আলোকিত পাহাড়খাগড়াছড়ি

করোনা সংকটে শিক্ষার্থীদের পাশে পানছড়ি অলনাইস

খাগড়াছড়ি জেলার সীমান্তবর্তী পানছড়ি উপজেলায় শিক্ষার্থীদের জন্য ঘরে বসে শেখা; অনলাইন শিক্ষা প্রোগ্রাম এর একমাস পূর্ণ হয়েছে। উপজেলায় গত ১৭ই মে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ডিস্টেন্স লার্ণিং কার্যক্রম শুরু হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায়, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশুনায় যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, ঘরে বসেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে পারে ও যথাসময়ে সিলেবাস শেষ করায় সহায়তার দিক বিবেচনায় এনে এই মহৎ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে সংসদ টেলিভিশন, কিশোর বাতায়ন, জেলা-উপজেলায় যার যেমন সাধ্য, অনলাইন ভিত্তিক ক্লাস পরিচালনা করছেন।

পানছড়ি উপজেলার স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ একত্রিত হয়ে এই কর্মসূচির উদ্যোগ নেন। “অলনাইস শিক্ষা ফাউণ্ডেশন” নামক একটি অরাজনৈতিক শিক্ষা সংগঠন এই কার্যক্রমে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। উপজেলার প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি বিভাগের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ এতে যুক্ত হন। আগামী মাসে কলেজ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। উদ্যোক্তাদের একজন জেমিন চাকমা বলেন, “কোভিড-১৯, করোনা সংকট মোকাবিলায় সরকার মার্চ মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ ঘোষণা করে। ভেবেছিলাম দ্রুতই আবার খুলে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। বরং সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ০৬ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত চিন্তা করে, মে মাসের ১৭ তারিখে আমরা ডিস্টেন্স লার্ণিং এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করি। মোটরসাইকেল দূর্ঘটনায় আমি পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় শুরুর দিকে ক্লাস নিতে পারিনি। ছেলেমেয়েদের কথা চিন্তা করে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ এতে স্বেচ্ছায় যুক্ত হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।”

অনলাইন পাঠদান কার্যক্রমের উদ্যোক্তাগণ হলেন পানছড়ি সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের জেমিন চাকমা, উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের সুভাষ চন্দ্র দেব, পানছড়ি বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক লিটন দাশ, শংকর চাকমা, প্রভাষ রায়, মিনহাজুর রহমান, বিন্দুময় চাকমা, নিখিল চৌধুরী, কিশোর চাকমা অপু, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সুপ্রিয় চাকমা, সুপ্রীতি বড়ুয়া, পুজগাংমুখ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ইন্দ্র লাল চাকমা ও মুসলিম নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুস সালাম, ছোট পানছড়ি উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোজাম্মেল হক, ধুধুকছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেব কুমার চাকমা, হেলাধুলা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তোফাজ্জল হোসেন, লতিবান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সবুজ কুমার ত্রিপুরা, মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জানে আলম, পানছড়ি বাজার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আসমা আক্তার এবং সাইনরাইজ কিন্ডারগার্টেন এন্ড জুনিয়র হাই স্কুল এর শহীদুল ইসলাম, ইমতিয়াজ উদ্দিন হেলাল, জালাল হোসেন ও পানছড়ি ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষক তহিদুর রহমান রুবেল।

ডিস্টেন্স লার্ণিং বা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হলেও বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয়েছে উলে­খ করে কর্মসূচির মূল উদ্যোক্তা ও সমন্বয়ক, আইসিটি ফর এডুকেশন -জেলা অ্যাম্বাসেডর, পাইসিমার শিক্ষক তহিদুর রহমান রুবেল বলেন, “আমাদের ক্লাস প্রচারে প্রথমদিকে নানাবিধ সমস্যা ছিল। শিক্ষক সংকট ছিল। সাউন্ড সিস্টেমে সমস্যা ছিল এবং দুটোরই সমাধান হয়েছে। অলনাইসের সদস্য, শিক্ষক লাপ্রু চাই মারমা ও প্রভাষক ত্রিরতন চাকমা, প্রিয়াশীষ চাকমা, গণপাঠাগার এর লাইব্রেরিয়ান রুপম ত্রিপুরা আমাদেরকে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু মুঠোফোন নেটওয়ার্ক সেবাদাতা কোম্পানীগুলোর নেটওয়ার্ক সেবা আশানুরূপ না হওয়ায় বোর্ডের লেখাগুলো ঝাপসা দেখায়। ভিডিও আটকে যায় এবং ক্লাসের ভিডিওর মান খারাপ হওয়ায়, আমাদের উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হতে পারছে না। নেটওয়ার্ক ভালো না হওয়ায় রেকর্ড ক্লাসও নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা স্থানীয় দুইটি কেবল নেটওয়ার্ক কোম্পানির সহায়তা পাচ্ছি৷ তাঁরা আমাদের ক্লাসগুলো পুনঃপ্রচার করে সহযোগিতা করছে।”

উপজেলার পিছিয়ে পড়া এলাকার একটি উল্টাছড়ি। সেখানকার উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক এই কার্যক্রমের সাথে জড়িত। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বাবুল বলেন, “আমি শিক্ষার্থীদের জন্য সবসময় খুব ভেবেছি। কাজ করেছি। আমরা শুরুতে শিক্ষার্থী না পেলেও, দিনে-রাতে প্রত্যন্ত মরাটিলা থেকে শুরু করে প্রত্যেক গ্রামে গ্রামে খোঁজখবর নিয়েছি অনেক বছর ধরে। তহিদুর রহমান এর উদ্যোগ সত্যই প্রশংসার দাবিদার। নানান প্রতিকূলতা, উপজেলার অবস্থান ও অন্যান্য বাস্তবতার কারণে সকল শিক্ষার্থীরা হয়তো সবগুলো ক্লাস দেখতে পারেনি। তারপরও তহিদ ও অন্যান্য শিক্ষকগণ যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তারজন্য ধন্যবাদ এবং অনেক অনেক শুভকামনা জানাই।

অনলাইনের ক্লাসগুলো নিয়মিত দেখেন এমন একজন অভিভাবক মো: মোসলেম, সংগঠনের সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “বৈশ্বিক ক্লান্তিলগ্নে প্রিয় শিক্ষার্থীদের জন্য আপনারা যেভাবে কষ্ট করে যাচ্ছেন, একজন অভিভাবক হিসেবে আমি কৃতজ্ঞ।”

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button