পাহাড়ের অর্থনীতিব্রেকিংরাঙামাটিলিড

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র : ১০০ কোটি টাকার কাজে ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি !

পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে ২ বার দরপত্রের পদ্ধতি, ৫ বার সংশোধন ও ৬ বার সময় বাড়ানো হয়েছে নজিরবিহীনভাবে

শত কোটি টাকার টেন্ডার পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে দিতে দরপত্রের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে দু’বার। সংশোধনী আনা হয়েছে পাঁচ বার। সময় বাড়ানো হয়েছে ছয়বার। নজিরবিহীন এমন ঘটনা সংগঠিত হয়েছে কাপ্তাইয়ে অবস্থিত দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিট সংস্কারের টেন্ডারে। এভাবে সময়ক্ষেপণে অন্তত ২০০ কোটি টাকার ক্ষতিও হয়েছে সরকারের। সংস্কার কাজ যথাসময়ে হলে বিপুল টাকার এসব বিদ্যুৎ যোগ হতো জাতীয় গ্রীডে। শুধু তাই নয়; পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে টেন্ডারের পর পাল্টে ফেলার চেষ্টা হয়েছে কপিরাইট নিয়মও। যে প্রতিষ্ঠানের আবেদনে এত লঙ্কাকান্ড সেটির আবার বিদ্যুৎকেন্দ্রের মত স্পর্শকাতর স্থাপনায় কাজ করার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই বলেও উঠেছে অভিযোগ।
২৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এখন উৎপাদন করছে দৈনিক মাত্র ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। পাঁচটি ইউনিটের স্থলে এখন চালু আছে মাত্র দুটি ইউনিট। তিনটি ইউনিট বন্ধ থাকায় চালু থাকা দুটি ইউনিটকে এখন বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে। এতে করে তৈরি হচ্ছে ঝুঁকি। আবার হচ্ছে আর্থিক ক্ষতিও। গত ছয় মাসে এই ক্ষতির পরিমাণ কম করে হলেও ২০০ কোটি টাকা। প্রসঙ্গত কাপ্তাইয়ে উৎপাদিত প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতে পিডিবি পাচ্ছে ১ টাকা ৫৩ পয়সা। এ হিসেবে ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুতে প্রতিদিন আসার কথা সাড়ে ৬ কোটি টাকা। কিন্তু টেন্ডার নিয়ে নানা টালবাহানায় পাঁচটি ইউনিটে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে। প্রসঙ্গত, এখানে দুটি ইউনিট সংস্কারের টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয় আরও দেড় বছর আগে।
জানতে চাইলে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এটিএম আবদুজ্জ জাহের বলেন, ‘পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে এখন কেবল তিন ও পাঁচ নম্বর ইউনিট উৎপাদনে আছে। এই দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক গড়ে ৭৫ মেগাওয়াট। ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটে জেনারেটরসহ মালামাল সরবরাহ কাজের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। কেন এখনো এটির টেন্ডার চূড়ান্ত হয়নি তা আমার জানা নেই। এ ব্যাপারে ঢাকার দায়িত্বশীলদের সাথে কথা বলুন।’

পিডিবির পরিচালক (ক্রয় শাখা) সৈয়দ একরাম উল্লাহর কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি সর্ম্পকে বিস্তারিত কোন মন্তব্য জানাতে অস্বীকৃতি জানান। একরাম উল্লাহ বলেন, ‘কেন টেন্ডার চূড়ান্ত হচ্ছে না তা বলার এখতিয়ার আমার নেই। এটি নির্ধারণ করেন বোর্ড সদস্যরা। উপর থেকে আসা সিদ্ধান্ত আমরা কেবল বাস্তবায়ন করি।’ পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ না হওয়ায় রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে কী না জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি আর কোন কথা বলতে চাই না।’

