রক্তের সিঁদুরে গাঁথা বিপ্লব-মুন্নী’র ভালোবাসা


সাইফুল বিন হাসান প্রকাশের সময়: ফেব্রুয়ারী 14, 2018

রক্তের সিঁদুরে গাঁথা বিপ্লব-মুন্নী’র ভালোবাসা

রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজার এলাকার বাসিন্দা মুন্নী ও বিপ্লব। রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলো দুইজনেই। একই পাড়ার ছেলে-মেয়ে ছিলো বলে রোজই দেখা-সাক্ষাৎ হতো দুজনের। শুধুই তাই না, গানের এক স্কুলে রোজ বাদ্যযন্ত্র বাজাতে যেতেন বিপ্লব, অন্যদিকে গান শিখতে যেতেন মুন্নি। দুই জনেরই প্রায় সময় চোখে চোখে কথা হতো। চোখে চোখের এ কথার মাঝে গোপন কোন মনের কথা লুকিয়ে ছিলো কিনা তা বলা মুশকিল। চোখের এ ভাষা তারা দুজন ছাড়া অন্য কেউ জানতো না, বুঝতো না। এ যেনো বাংলার সেই গানের মত ‘চোখ যে মনের কথা বলা ’।

অনেক বছর পরে মুন্নি যখন ইন্টারে পড়ে আর অন্যদিকে বিল্পব ডিগ্রিতে। হঠাৎ একদিন মুন্নি যেনো একটু এগিয়ে এলো। বিপ্লবের সাথে এতদিনের কথা বলা, চোখা-চোখি সবই যেনো সিনেমার মত করে বলে বসলো তাকে। জানান দিলো তার মনের মাঝে জমিয়ে রাখা বিপ্লবের জন্যে ভালোবাসার সাগরটির গভিরতার কথা। পরে দুইজনেই ভাবতে থাকে ভবিষ্যৎ জীবনের কথা, বিপ্লব যেনো একটু বেশি চিন্তাবাদী। আগে থেকে ভবিষ্যৎ চিন্তা করে এগিয়ে যেতেই তার ইচ্ছে। দুইজনের নানান কথা, বিভিন্ন সমস্যার কারণে এক পর্যয়ে সিদ্ধান্তই হয়ে গেলে এ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নেই। তাই বলে এগিয়ে যাওয়া যাবে না সামনের দিকে। কিন্তু কি আর করার, কপালের লেখা, এ যেনো সেই রুদ্র গোস্বামীর লেখার মত ‘অভিশাপ দিয়েছে পাড়ার লোক, তোর সাথে আমার ভালোবাসা হোক’। তাই যেনো বেঁেধ রাখতে পারেনি কেউ এ যুগল প্রেমিকদেরকে। এক পর্যায়ে ভালোবাসার প্রেম নদীতে দুইজনেই নেমে পরলো সফলতার জন্যে।

বন্ধুদের প্রতিষ্ঠান বৈসাবি রেস্তোরায় দেখা করেন প্রথম বারের মত নিজেদের মধ্যে ভালোবাসার লেনাদেনা মিটিয়ে নেয়। এরপর থেকে চলতে থাকে ভালোবাসার যাত্রা। চিঠি দেয়া নেয়া, চুপি চুপি ফোনে কথা বলা, দেখা করা ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে অবাক করার বিষয় হলেও সত্য কথা, এ যে দুই জনেই একই এলাকার একই পাড়ার বাসিন্দা হওয়ার সত্তেও কেউ জানতেই পারলো না তাদের প্রেমের কথা। এ যেনো নীরব ভালোবাসা, শুধু মাত্র অনুভূতিটুকু জানা রইলো ভালোবাসার মানুষটির কাছে।

পরে একসময়ে মুন্নির বিয়ের জন্যে জোর দেয় তার বাবা মা। কিন্তু মুন্নি তার প্রিয় মানুষকে ছাড়া অন্যজনের ঘরে যায় কি করে। তাই তো সে বিপ্লবকে জানায় বিয়ের কথা। কিন্তু বিপ্লব তখন সবে মাত্র ডিগ্রি শেষ করে রাঙামাটি শিশু নিকেতনে শিক্ষকতা করছিলো। পরে এক সময়ে মুন্নি তার নিজের পরিবারকে এ সম্পর্কের কথা জানায়। কিন্তু বিপ্লব একটি স্কুলের শিক্ষক বলে প্রথম পর্যায়ে রাজি হয় না মুন্নির পরিবার। কিন্তু কি লাভ তাতে ! এই যুগল প্রেমিক প্রেমিকা কিন্তু অনেক আগে একবার মন্দিরে গিয়েছিলো। সেখানে বিপ্লব মুন্নির মাথায় সিঁদুর পড়িয়ে দেয়, এ কিন্তু কোন বাজার থেকে কেনে আনা সিঁদুর নয়, বিপ্লবের নিজের দেহের রক্ত দিয়ে বানানো সিঁদুর। হাত কেটেই বিপ্লব মুন্নিকে সিঁদুর পড়িয়ে দেয়। সেই থেকে মুন্নি রোজই মাথার উপরে চুলের ভাজে সিদুর পরতো। তবে তা কেউ যেনো না দেখে মত করেই।

