অরণ্যসুন্দরীকরোনাভাইরাস আপডেটব্রেকিংরাঙামাটিলিড

করোনায় স্থবির পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন খাত

নভেল করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনখাত। এরই মধ্যে স্থানীয় পর্যটন শিল্পের হঠাৎ ধসে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। এই সময়টাতে অলস জীবনযাপন করছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের এই খাতসংশ্লিষ্ট কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। এখনো বেশিরভাগ হোটেল-মোটেল মালিকরা দিতে পারেনি শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন ভাতা। এমন অবস্থা বিরাজ করলে ভবিষ্যৎ নিয়েও বেশ চিন্তিত খাতসংশ্লিষ্টরা।

সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মার্চ থেকে তিন পার্বত্য জেলার সকল পর্যটনস্পট ও বিনোদনকেন্দ্রে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে তিন জেলার সকল হোটেল-মোটেল বন্ধ রাখার নিষেধাজ্ঞাও দেয়া হয়। এতে করে ১৯ মার্চ থেকে অলস জীবনযাপন করছেন পর্যটনখাত সংশ্লিষ্টরা। মৌসুমের শেষ দিকে ২৬ মার্চ কেন্দ্র করে তিন জেলায় যে পরিমাণ পর্যটকের ঢল নামে এবার সেটাও করোনার প্রভাবে শূন্যের কোটায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে স্থানীয় পর্যটনশিল্প ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে কয়েক কোটি টাকার।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে কর্মহীন শ্রমিক-কর্মচারীরা জানিয়েছেন নিজেদের জীবনের শঙ্কার কথা। তারা বলছেন, বিগত দুই সপ্তাহ ধরে তারা অলসহীন জীবনযাপন করছেন। এর মধ্যে তিন পার্বত্য জেলার হোটেল-মোটেল বন্ধ ও পর্যটন স্পটে নিষেধাজ্ঞতা জারির পর থেকে তারা ঘরবন্দি হয়ে আছেন। দিনদিন পুড়িয়ে যাচ্ছে হাতে থাকা টাকা-পয়সাও। এমতাবস্থা চলতে থাকলে কেবল করোনাভাইরাসে নয়, না খেয়েই মরলে হবে তাদের।

এদিকে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন হোটেল-মোটেল, কটেজ ও পর্যটন স্পটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারের সাধারণ ছুটি ঘোষণার আগ থেকেই হোটেল-মোটেল ও পর্যটন স্পটগুলো বন্ধ রয়েছে। পর্যটনে নিষেধাজ্ঞার আরোপের পর থেকে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সব পর্যটনস্পট সরকারি সিদ্ধান্তে বন্ধ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বান্দরবান জেলা আবাসিক হোটেল-মোটেল ও রেস্ট হাউজ মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, গত ১৯ মার্চ থেকে বান্দরবানের সকল হোটেল-মোটেল ও রেস্ট হাউজ বন্ধ রয়েছে। আমাদের সমিতিভুক্ত ৪৫টি হোটেল-মোটেল, রেস্ট ছাড়াও জেলায় মোট ৬০টির আবাসিক হোটেল-মোটেল রয়েছে। করোনার এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এসব হোটেল-মোটেলে কাজ করা প্রায় এক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তা কর্মহীন হয়ে ঘরবন্দি জীবনযাপন করছেন। অনেকেই করোনায় প্রভাবে চলাচল বন্ধ হওয়ার আগেই ঘরে ফিরে গেছেন। সবমিলিয়ে আমাদের এখন আর্থিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক। অনেক হোটেল মালিক এখনো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারেনি। কিন্তু পেট তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তবে নাগাদ এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, তা কেউ জানেনা। এমতাবস্থায় বেশ দুর্চিন্তায় পড়েছি।

খাগড়াছড়ি জীপ সমিতির লাইনম্যান অরুণ কুমার দে জানিয়েছেন, গত ১৯ মার্চ থেকে খাগড়াছড়িতে চলাচলকারী সকল জীপ ও পিকআপ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ জেলায় মোট ২০০টির মতো পর্যটনবাহী পিকআপ ও ২৫০টির মতো পর্যটকবাহী জীপ রয়েছে। এসব পিকআপ ও জীপের চালিয়ে জীবিকানির্বাহ করে থাকে দেড়-দুই হাজার শ্রমিক। এখন করোনার এই সংকটকালীন সময়ে সবাই বেকার হয়েছে অলসভাবে দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে এই সেক্টরে যারা কর্মজীবী এরা সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। এদের কয়েকদিন পর দিনানিপাত খেতেও কষ্ট হবে। জানিনা এরকম চলতে থাকলে দেশের কত মানুষ যে না খেয়ে মারা যায়।

খাগড়াছড়ি জেলা পর্যটন মোটেলের ব্যবস্থাপক একেএম রফিকুল ইসলাম বলেন, পর্যটন শিল্পে নিষেধাজ্ঞার কারণে আমাদের শ্রমিক-কর্মচারীরা কয়েকজন ছাড়া বাকীরা সবাই ছুটিতে আছেন। এই মহামারীতে দেশের পর্যটন শিল্পে কত বড় ধস হয়েছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাড়তি যোগ হয়েছে দুর্চিন্তা। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের বেতন ভাতা পাওনা নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হবে।

