নীড় পাতা / ব্রেকিং / একজন জনপ্রতিনিধির সফলতার গল্প
parbatyachattagram

কাউখালী উপজেলা পরিষদ চেয়ার‌ম্যান

একজন জনপ্রতিনিধির সফলতার গল্প

বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। পাহাড়ের রাজনৈতিক পরিবেশ, পাহাড়ি-বাঙালি সাম্প্রদায়িক সংঘাত। অসহনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তাকে। এসব এর মাঝেও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। সংগ্রামী জীবনে সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা এবং সর্বশেষ স্বাধীন পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন কৃষিকে। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ধীরে ধীরে বড় করেন কাজের পরিধি। স্বাবলম্বী হয়ে উঠেন নিজেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় গোটা দশেক মানুষের। বলছিলাম একজন সফল কৃষক ও দুইবার নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান অ্যানি চাকমা কৃপার কথা। কৃষকের কাছে এক পরিচত মুখ। আদর্শ হিসাবে পিতা মাতাকেই প্রথমে রাখেন তিনি। পিতার কাছেই শিখেছেন ন্যায় বিচার কিভাবে করতে হয়। কিভাবে মানুষের সহায্য করতে হয়।

পিতা কালী মোহন কার্বারি ২০১২ সালের ২৫ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তার ১০ দিন পর মাতা শান্তি প্রভা চাকমাও ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি তাকে একা রেখে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। সত্তর ও আশির দশকে পিতা মাতা দুজনই ছিলেন জনপ্রতিনিধি। পিতা অস্থায়ীভাবে পোস্ট মাস্টারের দায়িত্বও পালন করে বছর দেড়েক। পিতা জনপ্রতিনিধি থাকাকালীন পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাতের সময় নিরাপত্তা বাহিনী আটক করে নিয়ে দুই মাস আটকে রাখে। তারপর মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন তার পিতা। ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৯১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর বিয়ের কথা বার্তা চললেও ১৯৯২ সালের পাহাড়ে সংঘাত সৃষ্টি হলে তা আর হয়ে উঠেনি। প্রথম বার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর বিয়ের প্রস্তাব আসলেও পিতা মাতা অসুস্থ থাকায় পিতা মাতাকে ছেড়ে যেতে হবে সেই ভয়ে এবারও বিয়ে করা হয়নি।

লেখাপড়া চলাকালীন জীবনে করতে হয়েছে অনেক সংগ্রাম। কৃপার বয়স যখন সাত ১৯৮০ সালে পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত লেগে গেলে উপজেলার ফটিকছড়ি ইউনিয়ন হয়ে ভারতে পালিয়ে যান পরিবারসহ। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকার তাদের ফিরিয়ে আনেন। এরকম ১৯৮৪, ১৯৮৬ ও ১৯৮৯ তে আরও তিনবার পাড়ি জমাতে হয়েছে ভারতে। এর কিছুর পরও পড়ালেখা চালিয়ে গেছেন তিনি। সাংবাদিকতাকালীন ১৯৯১ সালে মাধ্যমিক পাশের পর জেলা পরিষদে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য পালিত গরু-ছাগল বিক্রি করে পঞ্চাশ হাজার টাকাও দিয়েছিলেন চাকরীর জন্য। ১৮ বছর না হওয়ায় সে বারে আর চাকরি হয়নি তার। টাকাও ফেরত পাননি তিনি। তার পর থেকে এযাবত আর কোন সরকারি চাকুরীর আবেদন করেননি তিনি। সাংবাদিকতা, বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকতা, কৃষি সর্বশেষ জনপ্রতিনিধি। বর্তমানে তিনি একজন সফল চাষি ও জনপ্রতিনিধি।

দ্বিতীয় বারের মতো মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা পরিষদে। প্যানেল চেয়ারম্যানও তিনি। অ্যানি চাকমা কৃপা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৩ সালে কাউখালী উপজেলার কলমপতি ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ছোটডলু গ্রামে। বেড়ে উঠাও ছোটডলুতেই। এখন বসবাস করছেন একই ওয়ার্ডের পোয়াপাড়া গ্রামে।

বর্তমানে মানুষের সেবা করার পাশাপাশি কৃষি কাজেই ব্যস্ত থাকেন তিনি। বিয়ে না করায় পরবর্তী বংশধরও নেই। তাতে কি। বিভিন্ন এলাকার ৮ জন ছেলে-মেয়েকে লালন পালন করছেন তিনি। লেখাপড়া করাচ্ছেন সকলকেই। পঞ্চম থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণীতে অধ্যায়ন করছেন তারা। তাদের কেউ কেউ দিদি কেউ মাসি বলেই সম্বোধন করেন তাকে। নিজের রক্তের না হলে কি হবে আত্মার সাথে মিশে গেছে ছেলে-মেয়েগুলো।

