ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

এই পাহাড়েই ঘুমিয়ে আছেন এক বীরশ্রেষ্ঠ….

ফরিদপুর জেলার সালামতপুর গ্রামের ছেলে আব্দুর রউফ। বাবা গায়ের মসজিদের ইমাম মুন্সী মেহেদী হাসান সে হিসেবেই ছেলের নামের আগে যুক্ত মুন্সী। মা মুকিদুন্নেসা। জোহরা ও হাজেরার ভাই আব্দুর রউফকে বাবা আদর করে ডাকতেন রব। ১৯৪৩ সালের ১মে জন্ম নেয়া আব্দুর রউফের শিক্ষায় হাতেখড়ি বাবার কাছেই। বাবা মায়ের অদম্য ইচ্ছা ছেলেকে পড়াশোনা শেখাতে। মেধাবী এবং সাহসী হওয়া স্বত্তেও ছেলের ঝোঁক নেই পড়াশোনায়। ছেলে বরং জমে থাকা আড্ডায় চাচা ইস্ট বেংগল রেজিমেন্টের হাবিলদার চাচা মুন্সী মোতালেব হোসেনের সাথে। শুনেন সৈন্যদের গল্প,রাইফেলের গল্প। সৈনিকদের লেফট রাইটের গল্প যেন শব্দ হয়ে বাজতো কানে।অর্ধেকটা সময় কাটতো মধুমতী নদীর পাড় জুড়ে ঘুরে ঘুরেই।
১৯৫৫তে হঠাৎ বাবার মৃত্যু। কতই বা বয়স তখন রউফের। নিত্য অভাবে চলছে সংসার।তবুও মায়ের ইচ্ছেয় চেষ্টায় ছেলের পড়াশোনা গড়ালো অষ্টম শ্রেনী অব্দি। সুযোগ আসলো ইস্ট পাকিস্তানে যোগ দেয়ার।বয়স খানিকটা বাড়িয়ে দেখিয়ে ১৯৬৩ সালের ৮মে আব্দুর রউফ যোগ দেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে।
চুয়াডাঙ্গার ইআরপি ক্যাম্প থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষন শেষে যান পশ্চিম পাকিস্তান।ছয়মাস পর নিয়োগ পান কুমিল্লায়।
ছুটি পেলেই বাড়ি ছুটতেন রউফ। হঠাৎ বাড়ি যাওয়া কমে আসলে, মাকে চিঠির উত্তরে লিখেছিলেন,ইদানীং ব্যস্ততা বেড়েছে মা। সময় পেলেই বাড়ি আসবো। তুমি চিন্তা করোনা মা।

১৯৭১। ২৫শে মার্চের আগ অব্দী মুন্সী আব্দুর রউফ চট্টগ্রামে ১১নং উইংয়ে চাকরীরত ছিলেন। তিনি ছিলেন মাঝারী মেশিনগান ডিপার্টমেন্টের ১নং মেশিনগান চালক। যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব চলছে সবে। তিনি যুক্ত হয়ে গেলেন অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সংগে। প্রস্তুতি চলছে প্রতিরোধ গড়ে তোলার। রাঙামাটি-মহালছড়ি জলপথ। জল পাহড়ের নির্জন এই অঞ্চলে পাকিস্থানি বাহিনীর অবাধ গমনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব পড়লো অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কোম্পানীর উপর। কোম্পানীটি বুড়িঘাট এলাকার চিংড়িখাললের দুপাড়ে অবস্থান নিয়ে গড়ে তুললেন প্রতিরোধ। এই কোম্পানীর কমান্ডর হিসেবে দায়িত্ব পেলেন আব্দুর রউফ।

১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল। মধ্যদুপুরে জলের শান্ত ধারা ভেদ করে ভেসে আসছে বজ্রধ্বনি।ধেয়ে আসছে ৭টি স্পিড ২টি লঞ্চ।
স্বয়ংক্রিয় ভারী অস্ত্রশস্ত্রে পুরো প্রস্তুতিতে এগিয়ে আসছে পাকিস্থানের দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটেলিয়ান। লক্ষ্য মুক্তিবাহিনীর বুড়িঘাটের প্রতিরক্ষা ঘাঁটি।
মুক্তিবাহিনী কি আর ভয় পায়। দৃঢ় মনোবল তেজদীপ্ত অংগীকার আর স্বদেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা বুকে নিয়েই মুক্তি বাহিনীও প্রস্তুত নিজের পরিখায়। বুড়িঘাটের কাছাকাছি আসতেই শুরু পাক বাহিনীর হামলা। স্পিড বোট থেকে ক্রমাগত ধেয়ে আসছে মেশিনগানের গুলি আর লঞ্চ দুটো থেকে মর্টারের শেল। উপর্যুপুরি গোলার বর্ষনে অনেকটা দুর্বল হয়ে আসছিলো মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। পাকিবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রশসস্ত্রেই বিপক্ষে মুক্তিবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ছিলো। কমান্ডর আব্দুর রউফ উপলব্ধি করলেন এভাবে চললে মারা পড়বেন ঘাঁটির সবাই।
তিনি তৎখনাৎ পশ্চাৎপসারণের সিদ্ধান্ত নিলেন কৌশলগত কারণে। সহযোদ্ধাদের এ কথা জানিয়ে দিয়ে হটালেন পেছনের দিকে।