রাঙামাটির সাজেক কটেজ এন্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েনের সভাপতি সুপর্ন দেব বর্মণ বলেন, পাহাড়ের পর্যটনম্পটে ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় সাজেকে এখন কোনো পর্যটন নেই। মৌসুমের এই শেষ সময়টাতে আমাদের মোটামুটি ভালোই ব্যবসা হতো। এ বছরও ২৬-২৮ মার্চ পর্যন্ত সাজেকের প্রায় সব কটেজ-রিসোর্টে ৬০-৭০ শতাংশ অগ্রিম বুকিং ছিলো। এখন সবারই বুকিং বাতিল হয়ে গেছে। সাজেকে মোট ১০৬টি কটেজ-রিসোর্ট রয়েছে। আমাদের হিসাব মতে, যদি সাজেকে মোটামুটি পর্যটকের সমাগম হয়; তাহলে গাড়ি, রেষ্টুরেন্ট, কটেজ ও রিসোর্টসহ সব দিকের হিসেবে প্রতিদিন ৮০ লাখ টাকার বেশি ব্যবসা হয়ে থাকে। বর্তমানে সাজেক ভ্রমণের এই নিষেধাজ্ঞা দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তোলা হবে না। এতে করে আমাদের হাজারের অধিক শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে আছেন। এ কারণে আমাদের কত কোটি টাকার ব্যবসা যে থমকে গেছে সেটা হিসেব করাও বেশ বড় ব্যাপার।

রাঙামাটি পর্যটন বোট মালিক সমিতির সহসভাপতি ও পর্যটন বোটঘাটের ম্যানেজার মো. রমজান আলী জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার পর থেকেই শতাধিক ইঞ্জিনচালিত ট্যুরিস্টবোট অলস পড়ে আছে। অলস সময় কাটাচ্ছেন চালক-মালিকরাও। ২৬ মার্চকে কেন্দ্র করে রাঙামাটিতে বেশ সংখ্যক পর্যটক আসার সম্ভাবনা ছিলো। কিন্তু করোনার কারণে সেটাও ভেস্তে গেছে। আমাদের হিসেবে প্রতিদিন যদি ৫০টি বোট ভাড়া হয়, তবে ২-৩ লাখ টাকা ব্যবসা হয়ে থাকে। এ খাতে যারা কাজ করে সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। এখন অনেকেই খুব কষ্টের জীবনযাপন করছেন।

রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়ুয়া জানিয়েছেন, ২৬ মার্চ কেন্দ্র করে আমাদের ৫০ লাখ টাকার ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। কিন্তু মার্চের শুরু থেকে ৮-৯ মার্চ পর্যন্ত ১৩-১৪ লাখ টাকা ব্যবসা হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর অগ্রিম বুকিংও সব বাতিল হয়েছে। প্রায় ৩৫-৩৬ লাখ টাকা কম ব্যবসা হয়েছে এই সময়টাতে। তিনি বলেন, আমাদের ঝুলন্ত সেতু ছাড়াও হোটেল-মোটেল ও রেষ্টুরেন্ট ব্যবসা ভালো হতো। তবে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্থানীয় পর্যটকের সমাগম না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।

রাঙামাটি জেলা আবাসিক হোটেল-মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মঈনুদ্দীন সেলিম জানান, পর্যটন স্পট ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ও হোটেল-মোটেল বন্ধের সিদ্ধান্তের পর থেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছে রাঙ্গামাটির এইখাতের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহ করা মানুষগুলো। যারা আগে তিন বেলা খেত, হয়ত তারা এখন দুই বেলা খেয়ে জীবনযাপন করছেন। করোনা মহামারীর কারণে এখন আমরাও বেকার হয়ে অলস জীবনযাপন করছি। এরমধ্যে আমাদের আবাসিক হোটেল-মোটেলে কাজ করা নিম্ন আয়ের মানুষগুলো আরও বেশি দুর্ভোগে আছেন। অনেকেই এমন অবস্থায় এসব নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের বেতন দিতে সক্ষম হয়নি। এ মিলিয়ে আসলে দেশের কোনো মানুষই ভালো নেই। তিনি জানান, রাঙামাটিতে সমিতির আওতাভুক্ত হোটেল-মোটেলে সংখ্যা ৪৫টি। এছাড়া সমিতির আওতাভুক্ত ছাড়া সবমিলিয়ে ৫০ টির মতো হোটেল-মোটেল রয়েছে। এই অবস্থায় বেকার আছেন ৪৫০-৫০০ জন হোটেল কর্মচারী। এমতাবস্থায় ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় রাঙামাটিতে সরকারিভাবে ১০০ মেট্রিকটন খাদ্যশস্য ও ১০ লাখ টাকা এসেছে। আমরা উপজেলায় পর্যায়েও এই খাদ্যশস্য ও অর্থ প্রেরণ করেছি। সমাজের নি¤œআয়ের মানুষদের মাঝে এসব খাদ্যশস্য অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button