খাগড়াছড়িব্রেকিং

আবার বাড়ছে অবিশ্বাস..দুরত্ব…

খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান নিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রাম। যেখানে বাঙ্গালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ¤্রাে, লুসাই, পাংখোয়াসহ ভীন্ন ভীন্ন জাতিগোষ্টী মানুষের সম্মিলিত বসবাস। উৎসব-পার্বন যেখানে মিলেমিশে একাকার। পাহাড়ের রুপ আর ভীন্ন জাতিগোষ্টীর কৃষ্টি, সংস্কৃতি যে কারো দৃষ্টি আকর্ষন করবে। পর্যটনমুখোর এই জনপদ দেশ, দেশের বাইরের মানুষের প্রিয় স্থান। তবে উপরের বিষয়গুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের সহজ পরিচিতি হলেও এর ভেতরের বাস্তবতায় আছে অবিশ্বাস, দুরত্ব, ক্ষোভ। যার সর্বশেষ প্রমাণ লংগদু ঘটনা।

রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলা সদর ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ গিয়ে ঠেকে পাহাড়ীদের বাড়ী ঘরে আগুন দেয়ার মত ঘটনায়। ইতিমধ্যে বাড়ী ঘরে পাহাড়ীরা ফিরতে শুরু করেছে। আগুন দেয়ার ঘটনায় লংগদু থানায় দায়ের করা হয়েছে মামলা। নয়ন হত্যাকান্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে খাগড়াছড়ি সদর থানায়। তদন্ত করছে পুলিশ। তবে ঘটনা থেমে গেলেও শুকায়নি ক্ষত। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙ্গালী একসাথে থাকলেও আছে অদৃৃশ্য দুরত্ব, অবিশ্বাস। সাম্প্র্রদায়িক ঘটনা ঘটলেই যেটি কিনা দৃশ্যমান হয়। একের পর একে মন ঘটনা ঘটে যাওয়ার কারণে দিনে দিনে এই দুরত্ব ও অবিশ্বাস বাড়ছে।

দীর্ঘ বছর পার হয়ে গেলেও পূনর্বাসিত বাঙ্গালিদের গ্রহন করতে পারেনি পাহাড়ীরা। তাই আঞ্চলিক দলগুলোর রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকে পূনর্বাসিত বাঙ্গালি। দলগুলো চাই তাদের পুনরায় সমতলে পূনর্বাসন করা হোক। কারণ দলগুলোর মতে পুনর্বাসিত বাঙ্গালিরা পাহাড়ে এসে তাদের ঘরবাড়ী দখল করায় দুরত্ব অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে প্রায় সাম্প্রদায়িক ঘটনা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে একের পর এক ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকরি কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেনা বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) খাগড়াছড়ি সংগঠক মাইকেল চাকমা বলেন, নয়ন হত্যার সাথে কারা জড়িত এখনো পরিস্কার নয়। কিন্তু পাহাড়ীদের দায়ী করে গুজব ছড়িয়ে তাদের শত শত ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি এককভাবে বাঙ্গালিদের দায়ী করছিনা। কারণ এই ঘটনায় নেপথ্যে বড় শক্তি আছে। যারা কিনা পূনর্বাসিত বাঙ্গালিদের লেলিয়ে দিয়ে জাতিগত নিপিড়ন চালাচ্ছে। আমরা পাহাড়ী-বাঙ্গালি সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি। আর নেপথ্যে আছে সরকার। সরকার যতদিন জাতিগত নিপিড়ন বন্ধ করবেনা ততদিন পাহাড় শান্ত হবেনা। অপহরণের নাটক সাজিয়ে তাইন্দং ঘটনা সৃষ্টি করা হলো। ঘটনাটির সঠিক বিচার হয়নি। যদি অতীতের সব সাম্প্রদায়িক ঘটনার বিচার হতো তাহলে লংগদু ঘটনার সৃষ্টি হতোনা।

তিনি বলেন, আমরা চাই নয়ন হত্যার বিচার হোক। এই ঘটনায় যদি পাহাড়ী জড়িত থাকে তাকেও আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক। পাশপাশি লংগদুতে আগুন দেয়ার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কারা জড়িত তাদেরও খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। যদি তা করা না হয় তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যে ঘটবেনা তার কিন্তু গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবেনা। জাতিগত নিপিড়ন বন্ধ করে রাজনৈতিকভাবে পাহাড়ের সব সমস্যার সমাধান, সেনা প্রত্যাহার, পূনর্বাসিতদের সমতলে পূনর্বাসন করার কথা বলেন। শুধু শান্তি র‌্যালী, বৈঠক করলেই পাহাড়ী-বাঙ্গালীর মধ্যে আস্থা বিশ্বাস ফেরানো সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তবে অস্ত্রবাজি, সন্ত্রাস, আঞ্চলিক দলের আধিপত্ত্য দমন করা গেলে পাহাড়ে শান্তি আসবে বলে মন্তব্য করেছেন বাঙ্গালি সংগঠনগুলো। আর পূনর্বাসিত বাঙ্গালিদের সমতলে পুনরায় সরিয়ে নেয়াটা অযৌক্তিক দাবী বলা হচ্ছে।

