পাহাড়ের রাজনীতিরাঙামাটিলিড

এক সকালে নাস্তার টেবিলে দীপংকরের চাঁচাছোলা যত কথা

‘আজ সেই জেএসএসের কী অবস্থা ?’ ‘মনিস্বপন আজ কোথায়? ‘

পার্বত্য চুক্তির দুই যুগপূর্তি উপলক্ষে রাঙামাটির কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সাথে পূর্বনির্ধারিত সময়,সোমবার সকালে নিজ বাসায় নাস্তায় টেবিলে মিলিত হয়েছিলেন রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার। টিভি সাংবাদিকদের  আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদানের পর নাস্তার টেবিলে খোলামেলা আলোচনায় সাংবাদিকদের বলেছেন পাহাড়ের আরো নানান বিষয় নিয়ে নিজের মতামত। এর কোনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ আবার কোনটি রসিকতায় ভরা, আবার কোন কোনটি একদম চাঁচাছোলা। পার্বত্য রাজনীতির অন্যতম অভিজ্ঞ এই নেতা ও বহুবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদারের চম্পকনগরের বাসায় সোমবার সকালের নাস্তার টেবিলে উপস্থিত ছিলেন পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম’র নির্বাহী সম্পাদক হেফাজত সবুজ। তিনি জানাচ্ছেন সেই কথোপকথনের চুম্বক অংশ, আমাদের পাঠকদের জন্য।

প্রসঙ্গক্রমে দীপংকর তালুকদার সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) চুক্তির দুইযুগ পূর্তি উপলক্ষে কি বক্তব্য দিয়েছে। জবাবে গণমাধ্যমকর্মীরা জানান, তাদের (জেএসএস)’র বক্তব্য নেয়ার মত কোন নেতাকে মাঠে পাওয়া যাচ্ছে না।’ তখন কৌতুহলি দীপংকর পাল্টা প্রশ্ন করেন-‘কোথায় গেল তারা?. এই প্রশ্নের জবাব অবশ্য ছিলো না সাংবাদিকদের কাছেও।

এসময় দীপংকর তালুকদার প্রয়াত শ্রদ্ধেয় বনভন্তেকে স্মরণ করে বলেন, ‘ কিছু কথা বলি, ২০০১ সালে মনিস্বপন দেওয়ান নির্বাচনে দাঁড়িয়ে বনভন্তের কাছে আশির্বাদের জন্য গিয়েছিলেন, তখন ভন্তে বলেছিলেন- তুমি নির্বাচনে যাচ্ছ কেন? এখানে তোমার মানহানি হবে। প্রার্থনা শেষে আমার এলাকার মহিলারা বাসায় ফেরার পথে আমার সহধর্মীনিকে বলেছিলো, হয়ে গেছে, দাদা (দীপংকর) এমপি হয়ে যাবেন, কারণ ভন্তে এই এই কথা বলেছেন। তারপর নির্বাচন হলো, কিন্তু জিতল মনিস্বপন দেওয়ান, উপমন্ত্রী হলেন। প্রশ্ন আসে তাহলে কি বনভন্তে ভুল বলেছিলেন? না, তিনি ভুল বলেননি। সাময়িক যশ-খ্যাতি হয়তো তিনি (মনিস্বপন) পেয়েছিলেন। বর্তমানে তার কি অবস্থা সেটা একটু খেয়াল করে দেখেন। কোথায় আছেন তিনি ? ওনার (মনিস্বপন)’র সম্মান বেড়েছে না কমেছে ?’

দীপংকর বলেন- ‘একইভাবে এই জেএসএস নিয়েও ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন বনভন্তে। বলেছিলেন এক সময় জেএসএস সব দখল করে নিবে, চারদিকে তাদের জয়জয়কার ভাব থাকবে। পরে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এখনতো দেখি তেমনটাই হয়েছে। ২০১৪ সালে তারা সংসদ নির্বাচনে জিতলেন, উপজেলায় জিতলেন, এমন কি ইউনিয়ন পরিষদেও তারা জিতে পুরো রাঙামাটি তাদের নিয়ন্ত্রন বিস্তার করলেন। আমাদের নেতাকর্মীকে হত্যা নির্যাতন করে এমন ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করলো যে আমাদের যোগ্য জনপ্রিয় লোক থাকার পরও তারা নির্বাচন করতে সাহস পাচ্ছিল না। আজ সেই জেএসএসের কী অবস্থা ? সেটা আমি আর কি বলবো, আপনারাই তো বললেন, বক্তব্য নেয়ার মত কোন লোক খুঁজে পাচ্ছেনা। এখানেও বনভন্তের কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে।’

