খোলা জানালাব্রেকিং

এক পরাজিত বিকেলের কথা

স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ

৩০ জুলাই। ১৯৭১ সালের এই দিনটি এক পরাজিত বিকেলের স্মৃতি হয়ে মনের মনিকোঠায় ভাস্বর হয়ে আছে। এদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর, দোকানপাট পুড়িয়ে দেয়। এক অসম যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীকে পরাজিত করে।

৩০ জুলাই ১৯৭১। সময় দুপুরবেলা। পাকিস্তানি আর্মির একটি ছোট্ট কনভয় নোয়াখালি জেলাশহর ছাড়িয়ে লক্ষ্মীপুর বেগমগঞ্জ সড়কের বটতলি থেকে উত্তরের মাটির রাস্তা মাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে। বহরে দু’টো জীপ আর তিনটা ফৌজি ট্রাক। খোলা ট্টাকের উপরিভাগে কাঁচা ডালপালার আচ্ছাদন। গোঁ গোঁ আওয়াজ তুলে চারটি গাড়ি চৌধুরী হাট, দত্তপাড়া হাই ইসকুল, দেওয়ানজি বাড়ি, রুহিতখালি পেরিয়ে এগিয়ে চলে। গাড়িবহর সংকীর্ণ লোহার পুল পার হয়ে, মনু মুনশি ভাণ্ডারির বাড়ি বায়ে রেখে ইটের পুলের গোড়া ঘেঁষে মল্লিকা দিঘির পাড়ের দিকে মুখ করতেই গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আইয়ে রে! আইয়ে রে! হাইঞ্জাবি আইয়ে রে! এই আওয়াজ তুলে দিকবিদিকশুন্য হয়ে পালাতে শুরু করে মানুষজন। কুন্দিস পাড়া, কইলতান নগর, মাধবপুর, ছুবানপুর থেকে মানুষজন ছুটতে থাকে পাটক্ষেত, ধানীজমি আর সুপারিবাগিচার আড়াল বেয়ে নিরাপদ গন্তব্যে। কুরীবাড়ির মেয়েরা খাল বিল পেরিয়ে ধর্মপুর লোনা পাথারে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

ফৌজি ট্রাকের ছাদে দাঁড়ানো সৈন্যরা অস্ত্রবাগিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে এগিয়ে চলে। তাদের পরনে খাকী পোশাক, মাথায় লোহার হ্যালমেট, কাঁধে রাইফেল। রাইফেলের মাথায় সূচালো বেয়ানেট। রহিমগঞ্জ বাজারের কাছাকাছি এসে তারা মেশিনগানের একঝাঁক গুলি ছোঁড়ে। হাটের মানুষজন যে যেদিকে পারে, ছুটে পালায়। নিরূপায় কেউ কেউ দোকানের ঝাঁপ ফেলে সেঁধিয়ে থাকে চৌকির তলায়। বাজার পেরিয়ে গাড়িবহর যখন খিলপাড়ামুখী না হয়ে সোনাচাকামুখী হয় তখন সবাই বুঝতে পারে, গেরাম দ্যাশে আর্মি নামানোর উদ্যোক্তা নিশ্চয়ই রাজাকার কমান্ডার আনোয়ার হোসেন।

সূর্য হেলেছে পশ্চিমে। একপশলা বৃষ্টির পর ঝকঝকে রোদ আকাশে। আর্মির গাড়ি সরাসরি গিয়ে থামে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আবদুর রব চৌধুরীর বাড়ির সামনে। সৈন্যরা গুলি করতে করতে বাড়ির ভেতরে ঢোকে। কিছুক্ষণ পর দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে পুরো বাড়ি। তারপর আওয়ামী লীগ সমর্থকদের আরও কটি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। রব চৌধুরীর অপরাধ ১৯৬৯ সালের বর্ষাকালে এনএসএফ, জামাত ও মুসলিম লীগকে প্রতিহত করতে নিজ বাড়িতে ক্যাম্প বানিয়েছিলেন তিনি। সেকারণে এনএসএফের পাণ্ডা আবু সুফিয়ান, জামাত নেতা বদরবাহিনীর কমাণ্ডার আনোয়ার হোসেন তাঁর উপর অসন্তুষ্ট ছিলো। এরই জের হিসাবে ৩০/৩২ জন পাক আর্মি ও রাজাকার দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘায়েলের আয়োজন করা হয়।

