রাঙামাটি জেলা পরিষদের ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের ঘোষিত বাজেট এবং কিছু কথা


মো. মোস্তফা কামাল প্রকাশের সময়: জুলাই 29, 2017

রাঙামাটি জেলা পরিষদের ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের ঘোষিত বাজেট এবং কিছু কথা

বাংলাদেশের বাজেটের পরিধি দিনকে দিন বড় হলেও পার্বত্য জেলা রাঙামাটিবাসীর ভরসার অন্যতম স্থল রাঙামাটি পার্রত্য জেলা পরিষদের বাজেটের তেমন কোন নড়চড় নেই। গতানুগতিক ধারা অব্যাহত রেখে ২৫ জুলাই এবারও রাঙামাটি জেলা পরিষদ সম্পূর্ণ অনুদান নির্ভর ৬৭ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করলো। ঘোষিত বাজেটে উন্নয়নখাতে ৫৫ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকা রাখা হলেও সংস্থাপন খাতে রাখা হয়েছে ১১ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকা। আবার ঘোষিত এই বাজেটের মধ্যে পরিষদের নিজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি টাকা আর সরকারি অনুদান খাতে ধরা হয়েছে ৬৪ কোটি টাকা। বাজেটের সার সংক্ষেপ আলোচনায় সহজেই বলা হয় পার্বত্য জেলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন বাজেট নির্ভর করবে সরকারি থোক বরাদ্দের ওপর। ১৯৮৯ সালে যাত্রা শুরু হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবাধিক গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠার প্রায় ২৮ বছর পরেও পরিষদের নিজস্ব স্বাবলম্বীতা না আসার বিষয়টি অবশ্যই সুখবর নয়।

যাই হোক গত ১৩ জুনের রাঙামাটি পার্বত্য জেলার ইতিহাসের স্মরণকালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর ও জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক সম্মেলনরে মাধ্যমে ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরের জন্য বাজেট ঘোষণার উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে হয়। জেলা পরিষদ এই একটি বিষয় প্রতি বছর তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে এসছেন। যেখানে রাঙামাটির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতা নেই সেখানে পরিষদের এই ধারাবাহিকতা প্রশংসনীয়। এটি পরিষদের একটি সাহসী উদ্যোগও বটে।

২৫ জুলাই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা পরিষদের অন্যান্য সদস্য এবং কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে লিখিত ববক্তব্যে মাঝে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন। বাজেট ঘোষণার পর তিনি সাংবাদিকদের বাজেট নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তবে বাজেট ঘোষণাত্তর প্রশ্নোত্তর পর্বে পরিষদ চেয়ারম্যান মহোদয়কে কয়েকজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে রাগন্বিত অবস্থায় দেখা যায় যা উপস্থিত অনেক সাংবাদিককে হতাশ করে। তবে উপস্থিত সাংবাদিকরা অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে চেয়ারম্যান মহোদয়ের এই রাগান্বিত হওয়ার বিষয়টিকে মোকাবেলা করে ফলে কোনরুপ বাকবিন্ডা ছাড়াই বাজেট ঘোষণার সংবাদ সম্মেলন শেষ হয়।

যাই হোক আবারো ফিরে আসি ঘোষিত বাজেটের বিষয়ে। বাজেট ঘোষণার পর পরিষদ চেয়ারম্যানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল এই বছরও বাজেটের পরিধি গত অর্থ বছরের ন্যায় কেন? প্রতি উত্তরে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনা অনুসারেই বাজে ঘোষণা করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য সম্ভাব্য অনুদানের ওপর ভিত্তি করেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে দেশের সামগ্রিক বাজেট যেখানে পূর্বের অর্থ বছরের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে সেখানে রাঙামাটি জেলাবাসীর ভাগ্যে পরিষদের মাধ্যমে এই প্রভাব তেমন একটা পড়েনি। বলা যায় হতভাগা রাঙামাটিবাসী।

এবারের বাজেটে মোট ১৪টি খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ ৫৫ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকার বিভাজন দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষা এবং তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে এবং যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে। উভয় খাতে মোট উন্নয়ন বরাদ্দ শতকরা ১৭ % হারে যারি আর্থিক মূল্য ৯ কোটি ৪৪ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাত ধর্ম খাতে বরাদ্দদ রাখা হয়েছে ১৬% যদিওবা পরিষদ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই খাতটিকে সব সময় গুরুত্ব সহকারের বিবেচনা করা হয়ে আসছে। পূর্ত খাতে এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান এবং সুপেয় পানি খাতে বরাদ্দ শতকরার ১২% হারে। সমাজ কল্যাণ, আর্থ সামাজিক ও নারী উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ শতকরা ১০%। এছাড়া কৃষি, মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ খাতে ৫% এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩%। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ খাতে ২% এর পাশাপাশি ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, পর্যটন, ভূমি ও হাট বাজার, শিশু উন্নয়ন খাতে রাখা হয়েছে ১% করে বরাদ্দ। পরিষদের নিজস্ব আয়বর্ধকমুলক প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে শতকরা ১ ভাগ।