জানা গেছে, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪ ও ৫ নং ইউনিটের জেনারেটরসহ মালামাল সরবরাহ কাজের জন্য ডিপিএম ( সরাসরি ক্রয়) পদ্ধতিতে প্রথম টেন্ডার আহ্বান করা হয় ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি। এতে অংশ নেয় জাপানের কপিরাইট প্রাপ্ত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তোশিবা এনার্জি সিস্টেম এন্ড সলিউশান কর্পোরেশন। কপিরাইট নিয়মানুসারে এই দুই ইউনিটের জেনারেটরসহ মালামাল সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট কাজ করতে পারবে শুধু তোশিবা জাপান বা তাদের মনোনীত প্রস্তুতকারক। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের টেন্ডারেও এই শর্ত উল্লেখ আছে। অনুমোদনের জন্য তখন এ প্রস্তাবনা পাঠানো হয় পিডিবির ক্রয় কমিটিতে। কিন্তু ল্যান্ডমার্ক নামে বাংলােেদশী একটি প্রতিষ্ঠান আরও কম দামে কাজ করবে বলে অভিযোগ দেয় ক্রয় কমিটিতে। তারা ডিপিএম পদ্ধতির পরিবর্তে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে টেন্ডার দেয়ারও আহবান জানান। তাদের কথায় সাড়া দিয়ে পিডিবি ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ফের টেন্ডার আহবান করে। এবার দরপত্র দাখিলের সময় নির্ধারণ করা হয় ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি। তবে এই দরপত্রে দরদাতাকে কর্মক্ষেত্র পরিদর্শনের শর্ত দেয়া হয়। এই প্রেক্ষিতে ল্যান্ডমার্ক কোম্পানি তাদের মূল প্রতিষ্ঠান মেসার্স এডিসন ইন্ডিয়া ও মেসার্স ভাউওথ চায়না কর্মক্ষেত্র পরিদর্শন করবে বলে আবেদন করে। কিন্তু নির্ধারিত সময় সীমার মধ্যে তারা কর্মক্ষেত্র পরিদর্শন না করে আবার সময় বাড়ানোর আবেদন করে। এমন আবদন বার বার করায় পিডিবি নজিরবিহীনভাবে সময় বাড়ায় মোট ছয় দফা। সর্বশেষ করোনার অজুহাতে আবার সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে তারা। বার বার দুটি প্রতিষ্ঠানের আবেদনে এভাবে সময় বাড়ানো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার শঙ্কা থাকায় আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে এভাবে সময় বাড়ানোর আবেদন করার কৌশল নেয়া হয়। এসব অপকৌশলের কারণে গত ছয় মাসেও পিডিবি চূড়ান্ত করতে পারেনি সংস্কার কাজের টেন্ডার।

অভিযোগ আছে, টেন্ডারের শর্ত পাল্টাতে অভিন্ন ভাষার হুবহু চিঠি পাঠানো হয়েছে চীনা ও ভারতীয় এই দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে। অথচ বাংলাদেশের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮- এর ৭৬ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘যদি পেটেন্ট, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা ও একক স্বত্বাধিকারের (কপিরাইট) কারণে একই ধরনের পণ্য প্রস্তুতকরণে অন্যদের নিবৃত্ত রাখা হয়, সে ক্ষেত্রে কপিরাইটভুক্ত পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা কেবলমাত্র একক কপিরাইটধারীর নিকট থেকে সংগ্রহ করতে সরাসরি চুক্তি প্রয়োগ করা যাবে।’ কিন্তু চার ও পাঁচ নম্বর ইউনিটে কাজ করতে তৎপর থাকা চীনা ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠান তোশিবা জাপানের কাছ থেকে নেয়নি কোন অনুমোদন। তারপরও তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে চার ও পাঁচ নম্বর ইউনিটের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে নানা কৌশলে। উল্লেখ্য এই দুটি ইউনিটের টেন্ডারে যেসব মালামাল সরবরাহের কথা বলা হয়েছে তা এর আগে কখনই সরবরাহ করেনি এসব প্রতিষ্ঠান।

প্রসঙ্গত, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১৯৬২ সালে নির্মিত হয়। দেশের একমাত্র এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ লাখ ২৫ হাজার কিউসেক পানি নির্গমণ করতে পারে। দুটি ইউনিট দিয়ে শুরু হওয়া এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা প্রথমে ছিল এক লাখ ২০ হাজার কিলোওয়াট। কিন্তু এখন পাঁচটি ইউনিট যুক্ত থাকায় মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক ২৩০ মেগাওয়াট। কিন্তু তিনটি ইউনিট বন্ধ থাকায় গতকালও উৎপাদন হয়েছে গড়ে ৭৫ থেকে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে করে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে সরকারের।

দেশের একমাত্র পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য কর্ণফুলি নদীর উপর ১৯৫৬ সালে এ বাধের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৬০ সালে শেষ হয়। ইন্টারন্যাশানাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানী এবং ইউতাহ ইন্টারন্যাশানাল ইনকর্পোরেট ৬৭০.৬ মিটার দীর্ঘ এবং ৪৫.৭ মিটার উচু এই বাঁধটি তৈরী করে। বাঁধের সুরক্ষা এবং উজানের অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য ১৬টি জল কপাট যুক্ত ৭৪৫ ফুট দৈঘ্য একটি জল নির্গমন পথ বা স্পিলওয়ে রাখা হয়। এই স্পিলেওয়ের প্রতি সেকেন্ডে পানি নির্গমনের ক্ষমতা ৫,২৫,০০০ কিউসেক ফুট।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button