ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

এই পাহাড়েই চিরঘুমে শায়িত এক বীরযোদ্ধা

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের শাহাদাৎবার্ষিকী আজ

সুহৃদ সুপান্থ

তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর নেমেছিল রাঙামাটির পাহাড়ের ঘেরা অপরুপ কাপ্তাই হ্রদের শান্ত নীল জল রাশি ঝিক ঝিক করছিল। ঠিক তখনই হঠাৎ শত্রুপক্ষ পাক হানাদার বাহিনীর কামান ও মর্টার শেল গর্জে উঠল। শান্ত পাহাড়ী জনপদ গোলাগুলির শব্দে আকাশ-বাতাস ফেটে যাচ্ছে যেন। হ্রদের পানিতে সৃষ্টি হয়েছিল আলোড়ন। পাক হানাদার বাহিনীর মূল লক্ষ্যে ছিল বুড়িঘাটের চিংড়িখালের বরাবর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ দখল করা। তখন চিংড়িখাল বরাবর উত্তর-দক্ষিণের হ্রদের ছোট এক টুকরো চরের উপর প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরী করে শত্রুপক্ষের গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্য মেশিনগানার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন তৎকালীন অষ্টম ইস্টবেঙ্গল ও ইপিআরের (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) সদস্য শহীদ ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ।

১৯৭১ সাল ২০ এপ্রিল । সবার আগে তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছিল পাক হানাদার বাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের এক কোম্পানীর অধিক সৈনিক, ৬টি তিন ইঞ্চি মর্টার ও অন্যান্য ভারী অস্ত্রসহকারে তিনটি লঞ্চ ও দুটি স্পিড বোট নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এলাকায় ঢুকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানকে চতূর্দিকে ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের উপর মর্টার শেল ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র দিয়ে গোলাবষর্ণের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা সম্পূর্ন ভেঙ্গে পড়ে। কিন্ত প্রতিরক্ষা ব্যূহতে দায়িত্বরত ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ শত্র“ পক্ষের প্রবল গোলা বর্ষণের মূখেও তিনি তাঁর অবস্থানে থেকে মেশিনগান দিয়ে নিজস্ব অবস্থানে স্থির ছিলেন। মুন্সী আব্দুর রউফ তাঁর নিজস্ব অবস্থান থেকে মেশিনগান দিয়ে শত্র“র উপর গোলা বর্ষণ আব্যাহত রেখে সহ-যোদ্ধাদের সকল সদস্যদের নিরাপদে পশ্চাদপসারনে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তখন মুন্সী আব্দুর রউফ বেরিয়ে এলেন তার পরিখা থেকে। মেশিনগান তুলে ধরে অনবরত গুলি ছুড়তে লাগলেন সরাসরি শত্র“র স্পিট বোটগুলোকে লক্ষ্যে করে। তার অসীম সাহস ও দুর্দান্ত মেশিনগানের গুলির আঘাতে শত্র“ পক্ষের ২টি লঞ্চ ও একটি স্পিট বোট পানিতে ডুবে যায় এবং দুই প¬াটুন শত্র“ সৈন্যের সলিল সমাধি হয়। বাকী দুটি অক্ষত স্পিট বোটগুলো এ অবস্থা দেখে দ্রুত পশ্চাদপসারণ করে মুন্সী আব্দরু রউফের মেশিনগানের রেঞ্জের বাইরে নিরাপদ দুরত্বে অবস্থান করে সমগ্র প্রতিরক্ষা ব্যুহ এলাকায় গুলি বর্ষণ শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ পাকিস্তান বাহিনীর একটি মর্টারের গোলা তাঁর উপর আঘাত করে এবং তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। শহীদ মুন্সি আব্দুর রউফের আসীম সাহস ও বীরত্বপূর্ন পদক্ষেপের ফলে শত্র“ বাহিনী মহালছড়িতে মুক্তিবাহিনীর মূল অবস্থানের দিকে অগ্রসর হতে পারেনি। তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করে কর্তব্যপরায়নতা ও দেশ প্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এজন্য তাঁকে দেয়া হয় বীরত্ব ও দেশ প্রেমের অমর স্কীকৃতি হিসেবে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধী।

বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ১৯৪৩ সালে পহেলা মে ফরিদপুরের বোয়ালমারী থানার আওতাধীন সালামত পুরে গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তারঁ পিতার নাম মুন্সী মেহেদী হোসেন ও মাতার নাম মুকিদুন নেছা। তিনি ১৯৬৩ সালের ৮ মে তৎকালীন ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস এ সৈনিক পদে যোগদান দান করেন। যার নাম্বার হল ১৩১৮৭। দেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ ২৫ বছর পর শহীদের কবর শনাক্ত হয় রাঙামাটি শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার উত্তরে নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের কাপ্তাই হ্রদের চারিদিকে ঘেরা চিংড়িখাল এলাকায় অপরুপ সৌন্দর্য্য ঘেরা একটি ছোট টিলায়। পরে এই টিলাতেই গড়ে উঠে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের স্মৃতি সৌধটি।

১৯৯৬ সালের দিকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রফিকূল ইসলাম (বীর উত্তম) মুন্সী আব্দুর রউফের শাহাদাৎ বরণের স্থানটি খুঁজে বের করার নিদের্শ দেন বিডিআরের রাঙামাটির সদর দপ্তরকে। কয়েক মাস আক্লান্ত পরিশ্রমের পর তৎকালীন সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর আব্দুল বারিক শিকদার তার সহযোগীদের নিয়ে স্থানটি খুঁেজ বের করেন। জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল যুদ্ধ শেষে চার দিন পর বুড়িঘাট এলাকার স্থানীয় অধিবাসী দয়াল কৃঞ্চ চাকমা শহীদ মুন্সি আব্দুর রউফের লাশ দেখতে পেয়ে ছিলেন। দয়াল কৃঞ্চ চাকমাই নিজ হাতে বীর শ্রেষ্ঠের মরদেহ এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ওই স্থানে সমাধিস্থ করেন। পরে তার সহযোগিতায় স্থানটি চিহ্নিত করে বিজিবি সদর দপ্তরের উদ্যোগে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর মুন্সী আব্দুর রউফের স্মৃতির উদ্দেশ্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সে সময় টিলাটি পরিস্কার করতে গিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধের দেড় ইঞ্চি কয়েকটি গুলিসহ কিছু স্মৃতি চিহৃ পাওয়া যায়। গুি লগুলোতে লেখা ছিল পিওএফ অর্ডন্যান্স ৬৩ লট। পরবর্তীতে বিজিবি সদর দপ্তর ও ২৪ পদাধিক ডিভিশনের আর্থিক সহায়তায় চার লক্ষ টাকার ব্যয়ে বীরশ্রেষ্ঠের কবরের ওপর একটি স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৭ সালের পহেলা মার্চ এই স্মৃতি সৌধ উদ্বোধন করেন বিজিবির তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান।

পরে বিজিবি রাঙামাটি সদর দপ্তর থেকে স্মৃতি সৌধটি আকার বৃদ্ধি ও সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিসহ পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ের কাছে তিন কোটি ২২ লক্ষ টাকার একটি প্রকল্প পাঠানো হয়। যা পরে বাস্তবায়িত হয়। পরে রাঙামাটি কেন্দ্রীয় শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফের স্মৃতির উদ্দ্যেশে গণপুর্ত বিভাগের উদ্যোগে রাঙামাটির রিজার্ভবাজারের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় ১১ লক্ষ টাকার ব্যয়ে একটি স্মৃতি নির্মাণ করা হয়।

বর্তমানে নানিয়ারচরের বুড়িঘাটে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ এর সমাধীটি রাঙামাটিতে নানা কারণে আসা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের অন্যতম গন্তব্য। কাপ্তাই হ্রদের সৌন্দর্য্য উপভোগের পাশাপাশি এই বীরের সমাধীসৌধে গিয়ে শ্রদ্ধা জানানো মানুষের সংখ্যাও তুলনামুলক কম নয়।

এদিকে ২০১৮ সাল থেকে মুন্সী আব্দুর রউফের শাহাদাৎবার্ষিকী পালন করে আসা সামাজিক সংগঠন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ফাউন্ডেশন  করোনা সংক্রমনের কারনে এবারের কর্মসূচী স্থগিত করেছে। সংগঠনটির উদ্যোক্তা ও পরিচালক ইয়াছিন রানা সোহেল জানান, ‘দিনটি পালনের জন্য এ বছর সীমিত পরিসরে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু করোনা সংক্রমনের কারণে তা স্থগিত করা হলো।’

 

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button