রাঙামাটিলিড

উৎসবের শহর রাঙামাটি!

মিশু মল্লিক ॥
কথায় বলে, বাঙালি জাতির বারো মাসে তেরো পার্বণ। কিন্তু পার্বত্য শহর রাঙামাটিতে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি মিলিয়ে প্রায় ১৪টি জাতিগোষ্ঠির বসবাস। তাই এই জনপদে উৎসব পার্বণের রঙটা যেন আরো উজ্জল। এতগুলো জাতিসত্তার মিশেলে গড়ে উঠা এই শহরে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন পূজো পার্বণ জমে উঠে ভ্রাতৃত্বের মহিমায়।

রাঙামটি শহরজুড়ে এখন উৎসবের ঘ্রাণ। দুর্গাপূজা, কালিপূজার রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই শঙ্খ, চক্র, গদা নিয়ে আর্বিভূত হলেন দেবী জগদ্ধাত্রী। বুধবার পূজা মধ্য দিয়ে শহরের জগদ্ধত্রী মাতৃমন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপি জগদ্ধাত্রী পূজা ও ষোড়শপ্রহরব্যাপী মহোৎসব। জগদ্ধাত্রী পূজাকে উপলক্ষ করে শহরের হ্যাপীর মোড়ে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মেলা। হ্যাপীর মোড়ের দুপাশে বনরুপা ও কোর্টবিল্ডিং পর্যন্ত পসরা সাজিয়ে বসেছেন মেলার দোকানিরা। সারাবছর এই মেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন রাঙামাটিবাসী। কে নেই এই মেলাতে? ছোট-বড়, আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলের উপস্থিতিতে উৎসবের আমেজ পুরো মেলাজুড়ে। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলছে এই মেলা। কিন্তু সন্ধ্যার পরপরই বাড়তে থাকে উপস্থিতি, মেলা প্রাঙ্গণ সরব থাকে মধ্যরাত পর্যন্ত। যেন মনে হয় পুরো রাঙামাটি এসে মিশেছে জগদ্ধাত্রী পূজার মেলায়।

মেলার দর্শনার্থী গৃহবধু নাজিয়া সুলতানা বলেন, আসলে আমরা প্রতিবছরই এই মেলায় আসি। পূজা উপলক্ষে মেলা হলেও এই মেলাতে সকল ধর্ম বর্ণের মানুষ আসে। একটা মিলনমেলায় পরিণত হয় এই মেলাটা।

কুমিল্লা থেকে এসে মেলায় মাটির তৈজসপত্রের পসরা সাজিয়েছেন কুদ্দুস মিয়া। তিনি বলেন, আমরা প্রতিবছর এই মেলাতে আসি। দুইদিনের মেলা হলেও মেলাতে প্রচুর মানুষজন হয়। আমাদের বেচা বিক্রিও খুব একটা খারাপ না। মেলাতে সব ধর্মের মানুষদের এই উপস্থিতি দেখতে আমাদেরও ভালো লাগে।

জগদ্ধাত্রী পূজা ও মহোৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি সুজন কান্তি মহাজন বলেন, জগদ্ধাত্রীর পূজা উপলক্ষে এই মেলাটি জগদ্ধাত্রী মেলা হিসেবে পুরো রাঙামাটিতে সমাদৃত। অনেকে সারাবছর অপেক্ষা করে থাকেন এই মেলার জন্য। আমরাও অনেক উৎসাহ উদ্দীপনায় এই মেলাটি আয়োজন করে থাকি। পুরো রাঙামাটির মানুষের এই মিলনমেলা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে।

শনিবার সকালে মহানামযজ্ঞের পূর্ণাহুতির মাধ্যমে শেষ হবে মহোৎসব এবং পাশাপাশি শেষ হবে এই মেলার আয়োজন।

