খোলা জানালা

একুশ বছর পর স্বমহিমায় বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা

১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের ভাবনা

ড. এ. বি. চাকমা

বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অভিশপ্ত দিন হলো উনিশ শ’ পঁচাত্তর সালের পনেরোই আগস্ট। দিনটি ছিল শুক্রবার। ইসলাম ধর্মাবলম্বী সাচ্চা মুসলমান আদমির জন্য এটি পবিত্র বার। অন্যান্য দিনের মতো সেদিন ভোরেও রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর গৃহদ্বারে নওবত বাজিয়ে জাতীয় পতাকা উড়ানোর কথা ছিল। রাষ্ট্রপতির বাসভবনে দায়িত্বরত কর্মকর্তা কর্মচারীরা জাতীয় পতাকা উড়ানোর প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছিল। না সেদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আর লাল সবুজ পতাকা উড়ানো হয়নি। প্রতিদিন যেখানে মসজিদ থেকে সুমধুর আযানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙত আর মহামান্য রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিবসহ তাঁর পরিবারবর্গ ও বাড়ির চাকরবাকর, পিয়ন, প্রহরী, কর্মকর্তা-কর্মাচারীদের শুর হতো ব্যস্ততম দিনের কর্মসূচি। সেদিন আর তেমনটি হতে দেয়নি খুনি হায়েনার দল। আযানের শব্দের বদলে ফজরের নামাজের সময়টাতে ঘাতকদের আগ্নেয়াস্ত্রের ট্রেসার বুলেটের বিকট শব্দে দ্রুম দ্রুম গুলির আওয়াজ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি, মিন্টো রোডের সবকিছু তছনছ করে দিয়েছিল। নরপিশাচ ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে জাতির পিতার সুউচ্চ সুঠাম দেহখানি স্বগৃহের সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েছিল। খুনিদের জিঘাংসা ও রক্তপিপাসার বলি হয়েছিল দশ বছরের মুজিবপুত্র শেখ রাসেল ও নবপরিণিতা দুইপুত্রবধুসহ বাড়িতে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল সদস্য। এতে একই দিনে সস্ত্রীক, সপুত্রক অবস্থায় স্ববংশে শাহাদাত বরণ করলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার মানুষ হারালো তাদের প্রিয় পিতাকে, অনাথ এতিম হয়ে নিজভূমে পরবাসী হয়ে থাকতে হলো দীর্ঘ ২১ বছর। কবি বলেছেন, ‘নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ বঙ্গবন্ধু আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন স্বমহিমায়, তবে সশরীরে নয় বাংলার মানুষের শ্রেষ্ঠার্জন মহান স্বাধীনতার রূপকারের অবিনাশী আদর্শ নিয়ে।
রাষ্ট্র থাকলে রাষ্ট্রপতি কেউ না কেউ রাষ্ট্রপতি হবেন। রাষ্ট্রবিকাশের ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আর দশজন রাষ্ট্রপতির মতো নন। অন্যদের সাথে এই মহায়নায়ককে মেলানো যাবে না। তাঁর মহত্ব, অনন্যতা, তাঁর বিশিষ্টতা অন্য জায়গায়। তিনি বাংলার মানুষের জাতির পিতা। পূর্ব বাংলার পৃথক ভৌগোলিক অবস্থান, বিপুল সংখ্যা, সমরূপভাষাÑ বাংলা, সমসংস্কৃতিÑ বাঙালি সংস্কৃতির ঐক্য, উর্বর বদ্বীপ সমতলভূমিকে ভিত্তি করে মুজিবকে একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন বুনেছেন। এই বাংলায় রাষ্ট্রগঠনের সকল উপাদান ছিল; শুধু ছিল না বাঙালির আত্মবিকাশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, নিজের আয় রোজগার, কষ্টার্জিত উৎপাদন উদবৃত্ত ভোগের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও নিজস্ব সংস্কৃতি সাধনার মুক্তপরিবেশ। বাঙালির মাথার উপর তখন পাকিস্তানি (পাঞ্জাবি) সামরিক জুন্টার শোষণ নির্যাতনের নিগঢ়। তাই ১৯৪৭ সাল থেকেই অধিকারহারা মানুষকে নিয়ে একটি শোষণ বঞ্চনামুক্ত সোনার দেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন শেখ মুজিবের মানসপটে ভেসে ওঠে। অতপর তাঁর সম্মোহনী নেতৃত্ব ও বজ্রকন্ঠ দিয়ে ধারাবাহিক সংগ্রামের মাধ্যমে ধাপে ধাপে তিনি ১৯৭১ সালে এনে দেন কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি কারান্তরীণ ছিলেন কিন্তু তাঁরই নামে, তারই দেখানো পথেই এসেছে রাজনৈতিক মুক্তি। বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশ নামে একটি জাতিরাষ্ট্রের। তাঁর লালিত স্বপ্ন ছিল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। কর্মঠ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একদিন বাংলার মাঠ ভরে উঠবে সোনালি ধানে, সবার মুখে ফুটবে হাসি, ঘুচে যাবে অভাব অনটন। হবে সম্পদের সুষম বন্টন। উবে যাবে শোষণ বঞ্চনা। স্বকীয় সত্তায় বিকশিত হবে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি। সেজন্য ১০ জানুয়ারি তিনি দিল্লিতে প্রদত্ত সংবর্ধনা সভায় দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন: ‘আমি বিশ্বাস করি সেক্যুলারিজমে, আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্রে, আমি বিশ্বাস করি সমাজতন্ত্রে।’ স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে তিনি সে-লক্ষেই দেশ পুনর্গঠনের সাধনায় নিমগ্ন হন। সাড়ে তিন বছরের মধ্যে একটি রাষ্ট্রের শক্ত বুনিয়াদ গঠনের জন্য যা যা প্রয়োজন তার ভিত্তি তিনি স্থাপন করেন। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সকল ক্ষেত্রে স্বীকৃতির সাফল্য আসে তাঁর হাত ধরেই। একশটির বেশি দেশ এবং জাতিসংঘসহ বেশ কটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় স্বর্মযাদায় অর্ন্তভুক্ত হয় বাংলাদেশ। তিনি লাভ করেন জুলিও কুরি পদক। সে-অর্থে তিনি অন্য আট দশজন রাষ্ট্রপতির মতো শাসক নন। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তাঁর কী যে গভীর মায়া, প্রেম ভালবাসা ও বিশ্বাস সেটি তুলনাহীন। সুতরাং তাঁকে স্ববংশে হত্যা করার ঘটনা কোনো মামুলি ঘটনা ছিল না। এর রহস্য গভীর ও বহুমুখী। এর চক্রান্তের ডালপালা বহুদূর বিস্তৃত। খুনিদের চরিত্র, তাদের প্রভুদের প্রতিক্রিয়া, বঙ্গবন্ধুর লাশ মাড়িয়ে ক্ষমতার মসনদে বসা শাসকদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ই আভাস দেয় চক্রান্তের কুশীলব কারা। কী তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য।
পনেরোই আগষ্টের পর ইতিহাসের চাকা, প্রগতির চাকা পিছন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হলো। কয়েকটি ঘটনার বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় ১৫ই আগস্ট যেদিন নিকটতম প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের স্বাধীনতা দিবস। আর বঙ্গবন্ধু হলেন ভারতের তৎকালীন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর আস্থাভাজন বন্ধু। খুনিচক্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সক্রিয় ও সিদ্ধান্তসূচক ভূমিকাকে মেনে নিতে পারেনি; কারাবন্দী মুজিবের প্রাণ রক্ষার জন্য শ্রীমতি ইন্দিরার বিশ্বভ্রমণ শত্রুদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এজন্য তারা ভারতের বন্ধু মুুজিবকে হত্যা করেই প্রতিশোধ নিয়েছিল।
১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক বাহিনী দেশের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেছে বলে সমসাময়িক দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়। বঙ্গবন্ধু, সেরনিয়াবাত, শেখ মণির পরিবারকে হত্যার কাজে নিয়োজিত ছিল পাকিস্তান ফেরত সাতজন মেজর, দুই জন কর্ণেল ও তাদের অধঃস্তন সৈনিকরা। অথচ বঙ্গবন্ধুই এই পাকিস্তানফেরত বেজন্মাদের বাঙালি ভেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত না করে পুনর্বহাল করে মহানুভবতা দেখিয়েছেন। পাকিমন্ত্রে দীক্ষিত এই মেজর ও তাদের অনুসারী অধ্বঃস্তনরাই ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বর হত্যালীলায় মেতে উঠল পৈশাচিক উল্লাসে। তারা পাকিস্তান আমলের জুলুম নির্যাতনের প্রতীক ‘মিলিটারি-’ই রয়ে গেল। মুক্তিবাহিনীর মতো বাহিনী হতে চাইনি। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান অনেক চিন্তাকরে ‘বাহিনী’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। তারা মুজিবের ওপর ‘বেঈমান,’ ‘ভারতের দালাল,’ বিশ্বাসঘাতক’ অপবাদ দিয়ে খুনের নেশায় মদমত্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুকে বুলেটের আঘাতে স্ববংশে খুন করে মনে করেছিল দেশ উদ্ধার করেছে। সেজন্য নিজমুখে খুনের কথা স্বীকার করে বাহবা নিতে চেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস তাদের ক্ষমা করেনি।
