অরণ্যসুন্দরীবান্দরবানব্রেকিংলিড

আন্ধারমানিকের পথে পথে রহস্যের হাতছানি…

আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান
বান্দরবানে থানচি উপজেলার রোমাঞ্চকর রহস্যময় দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম আন্ধারমানিক। নৈসর্গিক এই সৌন্দর্যের পথে পথেই যেন রহস্যের সব হাতছানি। পাহাড়ের আকাবাঁকা উঁচুনিচু সড়ক পথ পেরিয়ে সাঙ্গু নদী পথেই যতসব সৌন্দর্যের সমারোহ। রহস্যময় মায়াজালে ঘেরা যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর থানচি উপজেলাটি। মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েই রহস্যে ঘেরা দর্শনীয় স্থান আন্ধারমানিক ভ্রমণে ছুটে যাচ্ছেন ভ্রমনপিপাসু মানুষেরা। তবে আন্ধারমানিক যাবার ভাগ্যের টিকেট সবার জুটেনা! তাই দর্শনীয় স্থানটির সৌন্দর্যের রহস্য এখনো অনেকের কাছেই অজানা।

থানচিতে আন্ধারমানিকের পথে বাংলাদেশের শেষ সীমান্ত নিরাপত্তা চৌকি বড়মদক বজিবি ক্যাম্প (ভিওপি) পেরিয়ে যেতে হয় আন্ধারমানিক। নিরাপত্তাজনতি কারণে বিজিবি ক্যাম্পের পর কাউকে ওই পথে যেতে দেয়া হয়না। অনেকটা নিষিদ্ধ আন্ধারমানিক পর্যন্ত যাওয়া। তবে কখনো কখনো পরিস্থিতি বিবোচনায় বিজিবির নিরাপত্তা বলয়ের সাথে ভ্রমণ পিপাসুদের যেতে দেয়া হয় রহস্যময় দর্শনীয় স্থান আন্ধারমানিকে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চোখ এড়িয়েও অনেকে নানা কৌশলে স্থানীয়দের সহায়তায় পৌঁছে যায় আন্ধারমানিকের গন্তব্যে।

জেলার থানচি উপজেলার রেমাক্রী ইউনিয়নের বড়মদক এলাকায় দর্শণীয় স্থান আন্ধারমানিকের অবস্থান। সাঙ্গু নদী পথে পাহাড়ের গহীনে লুকিয়ে থাকা ভয়ংকর সৌন্দর্যময় একটি গন্তব্যের নাম হচ্ছে আন্ধারমানিক। নিরাপত্তাজনতি কারণে সচরাচর যেতে না দেয়ায় অনেকের কাছে এটি নিষিদ্ধ আন্ধারমানিক নামেও পরিচিত। দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়ায় সাঙ্গু নদীর উজানে যেখান থেকে সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্টের যাত্রা শুরু। ঠিক সেখানেই প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ডানা মেলে বসে থাকা আন্ধারমানিক দর্শনীয় স্থানটি যেন চেনা পৃথিবীর বাইরের অচেনা কোনো জগত। নামের মতই ভয়ংকর, রহস্যময়, রোমাঞ্চকর পরিবেশ আন্ধারমানিকের।

প্রকৃতির অদ্ভুত এক সৃষ্টি হচ্ছে আন্ধারমানিক। সূর্যের সরাসরি আলো পৌছায় না এখানে, সূর্যের আলো কম পৌঁছানোর কারণে জায়গাটি সবসময় অন্ধকার-ই দেখা যায়। সম্ভবত এই কারণেই জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছে আন্ধারমানিক। অবশ্যই নামকরণের অন্যকোনো ব্যাখ্যাও জানা যায়নি। আন্ধারমানিক স্পটটির মূল আকর্ষণ হচ্ছে ‘নারেসা ঝিরি’। ঝিরির দু’পাশ পঞ্চাল থেকে সত্তর/আশি ফুট খাড়া পাথরের দেয়াল সমান্তরাল ভাবে অনেকদূর চলে গেছে। মনে হবে মানুষের তৈরি করা কোনো সীমানা প্রাচীরের দেয়াল।

রেমাক্রী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মালিরাম ত্রিপুরা জানিয়েছেন, আন্ধারমানিক যেতে হলে আপনাকে প্রথমে রেমাক্রি থেকে ছোটমদক হয়ে বড়মদক পর্যন্ত যেতে হবে। রেমাক্রি থেকে ইঞ্জিন নৌকা ও পাহাড়ি ঝিরি-ঝরণা পথে হাঁটা পথ। সাঙ্গু নদীর পাড় ধরে পায়ে হেটে ঝোপঝাড়-পূর্ণ পাহাড়ি পথ পেরিয়েও যাবার অনুভূতি অন্যরকম। তবে যেভাবেই যান না কেন? সন্ধ্যার আগেই কিন্তু আপনাকে বড়মদকে পৌঁছাতে হবে। খৈসাপ্রু ও চাখাই পাড়ার পর সিঙ্গাফা ও ঠা-া ঝিরি সাঙ্গু নদীতে মিলিত হয়েছে। কিছুদূর পরই তুর্গঝিরি দেখতে পাবেন। সেখান থেকে আবার পাহাড়ি পথে যেতে হবে অন্ধকার জগৎ আন্ধারমানিক।

