পাহাড়ের অর্থনীতিব্রেকিংরাঙামাটিলিড

কাপ্তাই হ্রদের মাছে বছরে ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্য

দেশের অন্যতম মৎস্য উৎপাদনস্থল

শংকর হোড় 
কাপ্তাই হ্রদ থেকে উৎপাদিত মাছের বাণিজ্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। গত এক বছরে কাপ্তাই হ্রদে মাছের উৎপাদন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বিএফডিসির হিসাবে গত এক বছরে কাপ্তাই হ্রদ থেকে মাছ উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৩০৮ টন। উৎপাদিত মাছের প্রায় অর্ধেক স্থানীয়দের খাবারের যোগান দেয়া ছাড়াও বাকি অর্ধেক মাছ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাজার ও বাইরের বাজারের দামের বিশ্লেষণ করে কাপ্তাই হ্রদের উৎপাদিত মাছ ঘিরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা কেনাবেচা হচ্ছে।

মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনকে প্রাধান্য দিয়ে ষাটের দশকে পুরোনো রাঙামাটি শহরকে ডুবিয়ে প্রমত্তা কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে সৃষ্টি করা হয় কাপ্তাই হ্রদ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াও আরও ছয়টি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই হ্রদে নির্মাণ করা হয়। বর্ষা মৌসুমে এই হ্রদের আয়তন দাঁড়ায় ৬৮ হাজার হেক্টর, শুষ্ক মৌসুমে যেটা নেমে আসে ৪৮হাজার হেক্টরে। কাপ্তাই হ্রদের পানিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিদিনই উৎপাদন হচ্ছে বিদ্যুৎ। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়; এই হ্রদের মৎস্য খাতও বর্তমানে এই এলাকার অর্থনীতিতে বিরাট এক ভূমিকা পালন করছে।

বিএফডিসি সূত্র জানায়, ২০২০-২১ অর্থ বছরে কাপ্তাই হ্রদ থেকে মাছ উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৩০৮ টন। যার মধ্যে অর্ধেক মাছে সরকার রাজস্ব আদায় করেছে। বাকি মাছগুলো স্থানীয়দের খাদ্যের যোগানের জন্য রাজস্ব ছাড়াই বিক্রি করা হয়। রাঙামাটির চারটি মৎস্য অবতরণ ঘাটের হিসাবে গত এক বছরে ৬৭৮০ টন মাছ ঘাটে অবতরণ করেছে। অর্থাৎ এসব মাছ সরকারি রাজস্ব মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এসব মাছ থেকেই সরকার রাজস্ব পেয়েছে ১২ কোটি ১১ লাখ টাকা।

বিএফডিসি সূত্রে আরও জানা যায়, ১৯৬৫-৬৬ অর্থ বছরে মাত্র ১২০৬ দশমিক ৬৩ টন মৎস্য উৎপাদনের মাধ্যমে রাঙামাটি কাপ্তাই হ্রদে বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য উৎপাদন শুরু হয়। সে সময়ের মাছের দাম ও উৎপাদন হিসাবে প্রায় লাখ টাকা মাছের বাণিজ্য হলেও কালের পরিক্রমায় বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদের উৎপাদিত মাছ ও দামের হিসাবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বাণিজ্যে রূপান্তর হয়েছে। বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদের মাছ জেলা ও জেলার বাইরে কেজিপ্রতি প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

১৯৬৫-৬৬ সালে রুই, কাতল, মৃগেল, কালিবাউস ও মহাশোলসহ সামগ্রিকভাবে কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন ছিল মোট মৎস্য অবতরণের প্রায় ৮১.৩৫ শতাংশ; যা ক্রমশ হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ৪ শতাংশ এর নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ছোট মাছ বিশেষ করে চাপিলা, কাচকি, মলা ইত্যাদির পরিমাণ ১৯৬৫-৬৬ সালের রেকর্ডকৃত ৩ শতাংশ থেকে বিগত ৪ দশকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। অথচ কার্পজাতীয় মাছের রাজস্বও বেশি আবার এর মূল্যমানও অনেক বেশি। হ্রদের প্রথম থেকে যে হারে কার্প জাতীয় মাছ আহরণ হত, সে অবস্থান ধরে রাখতে পারলে বর্তমানে হ্রদের মাছের বাণিজ্য হত ৫০০ কোটি টাকার বেশি। রাজস্বও বাড়তো প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। বর্তমানে ছোট মাছ কাচকি, মলা, চাপিলা মাছ থেকে সরকারি রাজস্ব নেয়া হয় ১৭ টাকা আর কার্প জাতীয় মাছ থেকে রাজস্ব নেয়া হয় ৩০ টাকা।

রাঙামাটি জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক উদয়ন বড়–য়া বলেন, আমরা হ্রদের মাছ সরকারি রাজস্ব মিটিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দিই। টনপ্রতি মাছের মধ্যে কাচকি কখনো আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ আবার কখনো সেটা দুই লাখের নিচেও নেমে আসে। আবার কার্প জাতীয় মাছের দাম আর বেশি পাই।

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) রাঙামাটি বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লে. কমান্ডার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, হ্রদের শুরু থেকে প্রতিনিয়ত কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য আহরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। হ্রদের মাছের মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারি রাজস্ব পাওয়া যাচ্ছে তেমনি স্থানীয় মানুষের আমিষের যোগানও দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এই এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে হ্রদের মাছ ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। তিনি আরও বলেন, আমরা রাজস্বের হিসাবটা রাখলেও মাছের উৎপাদন অনুযায়ী হ্রদের মাছে তিনশ কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। আশা রাখছি, বর্তমানে যেসব প্রকল্প চলমান রয়েছে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হলে ভবিষ্যতে এই বাণিজ্য আরো কয়েকগুণ বাড়বে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button