খোলা জানালালিড

একজন ড. মানিক লাল দেওয়ানের প্রয়ানে

শ্রদ্ধার্ঘ্য

সুমিত্র চাকমা

শিক্ষাবিদ ড. মানিক লাল দেওয়ানের জন্ম ১৯৩২ সালের ৫ জানুয়ারি পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ৮৯ বছর বয়সের ব্যাপ্তিকাল একজন মানুষের জীবনে মোটেই কম সময় নয়। কাজেই, সে অর্থে এক মোক্ষম সময়ে তাঁর তিরোধান হয়েছে। এর চেয়ে বেশি আয়ুষ্কাল জীবন পরিধির সীমাবদ্ধতার বাইরে ভাবার মতো অর্থহীন।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, দীর্ঘ আয়ু দীর্ঘ অভিশাপ। কিন্তু গুণীজনের প্রয়ান চিরকালই বেদনার। সেই যত বয়সই হোক না কেন মানুষ তাঁর স্বাভাবিক প্রস্থানেও ব্যথিত হন, সহজে মেনে নিতে পারেন না। মনে হয় যেন অস্তগামী সূর্যের অন্তিম রশ্মি, যা আকাশকে উজ্জ্বল করে রাখে শেষ সময় পর্যন্ত, তা-ও সংজ্ঞাহীনতার মত অপসৃয়মাণ হয়ে পড়ে। কিন্তু, জীবন চলে যায় জীবনের নিয়মে – একথা যেমন সত্য তেমনি জীবন পরিক্রমার কক্ষপথ থেকে আলো বিচ্ছূরণ করে কেউ কেউ হয়ে ওঠেন একটা দৃষ্টান্ত।
শ্রদ্ধেয় ড. মানিক লাল দেওয়ান যে এমন-ই একজন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠলেন তার প্রমান পাওয়া গেল তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে। পুরো নাগরিক সমাজে একটা শোকার্ত পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। শিক্ষক হলেই যে সর্বক্ষেত্রে শ্রদ্ধাভাজন হবেন তা হলফ করে বলার সুযোগ নেই। যদি তিনি তাঁর নামের উর্ধ্বে উঠে নিজেই হয়ে ওঠেন একটি স্মরণীয় সত্তা তখন তিনি তো একজন অসাধারণই হন। প্রশ্ন উঠতে পারে ড. দেওয়ান তো একটা রাজনৈতিক দলের মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলেন অথবা পরিচিতি পেয়েছিলেন যদিও তিনি রাজনীতি করেন নি।
ফলে, তিনি তো একটা পরিধি ভেদ করতে সক্ষম হননি? কিন্তু, মানুষ যখন নিজের ব্যক্তিত্ব, সততা, নিষ্ঠা আর কমিটমেন্ট বজায় রেখে একটা পরিচ্ছন্ন জায়গায় প্রতিস্থাপিত হন তখন তিনি দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মাঝে স্থান করে নেন। কিন্তু, রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে পরিচিত হয়েও যদি মানবীয় সত্তাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে কেবল একটা নির্দিষ্ট আয়তনের সীমারেখা দ্বারা কেউ আবৃত থাকেন তখন তিনি জনসমাজে অতটা স্মরণীয় হন না; নিদেনপক্ষে তিনি যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেন।
ড. দেওয়ান সেইসব সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে ওঠা একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। তাই, তিনি যখন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তখন তাঁর বিরুদ্ধে অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকেও কেউ উচ্চবাচ্য করেননি। বরং সকলেই অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাঁর বিষয়ে কথা বলতেন। তিনি চাইতেন সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে নীতিগত সহাবস্থান, যা তিনি তাঁর আত্মজীবনী বইযের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করেছেন। নীতিগত প্রশ্নে অবিচল একজন ব্যক্তি হওয়ার দরুন কোন প্রকার লোভ-লালসায় তিনি উদগ্রীব ছিলেন না।
একটি দলের সমর্থনপুষ্ট হয়ে তিনি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েও কোন দলকানা আচরণ করেন নি, বরং নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করেছিলেন। দেশ ও দশের কল্যাণের জন্য তিনি ছিলেন দৃঢ়চিত্ত। তাঁর কিঞ্চিৎ প্রমান মেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু শ্রদ্ধেয় সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভান্তেকে নিয়ে প্রকাশিত পরিনির্বান স্মারক গ্রন্থে ‘আধ্যাত্মিক গুরু বনভান্তে ‘ শিরোনামে তাঁর লেখায়।