স্থানীয়দের মতে, আন্ধারমানিকে পাহাড় থেকে নেমে আসা একটি ছড়া মিলিত হয়েছে সাঙ্গু নদীতে। ছড়ার দু’পাশের পাহাড়ের দেয়াল খাড়া নেমে গেছে পানির গভীর তল পর্যন্ত। পাহাড়ের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ভেদ করে সূর্যের আলো সরাসরি পৌঁছায় খুব কম ছড়ার পানিতে। আলো আঁধারের লুকানো সৌন্দর্যের কারণে জায়গাটির নাম আন্ধারমানিক। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আন্ধারমানিকের পথে পথে বয়ে চলে অসংখ্য ঝর্না। বিভিন্ন ছোটবড় গাছের ডালপালার ছায়ায় ঢাকা এবং সুনশান নীরব চারপাশ। দূর থেকে বয়ে আসে একাধিক ঝর্নার পানির ঝিরিঝিরি শব্দ। ভয়ে চমচম করে উঠে গাঁ। ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকা বা বাঁশের ভেলায় চরেও আন্ধারমানিকের ভিতরে এগিয়ে চলার অনুভূতি সত্যিই দারুন রোমাঞ্চকর। নদী, পাহাড়, ঝরণা, পাথর আর সবুজের মাঝপথে রহস্যময় আন্ধামানিক ভ্রমণের স্মৃতি আপনার জীবনে স্মরণীয় থাকবে আজীবন।

এদিকে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, ‘নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভারপুর বান্দরবানে পর্যটকদের আগমন বেড়েই চলেছে। পাহাড়ের প্রকৃতি অক্ষত রেখেই পর্যটন শিল্পের বিকাশে কাজ করছে প্রশাসন। পাহাড়ের প্রকৃতি রক্ষায় প্রশাসনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদেরও সচেতন হতে হবে। দেবতাখুম, নাফাখুম, অমিয়াখুমসহ দূর দূরান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লুকিয়ে থাকা দর্শনীয় স্থানগুলো রক্ষায় উদ্যোগ নেয়া হবে। দর্শনীয় স্থানগুলোতে পর্যটকদের নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

কিভাবে যাবেন
ঢাকা বা চট্টগ্রাম হয়ে যে কোনো গাড়িতে চড়ে পৌঁছাতে হবে বান্দরবান। বান্দরবান জেলা শহর থেকে আপনাকে যেতে হবে থানচি উপজেলা সদরে। যাত্রীবাহী বাস কিংবা রিজার্ভ গাড়িতে করেও যেতে পারেন। থানচি থেকে সাঙ্গু নদী পথে ইঞ্জিন নৌকায় করে তিন্দু, রেমাক্রী, ছোটমদক পেরিয়ে পৌঁছাতে বড়মদক পাড়া বাজারে। চলার পথে কোথাও কোথাও পাথরের কারণে নৌকা থেকে নেমে হাঁটতে হবে অনেকটা পথ। বড়মদক পৌঁছানোর পর বাজারের পাশ^বর্তী পাহাড়ের উঁচুতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি ক্যাম্পের অনুমতির ওপরই আন্ধারমানিক যাওয়া নির্ভর করে। ভাগ্য সহায় হলে অনুমতি সাপেক্ষে অন্ধকার জগৎ আন্ধারমানিক ভ্রমণে সুযোগ মিলবে আপনার।

থাকবেন কোথায়
রেমাক্রিতে কিছু গেস্ট হাউজ আছে। এছাড়া ছোটমদক ও বড়মদক পাড়াগুলোতে অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় পাহাড়িদের মাচাং ঘরেও থাকতে পারবেন। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাও করে দিবেন তারা।

যা জানা জরুরি
বড়মদক বাজারে পৌঁছানোর পরই বিজিবি ক্যাম্পে রিপোর্ট করবেন। নিরাপত্তাজনতি কারণে নাম-ঠিকানাসহ যাবতীয় তথ্য উপাত্ত লিপিবদ্ধ করতে হবে। কারণ বিজিবি ক্যাম্পের অনুমতি ছাড়া আন্ধারমানিক যাওয়া সম্ভব নয়। ওখানে মোবাইল নেওয়ার্ক নেই। বিদ্যুৎ সুবিধাও এখনো পৌছায়নি। তাই ভ্রমণের সময় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে ভুলবেন না।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Back to top button