পার্বত্য বাঙ্গালি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্র্রীয় নেতা আব্দুল মজিদ বলেন, পাহাড়ে খুন, অপহরণ, গোলাগুলির সাথে কারা জড়িত সেগুলো নতুন করে বলার দরকার নেই। আঞ্চলিক দলগুলো অস্ত্র্রের আধিপত্যে পাহাড়বাসী জিম্মি। বাঙ্গালিদের গুলিতে পাহাড়ী মারা গেছে এমন নজিড় নেই। অতীত ঘাটলেই বোঝা যাবে। কিন্তু কিছু ঘটলেই দোষ দেয়া হয় বাঙ্গালীদের। তিনি বলেন, প্রশাসনের দূর্বলতার কারণে পাহাড়ে সহিংস ঘটনা বাড়ছে। যদি অতীতের খুন, অপহরণসহ সহিংস ঘটনাগুলোর হতো তবে নতুন করে সহিংস ঘটন ঘটতোনা। তিনি লংগদুর মত ঘটনা কোনভাবে কাম্য নই উল্লেখ করে বলেন, এর পেছনে কারা আছে তা খতিয়ে দেখে বিচারের আওতায় আনা উচিৎ। সাথে নয়ন হত্যাকান্ডের সাথে কারা জড়িত তাদেরও খুঁজে বের করতে হবে। যদি তা না হয় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এমন ঘটনা চলতে থাকবে। তিনি আরো বলেন, দূর্গম পার্বত্য এলাকায় নিরাপত্তার ঘাটতি আছে। তাই রাস্তার পাশসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএন লারমার গ্রুপ)র মুখপাত্র সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ে একের পর এক যেভাবে সাম্প্র্রদায়িক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে এতে পাহাড়ী-বাঙ্গালিদের মধ্যে দুরত্ব আরো বাড়ছে। সৃষ্টি হচ্ছে অবিশ্বাস। এভাবে চলতে থাকলে অদুর ভবিষ্যত খুব সুখকর হবেনা। নয়ন যেহেতু ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক সেক্ষেত্রে তাঁর মোটরসাইকেলের যাত্রী যে কেউ হতে পারে। তাই বলে না জেনে পাহাড়ীদের এককবাবে দায়ী করার কোন কারণ দেখছিনা। নয়নের হত্যাকান্ড অবশ্যই দুঃখজনক। আমরাও হত্যার বিচার চাই। কিন্তু এক নয়নের হত্যাকে কেন্দ্র করে যে পাহাড়ীদের শত শত সাজানো সংসার যে আগুনে পুড়ে দিয়েছে তার কি হবে?। এতগুলো মানুষকে নিঃস্ব করে দেয়াটা কি ঠিক হয়েছে। যে মিছিল থেকে বাড়ী ঘরে আগুন দেয়া হয়েছে সেই মিছিলের সবাইকে দায়ী করছিনা। আর আগুন দেয়ার সাথে জড়িত তাদেরকেও এককভাবে দায়ী করছিনা। কারণ নিশ্চই নেপথ্যে আরো বড় শক্তি আছে। ঘটনায় আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি আর লাভবান হয়েছে সেই বড় শক্তিটি।

পাহাড়ী বাঙ্গালী সম্পর্ক তুষের আগুনের মত জ্বলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ঘটনায় শেষ ঘটনা নয়। যথাযথ ক্ষতিপূরনসহ ঘটনার বিচার করতে হবে। নেপথ্যের নায়কদের খুঁজে বের করতে হবে। যদি তা না হয় আস্থার যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে হয়তো ভবিষ্যতে তা আরো ভয়াবহ রুপ নিতে পারে। কারণ দৃশ্যমান ঘটনা থেমে গেলেও পাহাড়ীদের মনে কিন্তু ক্ষতটা থেকেই যাবে। সেখান থেকে দুরত্ব, অবিশ্বাস, ক্ষোভের সৃষ্টি হবে।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button