বান্দরবানব্রেকিং

আধিপত্যের লড়াইয়ে পরিকল্পিত হত্যাকান্ড

বিবাদমান আঞ্চলিক দলের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বার বার হঠাৎ অশান্ত হয়ে উঠে সবুজ পার্বত্য চট্টগ্রাম। বান্দরবানের জামছড়িতে ব্রাশফায়ারে তিনজনের মৃত্যুর চার মাসের ব্যবধানে এবার জেলার রাজবিলা ইউনিয়নে আবারও প্রতিপক্ষের ছোঁড়া গুলিতে ঝরল ছয় প্রাণ। আধিপত্যের লড়াইয়ে জেলা সদর উপজেলার রাজবিলা, কুহালং এবং সদর চারটি ইউনিয়নে একের পর এক পরিকল্পিত হত্যায় মেতেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।

আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, রাজবিলা ইউনিয়নের জামছড়ি পাড়া বাজারে অস্ত্রধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি বাচুনো মারমা, সাবেক ইউপি সদস্য উচথোয়াই এবং স্থানীয় বাসিন্দার বাখোয়াই মারমা তিনজনের মৃত্যু হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিল যুবলীগের নেতাসহ আরও চার জন। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার সন্ত্রাসীদের গুলিতে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি বিমল কান্তি চাকমাসহ সংগঠনের শীর্ষ ৬ জন। গুলিবিদ্ধ হয়েছে আরও তিন জন।

গত ১৬ জুন কুহালং ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার (ইউপি সদস্য) আওয়ামীলীগ নেতা চাইনা ছাহ্লা মারমা (৩৪) বাড়ি ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। শনিবার (৫ জুলাই) কুহালং ইউনিয়নের রাবার বাগান এলাকা থেকে স্থানীয় যুবক গুংগা জলি ত্রিপুরা (৪১) এবং বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সদর ইউনিয়নের হেব্রন পাড়া থেকে মোটর-সাইকেলে বাড়িতে যাবার সময় আওয়ামীলীগের কর্মী লুলথাং বম (৩০) অপহরণ করে নিয়ে গেছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে অপহৃতদের ব্যবহৃত মোটর সাইকেল উদ্বার করা হলেও অপহৃতদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এর আগেও গেল বছর মে মাসে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ৩ জনকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছিলো। এগুলো হচ্ছে ৭ মে জেএসএস কর্মী বিনয় তঞ্চঙ্গ্যা, খেলাধন তঞ্চঙ্গা দুজন এবং ৯ মে রাবার বাগান পাড়ায় জেএসএস কর্মী জয়মনি তঞ্চঙ্গ্যাকে হত্যা করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক কয়েকজন জনপ্রতিনিধি বলেন, বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলাও বিপদ। উভয়ের টার্গেটে পরিণত হতে হয়। বান্দরবান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি জেলা ছিলো এতদিন। পাহাড়ের মূল আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস’কে কোনঠাসা করতে জেএসএস (এমএন লারমা) এবং মারমা জনগোষ্ঠীর নাম ব্যবহার করে ‘মগ লিবারেশন পার্টি’ (এমএলপি) মাথাচাড়া দিয়েছে সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি চারটি উপজেলায়। মূলত রাজবিলা ইউনিয়নের তাইংখালী বাজারে গতবছরের ১৪ এপ্রিল জনসংহতি সমিতির এক নেতাকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই থেকে আধিপত্যের লড়াই শুরু হয়েছে বান্দরবান জেলায়। আধিপত্য বিস্তার নিয়েই তিনটি গ্রæপের পাল্টাপাল্টি হামলায় রক্তাক্ত হচ্ছে বান্দরবান। অস্তিত্ব রক্ষায় আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদেরও টার্গেট করে হত্যা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বান্দরবান জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার মেয়র মো. ইসলাম বেবী বলেন, পাহাড়ে আধিপত্যের জেরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর পাল্টাপাল্টি হামলায় রক্তাক্ত হচ্ছে পাহাড়। সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবান জেলায় একাধিক আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের টার্গেট করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসীদের অভ্যন্তরীণ দ্ব›েদ্ব নিরীহ সাধারণ মানুষও মারা যাচ্ছে। পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধে সরকারের কঠোর প্রদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, বান্দরবান জেলায় আমাদের নেতাদের মৃত্যুর ঘটনা প্রথম। এরআগে কখনো এতদিন নেতাকর্মী একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে ২০১০ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিরোধী পক্ষের হামলায় তিন পার্বত্য জেলায় ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নৃশংস হত্যাকাÐে জড়িত সন্তু লারমা বাহিনীর শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে বান্দরবানের পুলিশ সুপার জেরীন আক্তার জানান, হত্যাকাÐের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীরা পরস্পরকে দায়ি করছে ঠিকই, কিন্তু আইনের চোখে সব সন্ত্রাসীই অপরাধী। পূর্বের হত্যাকাÐের ঘটনায় থানায় একাধিক মামলা হয়েছে। পুলিশ আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতের নির্দেশে কারাগারেও পাঠিয়েছে। ছয়জন নিহতের ঘটনায়ও মামলার প্রস্তুতি চলছে। হত্যাকারীদের গ্রেফতারে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

MicroWeb Technology Ltd

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button