১৫ আগস্ট সকাল থেকেই সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম থেকে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান উঠে গেল, এটি স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙালির প্রেরণাদায়ী শ্লোগান, যার তাৎপর্যবহু বিস্তৃত। এটি বাংলার চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিধ্বনি, অধিকারহীন বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের প্রতীক; কিন্তু সেটা বাতিল করা হলো, তদস্থলে রাতারাতি চালু হলো ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। আগে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরান, গীতা, ত্রিপিটক ওবাইবেল পাঠ শোনা যেতো সেটা উবে গেল। শুধু ইসলামী ধর্মসংগীত বাজানো হলো (মিহির মৈত্র, ২০১৫:৭২)। নজরুলের লেখা ইসলামী সংগীত বাজানো হলো; নিষিদ্ধ হলো রবীন্দ্র সংগীত প্রচার। বাংলাদেশ বেতার হঠাৎ নাম নিল ‘রেডিও বাংলাদেশ’।
১৬ আগস্ট ১৯৭৫ পাকিস্তানের ভুট্টো সরকার সামরিক নিয়ন্ত্রিত নব্য মীরজাফর খোন্দকার মোশতাকের সরকারকে স্বীকৃতি দিল। মুজিব হত্যার পর বাংলাদেশের দুয়ার পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের জন্য বিনা শর্তে খুলে দেয়া হলো। পাকিস্তানি ব্যাংকের শাখা ঢাকায় খোলা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও কল-কারখানা ব্যক্তিগত মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সর্বোপরি দরিদ্র বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর সংখ্যা বাড়িয়ে মার্কিনি অস্ত্র ব্যবসার বাজার তৈরির ব্যবস্থা হয়েছে (গাফফার চৌধুরী, ২০১৭: ৪২)। স্বীকৃতি আসতে থাকলো সৌদি থেকে, চীন থেকে, মুসলিম বিশ্ব থেকে যারা পাকিস্তানের অকৃত্রিম বন্ধু রাষ্ট্র। খন্দকার মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দিল যুক্তরাষ্ট্র, বৃৃটেন আরো কিছু দেশ। প্রত্যক্ষদর্শী মিহির মৈত্র লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মোড় নিল পাকিস্তান ও চীনের দূতাবাস খোলার সঙ্গে সঙ্গে। বায়তুল মোকাররমে নামাজ পড়তে এলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত। তারিখটা দোসরা ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ সাল। পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে দেখে জামাতের মৌলবাদীরা আনন্দে ‘‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ” স্লোগান দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়। নামাজের পর সৌভ্রাতৃত্বের আলিঙ্গন ও চুম্বনে চুম্বনে অভিভূত হন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত খুরশিদ। বাঙ্গালী মৌলবাদীরা খুরশিদকে বুকে জড়িয়ে ধরে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছেদের পরিতাপে অশ্রু বিসর্জন করে (মৈত্র, ২০১৫: ১০৬)।
ব্যাপারটা এমন নয় যে ১৫ আগস্টে স্রেফ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। নুতন রাষ্ট্রপতির অধীনে সংবিধান, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রনীতি ঠিক রেখেই পুনরায় সচল হয়েছে সবকিছু। না ব্যাপারটি তা নয়। ১৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়ল। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হলো সেনানিবাস। ২০ আগস্ট সামরিক আইন জারি হলো। সেনাপ্রশাসনে পরিবর্তন আনা হলোÑ সফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াকে আনা হলো। মোশতাক সরকার ২৬ সেপ্টেম্বর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো কালো আইন জারি করে হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সেনাঅফিসারদের বিচার করা যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিল। খুনের মতো জঘন্যতম অপরাধের জন্য রাষ্ট্রীয় মদদ প্রদানের কুপ্রথা চালু হলো। খুনিরা উৎসাহিত হলো, ৩রা নভেম্বর জেলখানায় বিনা বিচারে জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে তার প্রমাণ দিল। স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যত বিকাশ ধ্বংস করারই চক্রান্ত। অবশেষে মুুখোশ উন্মোচন করে মোশতাক, সায়েম এর পুতুল সরকারকে বিদায় করে দিয়ে পাকিস্তান আমলের মতো জেনারেলরাই সকল ক্ষমতা কুক্ষীগত করলো। রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হলো। শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মতে, বঙ্গবন্ধু হত্যা গণতন্ত্র হত্যার নামান্তর। গণতন্ত্রকে হত্যা করে সংবিধান বদল করে রাষ্ট্রের চরিত্রকেই পরিবর্তন করে দেয়া হলো।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর আঘাত হানা হলো। জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিণত হলো নিছক স্বাধীনতা যুদ্ধে। সংবিধানের পঞ্চম ও অস্টম সংশোধনী দিয়ে বাহাত্তরের সংবিধান থেকে অন্যতম রাষ্ট্রনীতি ধর্ম নিরপেক্ষতা মুছে দেয়া হলো। তার পরিবর্তে একটি বিশেষ ধর্মের কলেমাকে প্রতিস্থাপন করা হলো। দেশে মনে হয় অন্য ধর্মের লোক নেই। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হলো। ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে অনুমোদন দেয়া হলো। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী যথার্থই বলেছেন যে ‘বাংলাদেশের সেনা-রাজনীতির একটা মূলসূত্র ইসলাম। ধর্মের প্রতি আনুগত্যের কারণে নয়, মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের একটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। পাকিস্তানি রাজনীতির তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই গণতন্ত্রের একটি রক্ষাকবচ হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা গৃহীত হয়েছিল সংবিধানে। আর সেই নীতির উচ্ছেদ ঘটিয়ে, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারা মুছে দিয়ে, সংবিধানের পাকিস্তানিকরণ করলেন পাকিস্তানের সেনা শিক্ষায় শিক্ষিত দুই বাঙালি জেনারেল’ (সিদ্দিকী, ২০০৫:১২৭) এভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটানো হয় রাষ্ট্রীয় মদদে। দেশ ফিরে যায় একাত্তর পূর্ববর্তী ধারায়। দীর্ঘ একুশ বছর এ অপচেষ্টা চলে।
খুনিরা জীবন্ত মুজিবের ব্যক্তিত্বের কাছে যেমন ছিল অসহায় ধরাসায়ী। ঠিক তেমনি লোকান্তরিত মুজিবের ভয়েও সন্ত্রস্ত ছিল। ফলে পঁচাত্তরের পর থেকে মুজিবের কৃতিত্বকে অস্বীকার করার অপচেষ্টা চলে দীর্ঘ একুশ বছর। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদানকে আড়াল করে রাখা হয় জাতীয় জীবন থেকে। রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে তো মুজিবের নাম ছিল না, পাঠ্যপুস্তক থেকে বিদায় করে দেওয়া হলো। এমনকি আওয়ামী লীগের গঠনন্ত্র থেকেও তার নাম মুছে দিতে বাধ্য করা হয়। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি মিথ্যা হয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গভবনের প্রশস্ত লবিতে ছিল ইতিহাসের অনেক নায়কের প্রতিকৃতি। ছিল না কেবল তার’(সিদ্দিকী, ২০০৫: ১২৩)।

কিন্তু খুনিদের মুজিববিহীন বাংলাদেশ গড়ার ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে। কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হয়। বঙ্গবন্ধুর খুনের মামলা দায়ের হয়। বিচার হয় হত্যাকা-ের। বিচারে ফাঁসি হয় আত্মস্বীকৃত খুনিদের। জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়। অত:পর বিচার হয় যুদ্ধাপরাধীদের।
ইতোমধ্যেই বঙ্গবন্ধুর স্বলিখিত ডায়রিগুলো অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামাচা, আমার দেখা নয়াচীন নামে প্রকাশিত হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সম্বলিত পাকিস্তানি গোয়েন্দাপুলিশের প্রতিবেদন সংকলন ‘সিক্রেটস ডকুমেন্টস অন দ্য ফাদার অব নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’ ২৪টির অধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্বদলিল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এবছর উদযাপিত হচ্ছে মুজিব শতবর্ষ। শতবর্ষকে কেন্দ্র করে তৈরি করা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাধীনতা পরবর্তী স্বদেশ পুনগর্ঠনে তাঁর নিরলস উদ্যেগ ও কর্মনিষ্ঠার জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে। দেশি-বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বঙ্গবন্ধু চেয়ার প্রবর্তিত হয়েছে। চালু হয়েছে বঙ্গবন্ধু নামে স্কলারশিপ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু কর্ণার। বঙ্গবন্ধুর র্কীতিগাথা নিয়ে রচিত হচ্ছে অসংখ্য গবেষণাগ্রন্থ, স্মৃতিকথা, কবিতা। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে মুজিবের গৌরবময় স্থান নির্ণিত হয়েই ছিল, তিনি জাতির পিতা। তারপর এসবের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এ ভূখন্ডে একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর অসংবাদিত অবিস্মরণীয় অবদানের কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হলো। তিনি আবার স্বভূমিতে ফিরে এসেছেন আপন মহিমায়; শাশ্বত বাংলার মানুষের ঐক্য, স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button