ঘটনার আকস্মিকতায় মুক্তিযোদ্ধারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। সেনের বাড়ির মসজিদের মিম্বার থেকে একদল মুক্তিযোদ্ধা পাকবাহিনীর গতিবিধি অনুসরণ করে সোনাচাকার দিকে এগিয়ে যায়। জি এম রুহুল আমিন ভূঁইয়া, জালাল কোম্পানী, কায়কোবাদ, গাজী আনোয়ার শাহ, সোমপাড়ার সিরাজসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেকেই পৌঁছেনি তখনো। মুজিব বাহিনীর প্রধান মাহমুদুর রহমান বেলায়েত মাইজদী থাকেন। পাক বাহিনী আসার অগ্রিম খবর তিনিও পাননি বিধায়। অগত্যা সুবেদার ওলিউল্লাহ ও গাজী মাশীহুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের ছাব্বিশ জনের একটি হাফট্রেইন্ড গ্রুপ পাক বাহিনীর প্রতিরোধে এগিয়ে যায়। তারা পজিশন নেয় চাটখিল সোনাচাকা রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে। আর পূর্ব পার্শ্বে অবস্থান নেয় পাকবাহিনী ও রাজাকারেরা। বিকেল তিনটার দিকে শুরু হয় যুদ্ধ। ১২/১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা পাশ্ববর্তী বাড়ির মসজিদের উপর অবস্থান নিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে। পশ্চিমে কল্যাণ নগর, জীবনগর, এয়াছিন হাজীর হাট, নাজির কাচারি এলাকা থেকে আসা কিছু মানুষ দেশী অস্ত্র টেঁটা, বল্লম নিয়ে প্রস্তুত হয় ।
যুদ্ধ চলে ঘণ্টাখানিক। গুলিগোলার আওয়াজ এর বেশি সময় শুনিনি আমরা। তারপর গুলি ফুরিয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের। সুতরাং রণে ভঙ্গ দেয়া ছাড়া উপায় থাকেনা তাদের। তারা পিছিয়ে গিয়ে পশ্চিমের জলাজমিতে থাকা পাটক্ষেতের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। উন্মত্ত পাকসেনারা মুক্তি বাহিনীর টিকিটি খুঁজে না পেয়ে গান পাউডার ছিটিয়ে সোনাচাকা বাজারে আগুন ধরিয়ে দেয়। গোটা বাজারের দোকানপাট পুড়ে ছাই হয়ে গেলে তারা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে দত্তপাড়া, বটতলী হয়ে নোয়াখালী অভিমুখে যাত্রা করে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক ও মুক্তিযুদ্ধে নোয়াখালী গ্রন্থের (২০০৭) লেখক জুবাইদা নাসরিন লিখেন, “আধঘন্টা লড়ায়ের পর মুক্তিযোদ্ধারা সারেন্ডার করে (পৃ—৯০)।”
কিন্তু তার এই তথ্যের সাথে আমি একমত নই। মুক্তিযোদ্ধাগণ সারেন্ডার করলে তাদের অবশ্যই আটক করা হতো। কিংবা গুলি করে, বেয়ানেট খুঁচিয়ে হত্যা করা হতো। ঘটনার পর সেখানে লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়নি। আর আটক করে জেলে পোরা হলে কাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো, বা তাদের পরিনতী কী হয়েছিলো তা কখনোই জানা যায়নি।

দ্র. এই লেখায় কোনও তথ্য ঘাটতি থাকলে তা একান্তই আমার সীমাবদ্ধতা।

আজাদ বুলবুল
৩০ জুলাই ২০২০।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button