এদিকে জগদ্ধাত্রী মেলার পাশাপাশি বৃহস্পতিবার থেকে রাঙামাটি রাজবন বিহারে শুরু হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান উৎসব কঠিন চীবর দান। চীবর শব্দটির অর্থ হচ্ছে বস্ত্র। রাঙামাটির বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা পূণ্য লাভের জন্য বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হাতে নিজ হাতে তৈরি করা চীবর তুলে দেন। চীবর চার খন্ডের একটি বস্ত্র যার মধ্যে থাকে দোয়াজিক, অন্তর্বাস, চীবর ও কটি বন্ধনী। একমাস পুরো জেলার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে পর্যায়ক্রমে কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হলেও সবচেয়ে বড় আয়োজনটি হয় রাজবন বিহারে। যেখানে চাকমা রাজা স্বয়ং উপস্থিত থেকে বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষের হাতে চীবর তুলে দেন। এই চীবর দান সম্পন্ন হয় চারটি প্রক্রিয়ায়। প্রথমে তুলা সংগ্রহ করা হয়, তারপর তুলা থেকে সুতা তৈরি করা, সুতা রঙ করা এবং সর্বশেষ কাপড় বোনার বাঁশের ফ্রেমে চীবন বোনা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয় ২৪ ঘন্টার মধ্যে। প্রথম দিন থাকে উদ্বোধনী আয়োজন। উদ্বোধনী আয়োজনের মধ্যে শুরু হওয়া এই বুনন শেষ হয় পরদিন ভোরে।

এই চীবর দান উপলক্ষে বিহার এবং বিহার সংলগ্ন এলাকা পরিণত হয় মিলনমেলায়। পাহাড়ি-বাঙালি, সকল ধর্মের মানুষ সানন্দে অংশগ্রহণ করে এই উৎসবে। চীবর দান উপলক্ষে বিহারের আশেপাশে জুড়ে জমে মেলা। মেলায় বানানো হয় পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পুলি, অনুষ্ঠিত হয় পিঠা উৎসব। পিঠা উৎসবসহ সহ নানান খাবার সামগ্রী ও তাদের নানান ঐতিহ্যবাহী পণ্যের দেখা মিলবে এই আয়োজনে। শুধু পূণ্য লাভের আশায়ই যে এই আয়োজন তা কিন্তু নয়। এই চীবর দানের আরেকটি বিশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ মাহাত্ম্য হচ্ছে, যেহেতু চীবর বোনা হয় বেই ন বা বাঁশের তেরি ফ্রেমে তাই এই আয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন এর মাধ্যমে একই সাথে পাহাড়ি জনগোষ্ঠেীর ঐতিহ্যও সংরক্ষিত এবং পরিচিত হয়। অন্যান্য বছরের মত এবারও চীবর তৈরি, কল্পতরু দান, ধর্মসভা এবং আকাশে ফানুস উড়ানোর মাধ্যমে শেষ হবে এই আয়োজন।

তারপর পরই আগামী সোমবার থেকে তবলছড়ি মাঝেরবস্তি এলাকায় শ্রীশ্রী গৌর নিতাই আশ্রমের রাসপূজা উপলক্ষে মাঝেরবস্তি মাঠে শুরু হবে রাসমেলা। শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলার অনুকরণে বৈষ্ণবীয় ভাবধারার এই আয়োজন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি বাৎসরিক আয়োজন। এই পূজাকে ঘিরে জমে উঠবে দুইদিনের মেলা। নানান ধর্ম বর্ণের সরব উপস্থিতিতে মেতে থাকবে পুরো শহরটা।

বিভিন্ন ধর্মের এই টানা উৎসব ও মেলাতে পার্বত্য এই জনপদটি এখন উৎসবের নগরী। সকল অনুষ্ঠানে নানান ধর্ম বর্ণের সরব উপস্থিতি যেন এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধনের। এই ভ্রাতৃশক্তিই যেন এই শহরের মানুষগুলোর সবচেয়ে বড় শক্তি।

প্রকৃতির মায়া জড়ানো উৎসবের পার্বত্য রাঙামাটি দেখতে যেকোন দিন আসতে পারেন এই জনপদে। পাহাড়ি এই শহরকে আপনাকে বরণ করে নিবে তাঁর উৎসবরে প্রতিটি রঙে।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 + 18 =

Back to top button