নিজে রয়ে গেলেন পরিখায়। অসম্ভব সাহসিকতা আর দৃঢ়চিত্তে মেশিনগানটি উঁচুতে তুলে নিয়েন ক্রমাগত গুলি ছুড়তে লাগলেন শত্রুপক্ষের স্প্রিডবোটের দিকে লক্ষ্য করে। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেয়া এই অকুতোভয় বীর শত্রুর কাছে মাথা নত করবেনা দম থাকতে। লড়ে যাচ্ছে একাই। রউফের গুলিতে থমকে গেলো শত্রুপক্ষ।এক এক করে ডুবে গেলো সাতটি স্প্রিড বোটই। দুটো লঞ্চ নিয়ে পিছু হটতে থাকা পাকিবাহিনী নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে ছোঁড়া শুরু করলো মোর্টারের গোলা। বাংকারে এসে পড়া গোলার আঘাতে ঝাঁঝড়া হয়ে গেলো তার সমস্ত শরীর। ততক্ষনে সহযোদ্ধারা সব পৌছে গেছেন নিরাপদ দূরত্বে। একটা মেশিনগান দিয়ে একাই লড়ে পিছু হটতে বাধ্য করেছিলেন শত্রুবাহিনীকে। প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন নিজের প্রায় ১৫০ সহযোদ্ধারও।এই অদম্য সাহস আর বীরত্বের জন্য পেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে পেয়ে যান সর্বোচ্চ সম্মাননা বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ।

বাংলার এই অকুতোভয় বীরের রক্তকণা মিশে গেছে এই জল পাহাড়ের হৃদে মাটিতে। ফেরা হলো না মায়ের কাছে। ১৯৯৬ সালের ২৫ এপ্রিল রাঙামাটিবাসী প্রথম জানতে পারে এই পাহাড়েই ঘুমিয়ে আছেন বাংলার এই অদম্য বীর। দয়াল চন্দ্র চাকমা নামে তার এক স্থানীয় পাহাড়ী যে ৭১ সালে তাকে সমাধিস্থ করেছিলেন তার সহায়তায় সনাক্ত করা হয় তার সমাধী। সনাক্তের পর সরকার তার সমাধীস্থলটি নতুনভাবে সংরক্ষন করেন। এছাড়াও ২০০৬ সালের ২৫মার্চ শহর রাঙামাটিতে ঢোকার মুখেই নির্মাণ করা হয় রাইফেল হাতে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের ভাস্কর্য সম্বলিত স্মৃতিস্তম্ভ।

রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার। বুড়িঘাট নামক স্থানে ছোট্ট একটা টিলা জুড়ে স্বমহিমায় বীরপ্রতাপে লেকের বুক জুড়ে জেগে আছে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধী। ভরা বর্ষায় লেকের জল আগলে রাখে সমাধিস্থল বেদী অব্দি।সার্বক্ষনিক পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত আছে কর্মী। এই নৌপথে চলাচলকারী যে কোন লঞ্চ থেকেও স্পষ্ট বীরযোদ্ধার সমাধীস্থল সীমান্ত শিখা।

শহর রাঙামাটি থেকে বোটযোগে যাওয়া যাবে এই বেদীতে বীরশ্রেষ্ঠের প্রতি সম্মান জানাতে। সময় লাগবে দু ঘন্টার মত। বিশাল আকাশের নিচে জলের মাঝে এই বেদীতে সমাধির সামনে দাঁড়ালেই শিউরে উঠবে লোমকূপ। সম্মানে অবনত হবে শির। দেশের প্রতি জাগবে ভালোবাসা আবারো। বাংলার দামাল ছেলে বাংলা এবং বাংগালী চিরঋনী তোমার কাছে………

এই বিভাগের আরো সংবাদ

ি কমেন্ট

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button
%d bloggers like this: