ব্রেকিংরাঙামাটিলিড

আকবরের মেয়র হওয়ার দিন আজ

ফিরে দেখা : নাটকীয় সেই নির্বাচনে যা ঘটেছিলো

ঠিক পাঁচ বছর আগে, ২০১৫ সালের,৩০ ডিসেম্বর, আজকের দিনেই রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন আকবর হোসেন চৌধুরী। ‘বহুল আলোচিত’ ও ‘নানান ঘটনায় সমালোচিত’ সেই নির্বাচনে ১৭ হাজার ৯৪৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন জেলা যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি ও নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আকবর। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা: গঙ্গামানিক চাকমা পেয়েছিলেন ১০ হাজার ১৯৮ ভোট,বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী ও তৎকালিন মেয়র সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভূট্টো পেয়েছিলেন ৭ হাজার ৩৫৫ ভোট,বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রবিউল আলম রবি পেয়েছিলেন ২,৩৫৮ ভোট। রিটার্নি কর্মকর্তা মোস্তফা জামান ওইদিন রাত এগারোটায় জেলা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রন কক্ষে এই ফল ঘোষণা করেছিলেন।
তবে ভোটের দিন দুুপুর গড়ানোর আগেই,‘নজিরবিহীন জাল ভোট’,‘কেন্দ্র দখল’ ‘এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া’ ‘কর্মীদের উপর হামলা’ এবং ‘ব্যালটবাক্স ছিনতাই’ এর অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করেছিলেন ডা: গঙ্গা মানিক ও সাইফুল ইসলাম ভূট্টো। ভূট্টো বেলা এগারোটায় এবং ডা: গঙ্গা দুুপুর সাড়ে বারোটার দিকে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণার পর দৃশ্যত আর কেন্দ্রমুখী হননি তাদের সমর্থিত ভোটাররা।

ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হামলায় আহত ভূ্ট্টো যখন হাসপাতাল

ভোট বর্জনের ঘোষণা দেয়ার আগে সকালে রিজার্ভবাজারে এবং বিকালে বিডিআর রোডে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হন পৌর মেয়র ভূট্টো। আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত রাঙামাটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়,সেখানে ভর্তি করা হয় তাকে। এসময় তার গাড়ীও ভাংচুর করা হয়।
দুপুরের পর পৌরসভার বেশিরভাগ কেন্দ্র নিয়ন্ত্রনে নিয়ে ‘নিজস্ব ভোট উৎসব’ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। রাতে ফলাফল ঘোষণা শেষ হওয়ার আগেই সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুন:নির্বাচন দাবি করেন ডা: গঙ্গামানিক চাকমা।
সারাদিন ভোটগ্রহণ শেষে রাতে ঘোষিত ফলাফলে জেলা যুবলীগের সভাপতি আকবর হোসেন চৌধুরীকে মেয়র ঘোষণা করা হয়,যিনি এখনো জেলা যুবলীগের সভাপতি এবং এবারো নৌকার প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে আছেন,চাইছেন মনোনয়ন।

ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের কেড়ে নিয়ে সিল মেরে ফেরত দেয়া ব্যালটের দিকে অসহায় তাকিয়ে আছেন প্রিজাইডিং অফিসার, কি করে মেলাবেন মেয়র-কাউন্সিলরের ভোটের হিসাব ! ৩০ ডিসেম্বর-২০১৫,দুপুর ১২.৪৫ মিনিটে রাঙামাটি পৌরসভা কেন্দ্র থেকে তোলা ছবি

নানা নাটকীয়তার সেই নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন হাবিবুর রহমান হাবিব। কিন্তু প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৩ ডিসেম্বরের ৯ দিন পর ২২ ডিসেম্বর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান হাবিব। জেলা আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে কান্নাভেজা কন্ঠে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে দলীয় প্রার্থী আকবর হোসেন চৌধুরীর পক্ষে থাকার ঘোষণা দেন হাবিব। এরপরই মূলত: জয়ের দরজা খুলে যায় আকবরের। প্রার্থীতা প্রত্যাহারের পর আকবরের পক্ষে একাধিক প্রচারনা সভায়ও দেখা যায় হাবিবকে। হাবিবের মতো আরেক বিদ্রোহী অমর কুমার দে’ও নিজের প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেয় আকবরের সমর্থনে।

নিজে মিষ্টি খেয়ে ও নেতাকে খাইয়ে, নির্বাচনী রেস থেকে নিবৃত্ত হন ‘বিদ্রোহী’ অমরও

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা, ‘উগ্র ও সাম্প্রদায়িক’ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুগপৎ লড়াই এবং নৌকা প্রতীককে বিজয়ী করার জন্য নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন  সাবেক মেয়র হাবিবুর রহমান,যিনি নিজেকে ‘বিদ্রোহী’ নয়,বিকল্প প্রার্থী হিসেবেই দাবি করেছিলেন।তিনি তার বক্তব্যে তার পক্ষে অবস্থান নেয়া বিদ্রোহী কর্মীদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের অনুরোধ করলে জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার তাৎক্ষনিকভাবে তার অনুরোধ মেনে নিয়ে সকল বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের কথা জানান। হাবিবুর রহমান তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও, কখনই নিজেকে বিদ্রোহী প্রার্থী ভাবিনি,সবসময় বিকল্প প্রার্থী হিসেবেই বলেছি। আজ দলের বৃহত্তর স্বার্থে,পার্বত্য চট্টগ্রামের চিহ্নিত ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক নৌকার প্রার্থীকে বিজয়ী করার স্বার্থেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি।’

প্রার্থীতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন হাবিবুর রহমান

তথাপি ভোটের আগের দিন বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা বিপুল সংখ্যক ছাত্রলীগ,যুবলীগ নেতাকর্মী রাঙামাটির বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও নেতাকর্মীদের বাসায় অবস্থান করে এবং ভোটের দিন ‘কেন্দ্র দখল’ এবং ‘ভোট রাজনীতিতে’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে,যা আকবরের জয়কে সুনিশ্চিত করে। ফলে রাঙামাটি পৌরসভার ইতিহাসে ‘রেকর্ডসংখ্যক ভোট’ পেয়ে বিজয়ী হন আকবর।
ফিরে দেখা : ৩০ ডিসেম্বর-২০১৫
নজিরবিহীন অনিয়ম,জাল ভোট আর বহিরাগতদের ব্যাপক ভোট দেয়ার মধ্য দিয়ে পার্বত্য রাঙামাটি পৌরসভার নির্বাচন শেষ হয়। সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যাপকভাবে ভোট জালিয়াতির খবর পাওয়া যায়। শহরের রিজার্ভবাজারের পাঁচটি কেন্দ্রে,কাঠালতলির ২ টি কেন্দ্রে,তবলছড়ির চারটি কেন্দ্রে ব্যাপক জাল ভোট দিতে দেখা গেছে। রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা সরকার দলের সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীদের ব্যাপকভাবে ভোট দিতে দেখা গেছে। দুপুরে শহরের রিজার্ভবাজারে বিএনপি প্রার্থী সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভূট্টোর গাড়ী ও তার নির্বাচনী কার্যালয় ব্যাপক ভাংচুর করা হয়। বিকেলে ভোটগ্রহণ শেষে তার উপর দ্বিতীয়দফা হামলা করা হলে তিনি আহত হন এবং তার গাড়ী ব্যাপক ভাংচুরের শিকার হয়। তিনি বিকেলে হাসপাতালে ভর্তি হন।

সকাল ১১ টার দিকে শহরের আব্দুল আলী একাডেমি কেন্দ্রে বাঘাইছড়ি থেকে আসা ছাত্রলীগের চার নেতাকে জাল ভোট দেয়ার সময় স্বতন্ত্র প্রার্থী রবিউল আলম রবির অভিযোগের ভিত্তিতে আটক করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তাদের জিজ্ঞাসাবাদেও অভিযোগের সত্যতা পায় তারা। এসময় তাদের চারজনকে আটক করা হলেও জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মো: মুছা মাতব্বর আসার পর তার অনুরোধে সাংবাদিকদের সামনেই তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। সাথে সাথেই সাংবাদিকদের ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানান স্বতন্ত্র প্রার্থী রবিউল আলম রবি। তিনি বলেন,প্রশাসন নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব করছে। তিনি সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া দেখানোর পর তাকে গ্রেফতারের হুমকি দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেন।

দুপুরে রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়ার সময় হেলালউদ্দিন নামের এক যুবলীগ কর্মীকে আটক করে ১৫ দিনের কারাদন্ড দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুমানা রহমান শম্পা।

বিকাল তিনটার দিকে রাঙামাটি পৌর কার্যালয়ের কেন্দ্রে কয়েকটি ব্যালট পেপার বই ছিনিয়ে নিয়ে যায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা। পরে তারা সিল মারা শেষে এসব ব্যালট বক্সে ফেলে। তবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিজামউদ্দিন আহম্মেদ তাৎক্ষনিক এই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বন্ধ করে দেন।  ঠিক দশ মিনিট পরেই ‘উপরের নির্দেশে’ আবার ভোট গ্রহণ শুরু করা হয় এখানে। কয়টা ব্যালট পেপার ছিনতাই হয়েছে তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। তবে এইসব ব্যালট বাতিল করা হবে তিনি সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেন। তবে পরে ভোটের ফলাফলে এই কেন্দ্রের বাতিল ভোটের হিসেবে,সেই আশ্বাসের প্রমাণ মেলেনি !

শেষ বিকালে শহরের কাঠালতলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,দক্ষিন বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,গোধূলী আমানতবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,ওয়াপদা রেস্ট হাউজ,রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগকে ঘিরে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। এসব কেন্দ্রে ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামীলীগ কর্মীরা জালভোট দেয়া শুরু করলে কোথাও বিএনপি,কোথাও জনসংহতি সমিতি, আবার কোথাও আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীর সাথে ব্যাপক সংঘর্ষ  হয়।

এসব স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ চলাকালে গুলির শব্দও শোনা যায়। এসময় একজন পুলিশ কনস্টেবলসহ অন্তত: দশজন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে কনস্টেবল মো: দিদার, কাউন্সিলর প্রার্থী আব্দুল মালেক ও মোঃ শাহ আলম এর নাম পাওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে শাহ আলমকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিলো।

‘নারী নির্যাতন’ ২৩ বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে !
‘ধর্ষনের চেষ্টা করা হয়েছে’ এমন অভিযোগ এনে রাঙামাটি শহরের রিজার্ভবাজার,পুরাতন বাস স্টেশন,কাঠালতলি এবং কলেজগেইট এলাকার ২৩ বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কোতয়ালি থানায় একটি মামলা করেন বরকল উপজেলার এক নারী। ২০ ডিসেম্বর-২০১৫, কোতয়ালি থানায় দায়ের করা এই মামলাটিকে ‘ নির্বাচনী মামলা’ অভিহিত করে আসন্ন পৌর নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা থেকে বিরত রাখা ও কেন্দ্র দখল চেষ্টা’য় সম্ভাব্য বাধাদানকারিদের এলাকাছাড়া রাখার প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করেছিলেন মামলায় অভিযুক্তরা।
মামলা দায়েরের পরপরই এজাহারে উল্লেখ করা বিএনপির ওই ২৩ নেতাকর্মীকে গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ,এমনটা স্বীকার করেছিলেন সেইসময়কার কোতয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ মুহম্মদ রশীদ। তিনি বলেছিলেন-‘ আমরা অভিযোগ পেয়েছি,মামলা হয়েছে। সঙ্গত কারণেই অভিযুক্তদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে।’
২০ ডিসেম্বর কোতয়ালি থানায় দায়ের করা এই মামলায় বাদী নুরুন্নাহার,যার বাড়ী বরকল উপজেলায় এবং তার স্বামীর নাম হেলাল মিয়া ।
নুরুন্নাহার নামের এই নারী অভিযোগ করেছিলেন,১৯ ডিসেম্বর বরকল থেকে চিকিৎসক দেখানোর জন্য বোটযোগে রাঙামাটিতে আসার পথে চেঙ্গীমুখে আরেকটি বোটযোগে ২০/২৫ জন লোক তাদের গতিরোধ করে তুলে নিয়ে যায় এবং ধর্ষনের চেষ্টা করে। কিন্তু ইকবাল,সুজন বড়ুয়া,আবু তৈয়ব এবং শফি নামের চার ব্যক্তি তাদের উদ্ধার করে। পরে থানায় গিয়ে ওই মহিলা মামলা যাদের করেছেন। মামলায় যাদের আসামী করা হয় তারা হলেন,রাঙামাটি পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মাহফুজ উদ্দীন,পৌর যুবদলের সাধারন সম্পাদক সিরাজুল মোস্তফা,ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোঃ মাসুম,বিএনপি নেতা আব্দুল মান্নান,যুবদল নেতা আব্দুল মান্নান,মোঃ নেজাম,মোঃ ফজল,নুর নবী,মোঃ দিদার,আব্দুল শুক্কুর,আবুল হাশেম মদন,রাশেদ,নাজিমউদ্দীন,শাহ আলম,লিটন,ইলিয়াছ,ঝন্টু,আলমগীর,রাজু,আরজু,সাদ্দাম এবং শামীম। এরা সবাই বিএনপি,যুবদল কিংবা ছাত্রদলের বিভিন্ন কমিটির দায়িত্বশীল নেতা এবং বিএনপির রাজনীতিতে সেই সময় সবচে বেশি সক্রিয় ছিলো। ধারণা করা হয়, নির্বাচন থেকে তাদের দূরে রাখতেই এই মামলা করা হয়েছিলো !
সেই সময় রাঙামাটি পৌর বিএনপির সাধারন সম্পাদক মাহবুবুল বাসেত অপু বলেছিলেন, এটা একটা হাস্যকর,অযৌক্তিক এবং ভিত্তিহীন অভিযোগের মামলা। মূলত: ভোট কারচুপিতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন সব বিএনপি নেতাকর্মীকে টার্গেট করেই আসামী করা হয়েছে। মামলার এজাহারটি পড়লে এবং সাক্ষীদের নাম দেখলেই এই মামলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার বোঝা যায়। এসবের পরিণতি কারো জন্যই ভালো হবেনা।’

ওই মামলা প্রসঙ্গে জেলা বিএনপি এক বিবৃতিতে বলেছিলো ‘একটি রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ মদদে আগামী ৩০ ডিসেম্বর পৌর নির্বাচনে রাঙামাটি শহরের চিহ্নিত কিছু ভোট কেন্দ্র বিএনপি নেতাকর্মী শূণ্য করে দখল করার পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের ২৩ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।’

সেসময় বিএনপি নেতাদের অভিযোগ অস্বীকার করে রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ মুছা মাতব্বর বলেছিলেন, এই মামলার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নাই। আমরা কিছু জানিওনা। ওরা অপকর্ম করেছে,ভিকটিম মামলা করেছে। এতে আমাদের কিইবা করার আছে।’

কথিত ‘ধর্ষন মামলা’র আসামী হয়ে ‘বাঁচার জন্য সবান্ধব আওয়ামীলীগে যোগ দেয় বিএনপি কর্মী রাশেদ !

সেই রাশেদ আওয়ামীলীগে !
মাত্র সাতদিন আগেই এক নারীর দায়ের করা ধর্ষনচেষ্টার মামলার আসামী ছিলেন তিনি,যে মামলায় বিএনপির ২৩ জন নেতাকর্মীকে আসামী করা হয়েছে এবং বিএনপির পক্ষ থেকে সেই মামলাকে ‘নির্বাচনী মামলা’ হিসেবে দাবি করা হয়েছিলো। মাত্র সাতদিন পরই ২৬ ডিসেম্বর সেই মামলার ১১ নম্বর আসামী রাশেদ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের হাত থেকে ফুলের তোড়া নিয়ে যোগ দিলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগে !

‘কোন চাপের কারণে আওয়ামীলীগে যোগ দেননি’ এমন দাবি করলেও ওই মামলাকে ঠিকই ‘ভিত্তিহীন ও মিথ্যা’ বলে দাবি করেছেন রাশেদ। একই সাথে জানিয়েছেন,তার আওয়ামীলীগের বন্ধু বিপু তালুকদার,তাকে আশ্বস্ত করেছে,ওই মামলার অন্যান্য আসামীদের পুলিশ খুঁজলেও তার (রাশেদ)’র কিছু হবেনা !