সরকারি অনুদানের পাশাপাশি পরিষদের নিজস্ব আয়ের ৩ কোটি টাকার ও বিভাজন করা হয়েছে ১৬টি উন্নয়ন খাতে। পরিষদের নিজস্ব আয়ের বিপরীতে বরাদ্দকৃত বিভাজন এর বেশ কিছু অবশ্যই প্রশংসনীয়। এই বিভাজন পরিষদকে কেন্দ্র জেলাবাসীর আশার ভরসার কিছুটা হলেও পূরণে সক্ষম হবে। পরিষদের নিজস্ব আয় হতে শিক্ষা বৃত্তি খাত সহ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সম্মানী খাত এবং আবাসিক স্কুল পরিচালনা খাতে ৭৫ লক্ষ টাকা । সমাজ কল্যাণ ও প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ও নারী কল্যাণ খাতে ১৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, ত্রাণ খাতে ১৬ লক্ষ ২০ হাজার টাকা, তথ্য প্রযুক্তি এবং ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে ১০ লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

পরিষদের এবার বাজেটে পরিষদের নিজস্ব আয় হতে বিগত বছরগুলোর ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের তহবিল গঠনের জন্য ২০ লক্ষ টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এবারও পরিষদের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে ১০ উপজেলা পরিষদ। চরম আর্থিক সংকটে থাকা জেলার আওতাধীন উপজেলা পরিষদ এবং বাঘাইছড়ি পৌরসভার জন্য পরিষদের পক্ষ থেকে কোন রূপ থোক বরাদ্দ রাখা হয়নি। এটির অবশ্যই প্রয়োজন ছিল।

পরিষদের নিজস্ব আয় থেকে প্রাপ্ত অর্থের সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে পরিষদের সক্ষমতা বৃদ্ধি খাতে। এই বরাদ্দর পরিমাণ ৭৭ লক্ষ টাকা। পরিষদের বিগত সময়ের এই খাতে বরাদ্দের বিষযটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মূলত পরিষদের সদস্য, কর্মকর্তা, কর্সচারী, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং সময় বিশেষে বিশেষ সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরা এই বরাদ্দ থেকে বিদেশ ভ্রমণ করে দক্ষতা অর্জন করে আসেন। একটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এই সক্ষমতা অর্জনের বিষযটি অবশ্যই ইতিবাচক হলেও পরিষদের বিগত সময়ের বিদেশে গিয়ে সক্ষমতা অর্জনের দক্ষতা গ্রহণ করে রাঙামাটি জেলা পরিষদের সক্ষমতাকে কতটুকু সমৃদ্ধ করেছে সে বিষয়ে কিন্ত প্রশ্ন রয়ে যায়। পরিষদের অর্থ ব্যয় করে বিদেশ ভ্রমণ করে এসে যদি কিছু ইতিবাচক উদাহরণ স্থাপন করা হতো তাহলে এই খাতে বরাদ্দের সুফল রাঙামাটিবাসী পেতে পারতো।

রাঙামাটি জেলা পরিষদের এবছরের বাজেট বিগত বছরের বাজেটগুলোর ন্যায় গতানুগতিক ধারার বাজেট বলেই প্রতীয়মান। বাজেট ঘোষণাকালে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কোনরুপ রাখঢাক না রেখেই বলেছেন পরিষদটি যেহেতু একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান সেহেতু নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলে বাজেট আরো সমৃদ্ধ হতো। মনোনিত ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত পরিষদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তিনি দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে প্রকাশ করেছেন ।

রাঙামাটি জেলা পরিষদের ঘোষিত বাজেটের মূল অংশ যদিওবা অনেক কম; তথাপি এই বাজেট বাস্তবায়নে স্থানীয় চাহিদা মিটানোর পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক দলের মনোনিত পরিষদ হিসাবে দলের ভাবমূর্তি রক্ষা কল্পেও পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়। ফলে পরিষদের পক্ষে প্রায়শ জনগণের চাহিদার পুরোপুরি পূরণ করা অনেক ক্ষেত্রে কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তবে পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত বিষয়গুলোর উন্নয়ন খাতের বাজেটওগুলোও যদি পরিষদের উন্নয়ন বাজেটের আওতায় আনা যেত তাহলে পরিষদের ভাবমূর্তি অনেক বৃদ্ধি পেত। পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত বিষয়গুলোর উন্নয়ন বাজেটগুলো পরিষদের মাধ্যমে ব্যয় করার দাবি পরিষদের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে উপস্থাপন করা হলেও এটি অদ্যাবধি বাস্তবায়িত হয়নি। বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।

বাজেট মানেই আলোচনা এবং সমালোচনা। এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক বেশি পরিচিত। তারই ধারাবাহিকতায় রাঙামাটি জেলা পরিষদের ঘোষিত বাজেট নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনার বিষযটিও এসে যায়। যেহেতু রাঙামাটি জেলা পলিষদের পক্ষ থেকে বছরে মাত্র একটিবার সাংবাদিকদের সাথে জেলা পরিষদের সরাসরি বৈঠকের সুযোগ হয় সেহেতু সাংবাদিকদের সারা বছরের জমানো অনেক প্রশ্ন এদিন তুলে ধরা হয়। স্বাভাবিক ভাবেই সাংবাদিকরা আশায় থাকেন এই সব প্রশ্নের উত্তর পেতে। তাই পরিষদের কাছে বিনীত অনুরোধ সাংবাদিকদের এই সব প্রশ্নকে নেতিবাচকভাবে না নিয়ে তাদের গঠনমূলক সমালোচনাগুলোর ইতিবাচক বিষযটি চিন্তা করা দরকার। ক্ষোভের সাথে দূরে ঠেলে নয়; আন্তরিকতার সাথে কাছে টেনে এনে সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়।

লেখক; সিনিয়র সংবাদকর্মী ও অধ্যক্ষ, রাঙামাটি শিশু নিকেতন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Notify of
avatar
wpDiscuz