করোনাভাইরাস আপডেটব্রেকিংরাঙামাটিলিড

করোনাবন্দি জীবনের সঙ্গী মোবাইল-ল্যাপটপ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক( সম্মান)’র ছাত্র চলন্ত চাকমা। নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবের দেশজুড়ে সরকারের সাধারণ ছুটি ঘোষণার পরপরই গিয়ে উঠেছেন বাড়ি খাগড়াছড়ির দীঘিনালায়। এখন গ্রামের বাড়িতে প্রকৃতির মাঝে গিয়েও তেমন একটা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। যার কারণে মোবাইল ফোন তার নিত্যসঙ্গী। একই অবস্থা বান্দরবানের জেসমিন ও রাঙামাটির নিউটনের। করোনায় গৃহবন্দি হয়ে মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ এই দুই যন্ত্রে সিমেনা দেখা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারই যেন তাদের ডেইলি-রুটিন।

তাদের মত একই কথা জানালেন রাঙামাটির সাংস্কৃতিক কর্মী সুপ্রিয় চাকমা। দিনের বড় একটি সময় তিনিও ব্যয় করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সুপ্রিয় চাকমা জানিয়েছেন, প্রতিদিন গড়ে দশঘন্টার মত সময়কাটে আমার অনলাইনে। দৈনিক তিন জিপি মেগাবাইট কিনতে হয় তাকে।

নিউটন চাকমা বলেন, অঘোষিত লকডাউন শুরু হওয়ার আগেই গ্রামের বাড়িতে আসলাম। এখন এখানে এসেও একেবারেই ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছি। ঘর থেকে বের হতে পারছিনা। তাই এলাকার সময়বয়সী ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গেও মেলামেশা বন্ধ হয়েছে। ফলে পুরো দিনের বেশির সময়ই কাটছে স্মার্ট ফোনে। সারাদিন ফেসবুকেও থাকতে মন চায় না। তাই কখনো মুভি দেখি আবার কখনো ফানি ভিডিও দেখে সময় কাটছে। অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহারে ক্ষতি আছে জেনেও আমরা এখন অবসর সময়টা কাটানোর চেষ্টা করছি।

এদিকে তাহমিনা আক্তার সুমাইয়া নামের এক তরুণী বলেন, আমি যতটুকু পারছি অনলাইনে না থাকার চেষ্টা করছি। গৃহস্থলী কাজ করাসহ বিভিন্ন বই পড়ছি। অথচ অনেকেই অনলাইন আর টেলিভিশন দেখেই অলস সময় কাটাচ্ছেন।

মূলত নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বন্ধ রয়েছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। সাধারণ ছুটির কারণে জরুরি সেবার বাইরে সব কর্মজীবীই এখন অবসরে। খেলার মাঠ, চায়ের দোকানের আড্ডা, আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানো, সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠান কিংবা উপাসনালয়ে গিয়ে প্রার্থনা, কিছুই করার সুযোগ নেই। ফলে এখন অনেকটা বাধ্য হয়েই প্রযুক্তিসামগ্রীতে নির্ভর করতে হচ্ছে ঘরবন্দি এসব মানুষকে। বিশেষত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ আর টেলিভিশনই হয়ে উঠছে এ করোনা দিনে তাদের সঙ্গী। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ইউটিউব, এসব অনলাইন দুনিয়াই এখন ঘরবন্দি মানুষের জগৎ।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনের বড় একটি সময়জুড়ে মোবাইল ও ল্যাপটপ নিয়ে পড়ে থাকার কারণে শারীরিক ও মানসিক দুই ধরনেরই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এদিকে বিশিষ্টজনরা বলছেন, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন দেখে সময় কাটানোর চেয়ে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন উপন্যাস, কবিতাসহ বিভিন্ন ধরণের বই পড়লে মানুষের জ্ঞানের পরিথি আরও যেমনি বাড়বে তেমনিভাবে কমবে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, একনাগাড়ে এসব ডিভাইস ব্যবহারের কারণে ঘাড় ব্যথা, চোখের সমস্যা, মাথা ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। যাদের ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশন রয়েছে, সেটির মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি কমে আসায় মুটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর মানসিক সমস্যার মধ্যে রয়েছে, মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ নিয়ে পড়ে থাকার এ অভ্যাস আসক্তিতে রূপ নিতে পারে। এ ধরনের ডিভাইস দীর্ঘক্ষণ ব্যবহারের কারণে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, ঘুমের ক্ষেত্রেও সমস্যার সৃষ্টি হয়।

রাঙামাটির প্রবীণ নাগরিক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, বিশেষত সমাজের যুবকরাই অনলাইন কিংবা স্যোশাল মিডিয়া নির্ভর হয়ে পড়েছে। সেটা কেবল করোনার এই ঘরবন্দি জীবনে নয়, এর আগে থেকেই। সবাইকেই একটা কথা ভাবতে হবে আমাদের স্বাধীনতা এমনিভাবে আসেনি। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সাহিত্য ও জ্ঞান আরাধনা। কিন্তু এখন যুবকেরা ইতিহাস জানার চেয়েও অনলাইন স্যোশাল মিডিয়া নির্ভর। এতে করে সঠিক ইতিহাস জানা থেকে তারা বরাবরই বিরত থাকছেন।

তিনি বলেন, আমাদের পাঠ্যবইয়ের বাহিরেও বিভিন্ন ধরণের পড়াশোনা বাড়াতে হবে। যে পড়াশোনা আমাদের মস্তিস্ককে শাণিত করবে এবং নিজেকে দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলবে। আর মানুষের জানার পরিথি যত বাড়বে মানুষ তত বেশি দেশপ্রেমিক ও মানবিক হয়ে উঠবেন। তাই আমি সকলকে আহ্বান জানাব, কেবল সারাক্ষণ মোবাইল ফোন ল্যাপটপে পড়ে না থেকে পড়াশোনা বাড়াতে।

রাঙামাটির প্রাক্তন সিভিল সার্জন ও রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের প্রকল্প পরিচালক ডা. শহীদ তালুকদার মনে করেন, অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহার করলে বিশেষত অনেকের গাঢ় ব্যথা, চোখের ক্ষতি ও মাথা ব্যথা দেখা দিতে পারেন। আবার ইলেকট্রনিক্স ভিভাইস ব্যবহারের ফলে ঘুম কম হলে সেক্ষেত্রে ডায়াবেটিস প্রেসারসহ অন্যান্য দুরারোগ্য রোগের মাত্রা বাড়তে পারে। এছাড়া কম বয়সী শিশুদের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস থেকে যতবেশি দূরে রাখার যায় সেই চেষ্টা করতে হবে। সর্বোপরি এসব যন্ত্রাংশ যত কম ব্যবহার করা যায়, ততই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button