পণ্যবাহী নৌকা চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
এই বিষয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের পরিচালক হেফাজত বারী সবুজ বলেন, কাপ্তাই হ্রদে কচুরিপানা ইদানীংকালে এখানকার মানুষের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন দিন এর পরিমাণ যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে এটি ভবিষ্যতে কাপ্তাই হ্রদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। গতবছর কাইন্দারমুখ নামক স্থানে যেখান থেকে চারটি উপজেলার সাথে যোগাযোগের নৌপথ মিলিত হয়েছে সেখানে কচুরিপানার জন্য যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একই বছরে কচুরিপানার জটে পর্যটকদের একটি ছোট বোট আটকে গিয়ে পরবর্তীতে জাতীয় জরুরি সেবায় ফোন করে উদ্ধার পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যখনই কচুরিপানা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে তখন সনাতনী পদ্ধতিতে সাময়িকভাবে অপসারণ করা হলেও, স্থায়ী কোন সমাধান আজো হয়নি।
কচুরিপানা বৃদ্ধির কারণ বলতে গিয়ে রাঙামাটি সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন বলেন, কচুরিপানা সাধারণত ভাসমান পানিতে জন্মায় না। যেহেতু কাপ্তাই হ্রদের পানি আবদ্ধ এবং হ্রদে এখন পানির প্রবাহ কমে গিয়েছে তাই উজান হতে নেমে আসা কচুরিপানাগুলো স্থির হয়ে আছে। যদিও কচুরিপানা মাছের বংশবৃদ্ধিতে ভালো ভূমিকা রাখে কিন্তু এটি ট্রান্সপোর্টেশন সিষ্টেমে ব্যাঘাত ঘটায়।
কচুরিপানা অপসারণের বিষয়ে তিনি আরো বলেন, কাপ্তাই হ্রদে যেহেতু প্রচুর পরিমাণে মাছ রয়েছে তাই এখানে কোন কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট করা সম্ভব নয়। হ্রদ থেকে কচুরিপানা তুলে ফেলার মাধ্যমেই অপসারণ করতে হবে।
বিভিন্ন বাজারের ঘাটগুলোতে কচুরিপানার জটের কারণে প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামগুলো থেকে উৎপাদিত পণ্য নিয়ে জেলা সদরে বিক্রি করতে আসা ব্যবসায়ীদেরও চরম অসুবিধার সন্মুখীন হতে হচ্ছে। দীর্ঘসময় ধরে বাঁশ দিয়ে কচুরিপানা সরাতে সরাতে পণ্যবোঝাই নৌকাগুলো নিয়ে ঘাটে ভিড়তে পারেন বিক্রেতারা।
স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্পাদক ফজলে এলাহী বলেন, সাধারণত পাশ^বর্তী রাষ্ট্র ভারতের মিজোরাম থেকে এই কচুরিপানার ঝাঁক উজানের মাধ্যমে কাপ্তাই হ্রদে প্রবেশ করে। এখানকার জেলেরা মাছ আহরণের জন্য এই কচুরিপানা আটকে রেখে জাঁক সৃষ্টি করেন। সেই জাঁক দিনদিন বৃদ্ধি পায়। একসময় যখন জাঁক ভাঙ্গা হয় তখন এই কচুরিপানাগুলো হ্রদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। তখন যাতায়াত সহ নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিনের এই সমস্যাটি সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, এই বছর হ্রদে কচুরিপানার পরিমাণ আসলেই বেড়ে গেছে। কচুরিপানা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে রাঙামাটির কয়েকটি ডিপার্টমেন্টের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাথেও আমরা আলোচনা করছি। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের সাথেও আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু তাঁরা আসলে খুব বেশি আগ্রহী নন। তবুও আমরা এই সমস্যা সমাধানের জন্য খুব সিরিয়াসলি ভাবছি। কিছুদিনের মধ্যে আমরা এই বিষয়ে একটি মিটিংয়েরও আয়োজন করতে যাচ্ছি।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × five =

Back to top button