পড়ালেখা : পোয়াপাড়া আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শেষে ১৯৮৯ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন পোয়াপাড়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পড়ে ভর্তি হয় রাঙামাটি সরকারি কলেজে সেখানে আর পড়া হয়নি। পড়ে রাজানগর রানীরহাট ডিগ্রি কলেজ থেকে ১৯৯১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। রাঙামাটি সরকারি কলেজেই ¯œাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি হলেও বিভিন্ন কারনে আর তা সম্পন্ন করা হয়নি।

কর্মজীবন: ১৯৯১ সালের উচ্চ মাধ্যমিক শেষে করে সর্বপ্রথম কর্মজীবনে প্রবেশ। আর পেশা হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতা। এ পেশায় যুক্ত ছিলেন তিন বছর। দৈনিক গিরিদর্পণ, দৈনিক পূর্বকোণ, দৈনিক বাংলার বাণী, সাপ্তাহিক দিনান্তর(ম্যাগাজিন) তুলে ধরেন কাউখালীর সকল সংবাদ। ১৯৯২ সালে পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সাংঘাত বাঁধলে নিউজ করায় বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসতে থাকে। শেষে মেষে প্রাণের ভয়ে সাংবাদিকতা ছেড়ে দেন ১৯৯৩ সালে। ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়া উপজেলার জঙ্গল বগাবিলি রেজিস্টার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতা করেন ২০০০ সাল পর্যন্ত। তার পর জড়িয়ে পড়ে কৃষি কাজে। স্বাধীন পেশা কৃষি হওয়াতেই শুরু করে কৃষি জীবন।

রাজনীতি: তিনি কোন রাজনৈতীক দলে সাথে সম্পৃক্ত নন। নিরপেক্ষ থেকে কাজ করতে চান সাধারণ মানুষের জন্য।

যে কারণে জনপ্রতিনিধি হলেন: ১৯৯৭ সালে স্থানীয় এক মেম্বারের সাথে জমি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হলে সেটি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। দীর্ঘ ১০ বছরে আদালত তার পক্ষে রায় দেয়। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি জনপ্রতিনিধিসহ সকলের কাছে ধর্না দিয়েও হয়রানি ছাড়া ভালো কোন পরামর্শ ও বিচায় পাননি। তখনই প্রতিজ্ঞা করেন মানুষের সেবা করার। ২০০৯ সালে ২২ জানুয়ারি মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচন করেন। বিপুল ভোটে জয়লাভও করেন তিনি। চেষ্টা করে যান মানুষের সেবা করার। নারীদের অধিকার আদায়ে যুক্ত হন বিভিন্ন সংগঠনের সাথে। মানুষের ভালোবাসায় ২০১৪ সালে ১৫ মার্চ দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে। ইচ্ছা আছে ২০১৯ সালে নির্বাচনেও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবেন।

২০০০ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে যুক্ত হন কৃষিতে নিজের স্বাধীনতার জন্য কৃষিকে বেছে নেন তিনি। নারী হয়েও কৃষিকে বেছে নিয়ে আজ তিনি সফলও হয়েছেন। বর্তমানে তার ১০টি গরু, ১০টি ছাগল, ৫০টির অধিক দেশি মুরগি এবং দুই একর জমিতে ৪টি মাঝের প্রজেক্ট ছাড়াও রয়েছে সবজিসহ ও ফলের বাগানও। এসব তিনি একক প্রচেষ্টায় করেছেন। এনজিও, কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে উপযুক্ত কাজে লাগিয়ে এসব কিছু করেছেন তিনি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: মানবসেবা সবচেয়ে বড় ধর্ম। আর সে মানব সেবাই করে যেতে চান আমৃত্যু। আগামী বছর দুয়েক এর মধ্যে তৈরি করবেন একটি বৃদ্ধাশ্রম। নিজের সম্পদগুলো বড় একটা অংশ দান করবেন বৃদ্ধাশ্রমে। যাদের লালন পালন করেন তাদেরই দিবেন বাকি সম্পদগুলো। নারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজন নারী কেনো পুরুষ কখন ইনকাম করে আনবে সে অপেক্ষায় থাকবে। একজন নারী উদ্যোগী হলে তার স্বামীর ওপর চাপ কমবে। তার উপার্জিত অর্থ দিয়ে অন্তত সন্তানের খাতা কলমতো কিনতে পারবে। আর স্বামীর উপার্জিত টাকা সঞ্চয় করতে পারবে। একজন নারী উদ্যোগী, সাহসী এবং বুদ্ধিমতা হলেই সে সফল হতে পারবে। নতুবা পেছনেই পড়ে থাকতে হবে।

Micro Web Technology

আরো দেখুন

এডিসি বাংলো এখন বখাটেদের আখড়া!

রাঙামাটি শহরের তবলছড়ি পর্যটন রোডে এডিসি হিল বাংলো এখন মাদকসেবী আর বখাটেদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 − 8 =