দীপংকর তালুকদার আরো বলেন, ‘নেতৃত্ব দেয়া এত সহজ নয়, সেটা সকলকে বুঝতে হবে। যে স্বপ্ন নিয়ে ফরাসী বিপ্লব হয়েছিলো, সেটা কি সাথে সাথে বাস্তবায়ন হয়েছিল ? তা হয়নি, তার জন্য প্রায় একশ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। ১০০ বছর পরে পৃথিবীতে সেই সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম হয়েছিলো।’

‘জেএসএস কি গা ঢাকা দিয়ে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করছে কিনা’ এমন আলাপচারিতার জবাবে দীপংকর বলেন, এটা কি সম্ভব? সন্তু লারমা কি আর জঙ্গলে ফিরে যেতে পারবেন? বা যে সকল শান্তিবাহিনী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন, তাদের কি আবার সশস্ত্র সংগ্রামে ফিরিয়ে নিতে পারবেন সন্তু লারমা? পারবেন না।’

‘এখন পাহাড়ে উন্নয়ন হয়েছে, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ছে। তাই তারা আর লোক পাচ্ছে না। এরা তো অল্প শিক্ষিত ছেলেগুলোকে দলে ভিড়িয়ে তাদের হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দিচ্ছিলো। এখন তো অবস্থা আরও খারাপ, চাঁদাবাজি করতে পারছেনা বলে বেতনও নাকি দিতে পারেনা। তাই তার মরিয়া হয়ে ওঠেছে। কি করবে বুঝে ওঠতে পারছে না। এখনো কিছু কিছু মানুষ তাদের সন্তানদের হয়তো একাজে পাঠান, এলাকায় দাপট নিয়ে চলার জন্য। তবে এ সংখ্যাটা খুবই সীমিত হয়ে গেছে। সরকারও পাহাড়ে বিভিন্ন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করছে। মানুষের আয়ের পথ সুগম হচ্ছে, এর ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই যে গুটি কয়েক মানুষ তারা পাচ্ছে সেটাও আর পাবেনা। কারণ সবাই শান্তি ও নিরাপদ জীবন যাপন করতে চায়।’

আলাপচারিতায় রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়ক চার লেন করা প্রসঙ্গে দীপংকর তালুকদার বলেন, সম্প্রতি রাউজানের একটি সড়ক উদ্বোধন হয়েছে, সেখানে রাঙামাটি থেকেও বেশ কিছু নেতাকর্মী গিয়েছিলো। ভিডিও কনফারেন্সে সড়কটি উদ্বোধন করেন আমাদের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের। সেখানে রাঙামাটিবাসীর পক্ষে রাউজানের এমপি ফজলে করিম চৌধুরী প্রসঙ্গটির অবতারণা করলে সড়ক ও সেতু মন্ত্রী বলেছেন রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়কের বাকি অংশ চার লেন করার প্রকল্পটি অগ্রাধিকার বিবেচনায় আছে, আলোচনা চলছে, সরকারি ফান্ডে কাজ করা হবে নাকি এডিপি বা অন্য কোন মাধ্যমে অর্থ বরাদ্ধ করা হবে সেটা নিয়ে কথা হচ্ছে। সহসাই সুখবর পাবে রাঙামাটিবাসি।’

পার্বত্য চট্টগ্রামে রেল সংযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, নেত্রীর ইচ্ছা পাহাড়ে রেল লাইন হোক, সেটাও আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীন চান এখানে রেল চলুক, চট্টগ্রাম থেকে লাইন আসবে কাপ্তাই, কাপ্তাই থেকে সেই রেললাইন যাবে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। পাহাড় কেটে নয় বরং উন্নত বিশ্বের মত পাহাড়ের ভেতর দিয়ে ছোট ছোট টানেল করে করা হবে এই রেল লাইন। যা মানুষ দেখতে আসবে, উপভোগ করবে।’

‘তবে এটি একটি মেগা প্রকল্প, এটির বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। জনগণ আওয়ামীলীগকে ধারাবাহিক ক্ষমতায় রেখেছে বলেই দেশে আজ বহু মেগা প্রকল্প হাতে নিতে পেরেছে এবং অনেক মেগা প্রকল্পের কাজও শেষ হয়ে গেছে। পাহাড়ে রেল চলা দেখতে চাইলে জনগণকে আবারও সরকারের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। আশা করি আগামীতেও দেশের জনগণ আওয়ামীলীগকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দিবেন।’

প্রায় ৩৫ মিনিট নাস্তার টেবিলে আলোচনায় বেশ প্রানবন্ত ছিলেন এই নেতা। পরটা, সবজী, মুরগীর মাংস, কলা আর মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়িত করা হয় গনমাধ্যমকর্মীদের, অতপর চা পানের মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটে এই কথোপকথনের। বহুদিন পর স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে প্রাণখুলে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে কথা বললেন পাহাড়ের রাজনীতির বরপুত্রখ্যাত ‘দাদা দীপংকর তালুকদার’।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button