নীড় পাতা / পাহাড়ের রাজনীতি / ইউপিডিএফ-জনসংহতি (এমএনলারমা) : বন্ধু যখন শক্র !

ইউপিডিএফ-জনসংহতি (এমএনলারমা) : বন্ধু যখন শক্র !

এককালের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র সাথে সেই পুরনো প্রেম কিংবা ভালোবাসায় আগের জৌলুস নেই ইউপিডিএফ’র। বরং পুরনো প্রেম পরিণত হয়েছে শক্রতায়, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। মূল জনংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে ২০১০ সালে নতুন সংগঠন করার পর সুধাসিন্ধু-পেলে-রূপায়ন দেওয়ানরা যখন সন্তু লারমার কর্মীদের উপর্যুপুরি হামলা আর আক্রমনে নাভিশ^াস,সে সময় রাঙামাটি ছেড়ে খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ এর ঘাঁটিতে গিয়ে তাদের বুকেই রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছিলো দলটি। সেই থেকে যুগলভাবেই রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারন করেই সন্তু লারমাদের রুখার কাজ করে আসছিলো দল দুটি। সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতির নেতারাও এই এই দুই দলের সেই সময়কার ঐক্যকে ‘অনৈতিক’ দাবি করে এদের বিরুদ্ধে জুম্ম জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার অভিযোগ করেছিলেন।

কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৭ ! সাত বছরেই বদলে গেছে প্রেম ! সেই প্রেম আগের রূপ রস গন্ধ সুধা হারিয়েছে। বরং পথ উল্টে এখন মূল ইউপিডিএফ আর জনসংহতির নয়াপ্রেম গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। পুরনো প্রেম ভুলে নতুন জেএসএস এখন আরেক নতুন সংগঠন ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক) এর সাথে মজেছে প্রেমে। পাহাড়ের রাজনৈতিক এমন নয়া নয়া বাঁক পরিবর্তনে বিব্রত পাহাড়ের সাধারন মানুষ। কিন্তু নতুন পুরনো এসব বাঁককে যেনো উপভোগই করছেন এই দল চারটি।

সর্বশেষ জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র অন্যতম প্রভাবশালী নেতা নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা ও নতুন ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক) এর সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাকে হত্যার ঘটনায় পুরোন ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যকার বিরোধ আর তীব্রতা লাভ করে।

এরই প্রেক্ষিতে চলমান রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা এবং পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক) এর প্রচার বিভাগের প্রধান নিরন চাকমার সাক্ষরে পাঠানো গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সংগঠক শান্তিদেব চাকমা অভিযোগ করেছেন, ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে জেএসএস সংস্কারবাদীরা মোট ২৬ জনকে খুন ও কমপক্ষে ৯২ জনকে অপহরণ করেছে ! একই বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেছেন, গত এক সপ্তাহে সাত নিরীহ গ্রামবাসীকে অপহরণ, নির্যাতন ও এদের মধ্যে একজনকে অপহরণের পর খুন করা হয়েছে। ঘটনাগুলির দিনক্ষন উল্লেখ করে তিনি ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

ইউপিডিএফ মুখপাত্র নিরন চাকমা বলেছেন, এটা সত্য,অতীতে তাদের সাথে (জনসংহতি সমিতি-এমএনলারমা) আমাদের বোঝাপড়া ছিলো,এখন সেটা নেই। কারণ ২০১৭ সালের নভেম্বরে আমাদের দলের বহিষ্কৃত কিছু মানুষ যখন প্রশাসনের মদদপুষ্ট হয়ে নতুন একটি দল করে,তখন জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা) তাদের সাথে মিশে স্পাইয়িং এর কাজ শুরু করে এবং আমাদের নেতাকর্মী হত্যায় জড়িত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের বিষয়ে আমাদের সন্দেহ অবিশ^াস তৈরি হয়,দূরত্ব তৈরি হয়।
নিরন চাকমা বলেন, এটাতো সবাই জানে তারা কাদের মদদ পায়। এবং এই মদদ না পেলে এবং প্রশাসনের বগল থেকে বেরিয়ে আসলেই তাদের অস্তিত্ব বোঝা যাবে। তারা টিকেই আছে মদদে,তাদের নিজস্ব কোন শক্তি,সামর্থ্য কিংবা অবস্থান নেই।

শক্তিমান চাকমা হত্যাকান্ডের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে নিরন চাকমা আবারো বলেন, ‘এই হত্যাকান্ডের সাথে যে আমরা জড়িত,তার প্রমাণ কি ? আমরা তো হত্যাকান্ডের পরপরই বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি। এই ঘটনার সাথে আমাদের জড়িত করার কোন মানে নাই। কল্পিত অভিযোগের তো কোন ভিত্তি থাকতে পারেনা।’

তবে নিরন চাকমার সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)ও মুখপাত্র প্রশান্ত চাকমা বলেছেন,ইউপিডিএফ আর আমাদের সম্পর্কে কখনই খুব ভালো বা মাখামাখি ছিলো না। আমরা পার্বত্য চুক্তির পক্ষে,ওরা বিপক্ষে। তেল আর জলে কি মিশে কখনো ?’

২৬ খুন ৯২ অপহরণের যে অভিযোগ ইউপিডিএফ’র তা অস্বীকার করে তিনি বলেন, এসব সম্পূর্ণ মিথ্যা,বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ। আমাদের ভাবমূতি নষ্ট করার জন্য তারা নিজেরা অপকর্ম করে আমাদের উপর দোষ চাপায়।’

সাম্প্রতিক সময়ে সন্তু লারমার জনসংহতি ও প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর ঐক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই দুই দলের ঐক্যর কথা আপনার বলেন, আমরাও শুনি, কিন্তু আমরা বিশ^াস করিনা। কিভাবে তাদের ঐক্য সম্ভব,তারা দুইদল ২০ বছর একে অপরকে হত্যা করেছে,লড়াই করছে,সেখানে ঐক্য কিভাবে সম্ভব ? যদি কিছু হয়ও,সেটা দুই দলের স্বার্থের ও প্রয়োজনের ঘনিষ্ঠতা মাত্র।’

প্রশান্ত চাকমা বলেন, ইউপিডিএফ এর কথা ও কাজে কোন মিল নাই। তারা কখন কি বলে বোঝা কঠিন। এরা ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলায়। এদের কথা ষোল কণার এক কণাও বিশ^াস করিনা আমরা। এরা ২০ বছরেও জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়নি,এরা আসলেই কি চায় !

নিজেদের বিরুদ্ধে আনা প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও মদদ পাওয়ার অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ দাবি করে প্রশান্ত চাকমা আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সবাই জানে প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর জন্ম কোথায়! এখন তারা যদি অন্য কারো কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলে সেটা হাস্যকর।’

প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সাক্ষরের সময় চুক্তির বিরোধীতা করে প্রসীত খীসার নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিগত ২০ বছর সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির সাথে ভ্রাতৃঘাতি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে অন্তত: ১ হাজার নেতাকর্মী সমর্থক প্রাণ হারিয়েছে। অন্যদিকে ২০১০ সালে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে সুধাসিন্ধু খীসা,তাতিন্দ্রলাল চাকমা পেলে,রূপায়ন দেওয়ানদের নেতৃত্বে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)।

আরো দেখুন

রাঙামাটি শহরে আওয়ামীলীগ-বিএনপি সংঘর্ষে আহত ৮

পার্বত্য শহর রাঙামাটিতে নির্বাচনী পথসভাকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগ ও বিএনপির কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

thirteen + eighteen =