অরণ্যসুন্দরীখাগড়াছড়িব্রেকিং

আহ্ ! তৈলাফাং ঝর্ণা

জনপ্রিয় হচ্ছে ধীরে ধীরে

করোনার প্রভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল খাগড়াছড়ির পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্র। তবে টানা বন্ধের পর এখন খুলেছে পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো; বেড়েছে জনসমাগমও। পার্বত্য এই জেলাটি পাহাড়, নদী, ছড়াঝিরি-ঝর্ণাময় সবুজ প্রকৃতি ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মেলবন্ধনের জন্য বিখ্যাত। দেশ ও বিদেশের পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়ও। করোনার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাফেরায় শিথিলতা ও পর্যটন কেন্দ্রগুলো শর্তসাপেক্ষে খুলে দেওয়ায়, অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে স্থানীয়রা ছাড়াও অন্যান্য উপজেলা-জেলার ভ্রমণপিপাসুরা ভ্রমণে আসছেন। এখন পর্যটকদের কাছে ‘তৈলাফাং’ ঝর্ণা হয়ে উঠছে অন্যতম পছন্দের স্থান। নিজেরাই খোঁজখবর নিয়ে নিরাপত্তা ও গাইডের ব্যবস্থা করে ভ্রমণে যাচ্ছেন। বেড়াচ্ছেন নানান নয়নাভিরাম পাহাড়, গুহা, ঝিরি-ঝর্ণা ও লেকে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, নতুন সন্ধান পাওয়া জায়গাসমূহে বেড়াতে পর্যটকদের আগ্রহ সবসময় বেশি থাকে। খাগড়াছড়ির পর্যটন খাতে এমনি একটি আকর্ষণীয় জায়গা হচ্ছে ‘তৈলাফাং’ ঝর্ণা। স¤প্রতি এর সন্ধান মিলে। এরই মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ঝর্ণাটি। মাটিরাঙ্গা উপজেলা সীমানার মধ্যবর্তী একটি গ্রাম কাতালমনি পাড়ায় তৈলাফাং ঝর্ণাটির অবস্থান। অর্ধশতাধিক ফুট উঁচু ও ২০ ফুটের অধিক বিস্তৃতি। ঝর্ণাটি স্থানীয়দের তো বটেই, দেশের অন্যান্য ভ্রমণপিয়াসী পর্যটকদেরও নজর কেড়েছে।

যেভাবে যাবেন
তৈলাফাং ঝর্ণায় যাওয়ার একাধিক পথ রয়েছে। খাগড়াছড়ি শহর হতে পানছড়ি উপজেলার মরাটিলা এলাকা পার হয়ে গেলে দূরত্ব কম। পথের শেষদিকে ভয়ংকর দুটি পাহাড় জয় করতে হবে। খাগড়াছড়ি থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা , মাহিন্দ্র, পিকআপ, মোটরসাইকেলে সড়কযোগে যাওয়া যায়। পানছড়ি বাজার হতে তবলছড়ি যাওয়ার পথে, মরাটিলার পর প্রিন্সিপালের বাগান থেকে একটু সামনে কাতালমনি পাড়া-ভাইবোনছড়া সংযোগ সড়কে নেমে যেতে হবে। এখান থেকে কাতালমনি পাড়ার দূরত্ব প্রায় ৬/৭ কিলোমিটার। মেঠোপথ। বৃষ্টি হলে হেঁটে যেতে হবে। শুকনো আবহাওয়ায় মোটরসাইকেল যোগে ৪ কিলোমিটারের বেশি পাড়ি দেয়া যায়।

পিচঢালা সড়ক থেকে হেঁটে ঝর্ণায় পৌঁছাতে ঘণ্টা দুই সময় লাগতে পারে। সংযোগ সড়ক থেকে কাঁচা মেঠোপথ ধরে বৌদ্ধবিহার এলাকায় গিয়ে যে-কাউকে জিজ্ঞেস করলে ঝর্ণায় নামার পথ দেখিয়ে দিবে। এই নামার পথটিই সবচেয়ে ভয়ংকর। সামান্যতম অমনোযোগী হলে ঘটে যেতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। সাবধানতা অবলম্বন করতেই হবে। নাহলে হঠাৎ পাহাড়ের নিচে কোথায় হারিয়ে যাবেন, নিজেই টের পাবেন না। উদ্ধার করা মুশকিল হবে।