তিনি লিখেছেন, “…… অনেক জনহিতকর কাজসহ নিরপেক্ষভাবে বিনা পয়সায় ১০২০টি বিভিন্ন পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করি। পরিষদের এইসব নিরপেক্ষ ভূমিকার জন্য অবৈধভাবে নিয়োগ না পাওয়া কিছু বিএনপির কর্মী আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলে। তারা প্রাক্তন চেয়ারম্যান রবীন্দ্র লাল চাকমাকে নিয়ে আমাকে অপসারণ করার জন্য ঢাকার বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে দৌঁড়দৌঁড়ি শুরু করে দিল। তার জলন্ত প্রমাণ পেলাম। আমি ও সহধর্মিণী কল্যাণী একদিন সমস্যার লিখিত বক্তব্য নিয়ে ভন্তের শরণাপন্ন হলাম। শ্রদ্ধেয় ভান্তে মনযোগ দিয়ে পড়ে বললেন, এটা তাদের ফাজিলামি, ফাজিলামি। আমরা ভান্তেকে প্রণাম করে বাড়ি চলে আসলাম। পরের দিন বিএনপির কর্মীরা দু-গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেল এবং এক গ্রুপ আমার পক্ষ হয়ে আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিল। এক পর্যায়ে দু-গ্রুপের সংঘর্ষও হলো। বিএনপি সরকার সম্ভবত ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টের ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন বন্ধ করে দিল। পরিষদের কাজে শান্তি ফিরে এলো। ”
ড. মানিক লাল দেওয়ানের ছিল বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন। অতটা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ছিলনা তাঁর বাবার সংসার। ফলে টানাপোড়েনের ছায়া ছিল। যার কারনে উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের ব্যাপারেও ছিলেন সন্দিহান। এসব কথা তিনি তাঁর লেখা “আমি ও আমার পৃথিবী” নামক স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছন। পাহাড় তথা চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বপ্রথম পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্নকারী ড. মানিক লাল দেওয়ান তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কলেজ অব ভেটেরিনারি সাইন্স থেকে ১৯৫৮ খ্রিঃ Bsc (A.H) ডিগ্রী লাভ করেন।
১৯৫৯ পূর্ব পাকিস্তান ভেটেরিনারি কলেজে সহকারি প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। পরে তিনি ১৯৬১ খ্রিঃ তিনি USAlD বৃত্তি নিয়ে লাভ আমেরিকায় পাড়ি জমান। সেখান থেকে ফিরে তিনি ১৯৬৪ তদানীন্তন East Pakistan Agriculture University- তে এসিসট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে কয়েক বছর চাকরি শেষে তিনি আবার ১৯৬৮ খ্রিঃ তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন বৃত্তি লাভ করে মস্কো গেলে সেখানকার ভেটেরিনারি একাডেমি থেকে ১৯৭১ খ্রিঃ PH.D in veterinary pathology ডিগ্রী অর্জন করেন। তারপর ১৯৭২ সালে ড.দেওয়ান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ এর Associated Professor হিসেবে যোগদান করে তিনি সেখানে তাঁর কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় পার করেন। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালীন তিনি ১৯৭৮-৭৯ সালে যুক্তরাজ্যের এডিনবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে Post Doctoral Research করেন। ১৯৮০-৮১ সালে তিনি ইরাকের মসুল বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনা করেন।

তাঁর অসামান্য মেধা ও কৃতিত্বের জন্য ড. দেওয়ানকে বাংলাদেশ একাডেমি অফ এগ্রিকালচার কর্তৃক Dr. S.D Chaudhuri Gold Medal এ ভূষিত করা হয়। স্মৃতি রক্ষার্থে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ড.দেওয়ানের অফিস কক্ষটিকে Prof. M.L Dewan Conference Room নামকরণ করে। অবসর গ্রহনের পর ২০০২-২০০৭ খ্রিঃ সময়কাল পর্যন্ত প্রফেসর দেওয়ান রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। সন্দেহ নেই, এই গুণী শিক্ষাবিদ পশ্চাদপদ সম্প্রদায় ও পার্বত্য এলাকায় একটি ইতিহাস হয়ে স্মরণীয় থাকবেন।

লেখকঃ সুমিত্র চাকমা
প্রধান শিক্ষক, শিলকাটাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লংগদু, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button