রাঙামাটিলিড

কাউখালীর ৫০ শয্যার হাসপাতালেও নেই ১০ শয্যার জনবল

মো. জয়নাল আবেদীন, কাউখালী ॥
কাউখালী উপজেলার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৮২ সালে সরকার ১০ শয্যা বিশিষ্ট কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চালু করেন। তার কয়েক বছর পরেই কাগজে কলমে ১০ শয্যার হাসপাতালটি ৩১ শয্যায় উন্নিত করা হয়। ২০১৯সাল পর্যন্ত ১০শয্যার হাসপতালকে ৩১ শয্যার হাসপাতাল বলে আসছে কর্তৃপক্ষ। ২০১৯সালের শেষের দিকে ৩১ শয্যা থেকে উন্নিত করে ৫০ শয্যা হাসাপতাল হিসেবে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ৫০ শয্যার নতুন ভবন নির্মাণ শেষে ২০২১ সালে নতুন ভবনে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম শুরু করে কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

কাগজে কলমেও ভবনে ৫০শয্যার হাসপাতাল হলেও জনবল এখনো ১০ শয্যার হিসেবেই রয়ে গেছে। আর এই ১০ শয্যার জনবল দিয়েই চলছে ৫০শয্যার হাসাপাতাল। ১০শয্যায় (কাগজে কলমে ৩১ শয্যা) সব মিলিয়ে জনবল হওয়ার কথা ৯৯ জন। কিন্ত কর্মরত আছে ৭৪ জন। ১০ শয্যার হিসেবেও পদ শূন্য আছে ২৫টি। এর মধ্যে ডাক্তার ও নার্স ক্যাটাগরির ১০টি পদই শূন্য। ফলে জনবল সংকটে ব্যহত হচ্ছে স্বাস্থ্য সেবা।

হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ১০শয্যার হিসেবে বিভিন্ন বিভাগের ডাক্তার ১৪ জন থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছে ৮জন, বাকি জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী এন্ড অবস্), জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারী), জুনিয়র কনসালটেন্ট (এ্যানেসথেসিয়া), আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও সহকারী সার্জন এর মত গুরুত্বপূর্ণ ৬টি পদ শূন্য। সিনিয়র স্টাফ নার্স ১৪ জনের স্থলে আছে ১৩ জন, এখানে ১টি পদ শূন্য। সরকার মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত ও প্রসবকালীন মা ও শিশুর মৃত্যু হার কমাতে মিডওয়াইফদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গুলোতে নিয়োগ দিলেও এখানে ৪টি পদের বিপরীতে ৩টি পদই শূন্য। এই পদে কর্মরত আছে ১জন।

এছাড়াও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) ১টি, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিও) ১টি, উপ সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ২টি, স্বাস্থ্য সহকারী ২টি, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ৩টি পদের মধ্যে ৩টি, অফিস সহায়ক ২টি, বাগান মালী ১টি, ওয়ার্ড বয় ৩টির মধ্যে ৩টি ও পরিছন্নকর্মী ১টি পদ শূন্য।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরাবরে ৫০ শয্যার হাসপাতালে জনবলের জন্য পাঠানো প্রস্তাবনা বলছে বিভিন্ন পদে জনবল প্রয়োজন ২১৩ জন। যেখানে বর্তমানে পদ আছে ৯৯টি আর কর্মরত আছে ৭৪ জন। এত বিপুল সংখ্যক জনবল সংকট থাকায় বিভিন্ন খাতে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে জানা গেছে, রোগীর সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পেলেও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ১০শয্যার হিসেবেই বরাদ্দ পায় এই হাসপাতাল। প্রতিদিন গড়ে আউটডোরে চিকিৎসা নিতে আসেন প্রায় ২০০ রোগী। বহির্বিভাগে ভর্তি থাকে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন। পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডে দৈনিক ১০ বেডের রোগীদের খাবার সরবাহের বরাদ্দ থাকলেও ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা থাকে এর চেয়েও বেশি। ফলে রোগীরা খাবার না পেয়ে বিভিন্ন রকমের কথাও শোনায় দায়িত্বরতদের।

পুরাতন টিনশেডের ভবনে থাকাকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এক্সরে মেশিন পাঠালেও তখন প্রয়োজনীয় কাঠামো ও জনবল না থাকায় সেটি ফেরত দিতে হয়েছে। ৫০শয্যার হাসাপাতাল হিসেবে আল্ট্রাসোনগ্রাফি মেশিন থাকলেও সংশ্লিষ্ট ডাক্তার না থাকায় সেটিও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ডেন্টাল সার্জন পদে একজন কর্মরত থাকলেও প্রয়োজনীয় উপকরণ না থাকায় এ সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী এন্ড অবস্), জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারী), জুনিয়র কনসালটেন্ট (এ্যানেসথেসিয়া) পদগুলো শূন্য থাকায় প্রসবকালীন সময়ে সিজার, সার্জারি সহ অনেক সেবা দিতে না পেতে রেফার করতে হয় রাঙামাটি ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে। পদগুলোশূন্য না থাকলে প্রয়োজনীয় সেবা এখান থেকে পেতে পারতো সেবা গ্রহীতারা। নতুন এই ভবনে অপারেশন থিয়েটার থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। এতে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কাউখালীবাসী।

কাউখালী উপজেলার মানুষ ছাড়াও পাশর্^বর্তী রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেশ কিছু এলাকা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাছে হওয়ায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে আসে এই হাসাপাতালেই। ফলে বাড়তি চাপ সামলাতে হয় এই অল্প সংখ্যক জনবলের।

কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার ইফতেখারুল আলম ফরহাদ জানান প্রয়োজনীয় জনবলের চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। জনবল পেলে আমরা আরও বেটার সেবা দিতে পারবো। বর্তমানে কর্মরত জনবল দিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। পরিছন্নকর্মী, ওয়ার্ড বয়, আয়া পদগুলোও ছোট হলেও ৫০ শয্যার হাসপাতালে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এসব পদগুলো। মুমূর্ষ রোগীদের অনেক বেগ পেতে হয় এই পদ গুলোশূন্য থাকায়। পরিপূর্ণ জনবল পেলে সিজার, সার্জারী, গাইনী, মেডিসিন, শিশুসহ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের কাছ থেকে চিকিৎসা সেবা নিতে পারবে বলেও জানান তিনি।

রাঙামাটি স্বাস্থ্য বিভাগের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. আরেফিন আজিম জানান, জনবল ও কিছু সরঞ্জামাদির জন্য আমরা বারবার চিঠি পাঠাচ্ছি। গত সপ্তাহে কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ডা. সাইদুর রহমান ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. আহমুদুল কবির। তাদেরকেও জনবলের বিষয়ে বলেছি। কিছু ব্যাপারে নতুন ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে খুব দ্রুত গতিতে গাইনি এবং অবস কনসালটেন্ট দিয়ে কাপ্তাই এবং কাউখালীতে ২/৩ মাসের মধ্যে সিজারিয়ান সেকশন চালু করবো। অপারেশন থিয়েটারের বিষয়ে তিনি বলেন, ওটি রুম আছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি দ্রুত দেওয়ার বিষয়ে কথা হয়েছে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight − 7 =

Back to top button