যেহেতু একদম গ্রামীন প্রত্যন্ত এলাকা; সেহেতু এখানে ভালো মানের দোকানপাট নেই। একটিমাত্র দোকান আছে। চা, বিস্কুট খেতে পারবেন। তবে খাবার, সুপেয় পানিসহ অন্যান্য যা লাগে তা শহর থেকে নিয়ে আসাই ভালো। উঁচু পাহাড় থেকে ঝর্ণায় নামার প্রধান ভরসা নিজের হাত ও পা। গাছ, লতাপাতায় অবলম্বন করে সাবধানে নামতে হয়। বৃষ্টিমুখর দিনে বা আগে-পরে গেলে রৌদ্রজ্বল দিনে যাওয়া ভালো। বৃষ্টিতে ভিজা মাটি পিচ্ছিল, নরম হয়ে যায় তাই শক্ত দড়ি নিয়ে নামতে পারলে ভালো। ভয়কে জয় করে নিচে নেমেই দেখতে পাবেন পাহাড়ি রাজকন্যা ‘তৈলাফাং’। পাশেই ছোট-বড় আরও ২টি ঝিরি-ঝর্ণা রয়েছে। তৈলাফাং ঝর্ণার ঠিক বিপরীতে একটু উপরের রাস্তা পেরিয়ে পাথুরে জঙ্গলের শেষে দেখা মিলবে ছোট-বড় ঝর্ণা দুটির। তৈলাফাং হতে দূরত্ব ৫০ মিটারের মতো। ঝিরির দুই পাশেই উঁচু পাথুরে মতো পাহাড়। আছে বড় বড় পাথরখÐ, গাছ। পাথুরে দেয়াল বেয়ে নামছে স্রোতধারা। ঝর্ণা লাগোয়া এই পাহাড়ের উপর একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বৌদ্ধ বিহার আছে। তাই ঝর্ণা এলাকায় উচ্চ আওয়াজ, হৈ হুল্লোড় করা থেকে বিরত থেকে সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে সহযোগিতা করতে হবে। স্থানীয় জনসাধারণের জীবনধারার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে ভ্রমণ উপভোগ করুন।

চারপাশের উঁচু-নিচু পাহাড়ে স্থানীয়রা জুম ক্ষেত। তাতে ধান, ভূট্টা, হরেক রকমের ফল-সবজি চাষ করেছেন। ঝর্ণায় যাওয়ার পথে দূর পাহাড়, লেবু, কচু, সেগুন বাগান ও জুমের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ পর্যটকগণ ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারেন খুব কমই। সুউচ্চ সবুজ পাহাড় ও গভীর অরণ্য আর ঝর্ণাগুলো মুগ্ধ করবে যেকোনো পর্যটককে।

সম্প্রতি উল্টাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বাবুল ঝর্ণাটিতে বেড়িয়ে এসেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘করোনাকালে দীর্ঘদিন বন্দি। তৈলাফাং ঝর্ণার কথা জেনে একটু প্রশান্তির খোঁজে বেড়িয়ে এসেছি। অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য এটি আদর্শ। ঝর্ণায় পৌঁছানোর পথ অত্যন্ত ভয়ংকর। পাহাড় ও ঝর্ণা ভালো লাগে যাদের, তারা এই ঝর্ণাটি বেশ উপভোগ করবেন।।’

আরেক পর্যটক উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা অরুনাংকর চাকমা পরিবার নিয়ে তৈলাফাং ঝর্ণায় ভ্রমণ করে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘ঝর্ণায় যাওয়ার পথ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারের পক্ষ থেকে রাস্তাসহ পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ সুবিধাজনক হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে স্থানীয়রা খুব উপকৃত হবে। জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।’

প্রকৃতির এই অসাধারণ বন, মেঠো পথের চারদিকে কেবলই মনমাতানো সৌন্দর্য। প্রকৃতি তার অকৃপণ হাতে সাজিয়েছে এলাকাটি। গাছগুলোর ঝোপ জঙ্গলের নিবিড়তা অন্যান্য বনভূমির চেয়ে বেশি। মানুষের ছোঁয়া বহির্ভূত বেশকিছু গাছ তার আদি রূপ অনেকটাই ধরে রেখেছে। ফলে যে-নৈসর্গিক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে তাতে সব বয়সী মানুষের মন আকৃষ্ট হতে বাধ্য। এই কারণে ভ্রমণপিপাসুরা প্রায়ই ভিড় করছেন তৈলাফাং-এ। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন বিনোদনের জন্য ছুটে আসছেন এখানে।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button