কি অভিযোগ করেছিলেন প্রার্থীরা
বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ভূট্টো অভিযোগ করেছিলেন, যেভাবে বিভিন্ন উপজেলা থেকে বহিরাগতদের এনে জাল ভোটের উসৎব করেছে আওয়ামীলীগ,তা রাঙামাটিবাসির জন্য লজ্জার। এইভাবে বিজয়ের মধ্যে কোন অহংকার নেই। তিনি অভিযোগ করেন, তার গাড়ী ভাংচুর এবং নির্বাচনী কার্যালয় ভাংচুর করা হয়েছে। বিভিন্নস্থানে তাদের কর্মীদের কেন্দ্রের কাছাকাছি ঘেঁষতে দেয়া হয়নি,পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। ওরা যা করেছে তাকে কোনভাবে ‘ভোট’ বলেনা। প্রশাসনের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেন তিনি।

জনসংহতি সমিতির প্রার্থী ডা গঙ্গামানিক চাকমা অভিযোগ করেন, যেভাবে ভোটকেন্দ্র দখলের উৎসব করেছে ক্ষমতাসীন দল। তিনি বলেন, এইভাবে ভোটে জয়ের পর,এটাই শেষ কথা হয়। আমরা ভোটের পরেও ছাড় দিবোনা।

স্বতন্ত্র প্রার্থী রবিউল আলম অভিযোগ করেন,প্রশাসনকে যে বিতর্কিত ভূমিকায় দেখা গেছে তাতেই বোঝা যায় তারা কতটা নিরপেক্ষ ছিলেন। এমন নির্লজ্জ ভূমিকা অতীতে কোন নির্বাচনেই আমরা দেখিনি। এভাবে জাল ভোট,কারচুপি,মারধর করে যে নোংরা রাজনীতির চর্চা করেছে ক্ষমতাসীনরা, তা দুঃখজনক এবং নজিরবিহীন।

জবাবে যা বলেছিলো আওয়ামীলীগ
তবে রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মো: মুছা মাতব্বর ও মেয়র প্রার্থী আকবর হোসেন চৌধুরী জানিয়েছিলেন, নিশ্চিত পরাজয় জেনে এবং নৌকার পক্ষে গনজোয়ার দেখেই অন্য প্রার্থীরা নির্বাচন নিয়ে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছে। কোন প্রকার কারচুপি হয়নি বলেও দাবি করেন তারা।
আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মো : মুছা মাতব্বর অভিযোগ করেছিলেন, ‘প্রশাসন তাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরন করেছে এবং বিরোধীদের সহযোগিতা করেছে।’

সড়ক ও নৌপথ অবরোধ ডেকেছিলো জনসংহতি
রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি, চরম অনিয়ম ও প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বমূলক ভূমিকার প্রতিবাদে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে জুম্ম জনগণের চলমান অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে রাঙামাটি জেলায় ৩ জানুয়ারি রবিবার সকাল-সন্ধ্যা সড়ক ও জলপথ অবরোধ কর্মসূচির পালন করেছিলো পাহাড়ের প্রভাবশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
নির্বাচনের পরদিন বৃহস্পতিবার বিকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ তথ্য প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছিলো।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থীর কর্মী ও সমর্থকদের কেন্দ্র দখল, নজিরবিহীন জাল ভোট, ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়ম, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও কর্মীদের উপর হামলা, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতিত্বের মধ্য দিয়ে রাঙ্গামাটি পৌরসভা নির্বাচন ২০১৫ অনুষ্ঠিত হয়েছে।’

ভোট কারচুপির প্রতিবাদে শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছিলো জনসংহতি সমিতি

জনসংহতি সমিতি জানায়, ‘রাঙামাটি পৌরসভার ভোটার নন এমন ব্যক্তিদেরকে নির্বাচনের পূর্বে রাঙামাটি পৌর এলাকা ত্যাগের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ তাদের নীল-নকশা অনুসারে রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে লোক এনে শহরের বিভিন্ন হোটেল ও বিশ্রামাগারে জড়ো করে রাখে। প্রশাসনের নাকের ডগায় রাঙামাটি শহরে সেসব লোকদের জড়ো করা হলেও প্রশাসনের তরফ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’ ওই নির্বাচনকে ‘প্রহসনমূলক নির্বাচন’ আখ্যা দিয়ে ‘প্রত্যাখ্যান করছে’ বলেও জানিয়েছিলো সংগঠনটি।
অবরোধের সমর্থনে ও পৌর নির্বাচনে কারচুপির প্রতিবাদে ২ জানুয়ারি রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছিলো জনসংহতি সমিতি।

শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালন, পুননির্বাচন দাবি
রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে আবারো পুননির্বাচনের দাবি জানিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ৩ জানুয়ারি রাঙামাটি জেলায় সকাল সন্ধ্যা অবরোধ পালন শেষে বিকালে এক সমাবেশে দাবি মানা না হলে আরো কঠোর কর্মসূচীর ঘোষণা দেয়।
অবরোধের কারণে সকাল থেকেই রাঙামাটি শহরে সকল প্রকার আভ্যন্তরীণ ও দুরপাল্লার যান চলাচল বন্ধ আছে। শহর থেকে কোন বাস লঞ্চ ছেড়ে যায়নি,বন্ধ আছে শহরে চলাচলের একমাত্র বাহন অটোরিক্সাও।

অবরোধের দিন শহরে জনসংহতির মিছিল

অবরোধের সমর্থনে শহরের কয়েকটি স্থানে জনসংহতি সমিতির নেতাকর্মীদের পিকেটিং করতে দেখা গেছে। শহরের বিভিন্নস্থানে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে।
সারাদিনই কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শান্তিপূর্ণভাবেই অবরোধ পালিত হয়। অবরোধে সমর্থন করায় রাঙামাটিবাসিকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলটি জানায়-‘ ‘রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলীয় প্রার্থীর কর্মী ও সমর্থকদের কর্তৃক ব্যাপক কারচুপি, চরম অনিয়ম ও প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বমূলক ভূমিকার প্রতিবাদে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে জুম্ম জনগণের চলমান অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির এদিন রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচী পালন করে।’

আওয়ামীলীগের সংবাদ সম্মেলন
জনসংহতি সমিতির অভিযোগের প্রতিবাদে ওইদিনই দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগ। সংবাদ সম্মেলনে রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচনের নব নির্বাচিত মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেছেন, জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায় তাকে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। তাই এ বিজয় মুক্তি যুদ্ধের স্বপক্ষের বিজয়, এ বিজয় রাঙামাটি পৌরবাসীর অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিজয়।
সংবাদ সন্মেলনে অন্যান্যর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, মাহাবুুবুর রহমান, হাজী মুছা মাতব্বর প্রমুখ।
সংবাদ সন্মেলনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার পৌর নির্বাচনে ভোট কারচুপি ও ডাকাতি হয়েছে সেই অভিযোগ ‘মিথ্যা’ দাবি করে ভোটের পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলেছেন, নারিকেল গাছের প্রতীকের পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সমর্থকরা সকাল থেকে তাদের অধ্যুষিত ভোট কেন্দ্র দখল করে ভোট উৎসব করেছে। সেখানে ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে তারাই ভোট কারচুপি ও ডাকাতি করেছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ করেনি।’

পাঁচ বছর পর আবার ‘আকবর-হাবিব দ্বৈরথ’
পাঁচ বছর পরেও, সেই হাবিব এবারো আকবরের মেয়র হওয়ার পথে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠেছেন দলীয় প্রার্থীতা পাওয়ার ক্ষেত্রেও। আওয়ামীলীগের প্রার্থীতা পেতে মোট ১১ জন নেতা দলীয় নেতৃত্বের কাছে ব্যক্তিগত ‘বায়োডাটা’ জমা দিলেও শেষ খবর বলছে,প্রার্থীতার লড়াই চলছে মূলত আকবর ও হাবিবের মধ্যেই।

২২ ডিসেম্বর-২০১৫,নিজের প্রার্থীতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়ার পর তোলা হাবিব-আকবরের যুগল ছবি, এবার কি হবে ?

২০১৫ সালের সেই নির্বাচনে রাঙামাটি পৌরসভার মোট ২৮টি ভোট কেন্দ্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মোট ভোটার ছিলো ৫৮,৩৯৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩২,১৭৯ জন ও মহিলা ভোটার ছিলেন ২৬,২১৮ জন।

এই বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

এই সংবাদটি দেখুন
Close
Back to top button