বিপ্লবের ছোট কালেই মা মারা যায়, বাবাও গত হয় বেশি অনেক দিন আগে। তাই তার পরিবারে বড় ভাইরা ছাড়াও অভিবাবক ছিলেন বড় দিদি। দিদি একবার যখন বেড়াতে এলো বিপ্লব তাকে জানানো বিষয়টি। তিনিই ব্যবস্থা করলেন এদের মিলনের ব্যবস্থা। অন্যদিকে একমাত্র মেয়ে তার কথা রাখতেই হবে পরিবারের, তাই বিপ্লবের পরিবার থেকে যখন প্রস্তাব আছে বিয়ের তারাও রাজি হয়ে যায়।

এখন তবে আনুষ্ঠানিক ভাবে ছেলে দেখার পালা। বিয়ের কথা বার্তা একপর্যায়ে করে নিতে হবে। তাই বিপ্লবের অভিবাবকদেরকে যেতে বলা হলো পটিয়া মুন্নিদের গ্রামের বাড়িতে। সেখানে মুন্নির জেঠা মশাইরা রয়েছেন, তারাও ছেলেকে দেখবে একটু। তবে যেদিন বিয়ের দিন ঠিক তবে সেদিনই যেনো ছিলো এক আশ্চর্যজনক দিন। মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মত। বিপ্লব একটা স্কুলের শিক্ষক তাই সে পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিয়ে যাচ্ছিলো। যেদিনই মুন্নির বাড়িতে যাবে তারা ঠিক সেদিন সকালে তার পৌরসভার একটি চাকরির মৌখিক পরীক্ষার সময় পড়লো। পরিবারের সবাই বলে যে চাকরি করতেছিস সেটা জেনেই তো মেয়ে বিয়ে দিচ্ছে তারা, এরমধ্যে অন্য চাকরির জন্যে মেয়ের বাড়িতে না গেলে খারাপ দেখাবে। তবে সর্বশেষ অনেক বোঝানোর পরে মুন্নির পরিবার ও বিপ্লবের পরিবার এ সিদ্ধান্তে উপনিত হলো যে, বিপ্লব রাঙামাটি থেকে চাকরির ইন্টারভিউ দিবে আর অন্যদিকে বিপ্লবের পরিবার যাবে মুন্নিকে দেখতে। যথারীতি তাই হলো। বিপ্লব সকালে রাঙামাটি পৌরসভার চাকরির ইন্টারভিউ দিলো আর অন্য দিকে তারা ভাই-বোনরা মুন্নিকে দেখতে গেলো। কিন্তু হঠাৎ বিকালে সংবাদ এলো বিপ্লবের চাকরি হয়েছে। সে রাঙামাটি পৌরসভায় চাকরি পেয়েছে। এ খবর শুনে আনন্দে আত্মহারা বিপ্লব। এ সংবাদ চলে যায় পটিয়ায় মুন্নির বাড়িতেও। এসময় মুন্নি যেনো আকাশের চাঁদ পেয়ে আনন্দে উৎফুল্ল । সকল বাঁধা তাহলে অপসারিত আর দেরি কিসের। ভালোবাসার মিলন হওয়ার এক অধ্যায় যেনো শেষ হওয়ার পালা। ঠিক হয় মুন্নি ও বিপ্লবের বিয়ের দিন। পারিবারিক ভাবে এ যুগলের মিলন হয় বিয়ের মাধ্যমে।

২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যে ভালোর যাত্রা শুরু, তা চলে ২০০৯ পর্যন্ত। পরে ২০০৯ সালের মার্চের ৪ তারিখ বিয়ের মধ্য দিয়ে মিলন হয় একটি ভালোবাসার ও দুইটি মনের। বর্তমানে তাদের দ্ইু সন্তান গুগলু ও শ্রেষ্ঠা। প্রায় ১৬ বছরে তাদের এক সাথে থাকা ও পরিবার-পরিজনকে না জানানো এমনকি পাড়ার লোকদের অগোচরে ধীরে ধীরে গড়া উঠা এ ভালোবাসার সফলতার ছোঁয়া পেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

এ প্রেমিক যুগলের কাছে সর্বশেষ জানতে চাওয়া হয় বর্তমান প্রেম সম্পর্কে কিছু কথা। তারা জানান, পাওয়ার পণ নিয়েই ভালোবাসতে হবে, পরিকল্পনা করে। তাহলেই সেই ভালোবাসা সফলতার আলো দেখতে পাবে। কিন্তু বর্তমানে পরিকল্পনাহীন ভালোবাসাগুলো সফলতার আলো দেখতে পায়না বলে মন্তব্য তাদের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

avatar
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Mohammad Rubel
Guest

খবর আর নাই

Md Azad
Guest

সুখী পরিবার

AL Noman
Guest

লেখার ধরণটা মোটেও ভালো লাগলো না ?

Pritom
Guest

সিঁদূর রক্তের হয় কেমনে???অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী ????

AL Noman
Guest

পড়ে দেখ কী লিখছে ?

Shamal Chakma Shamal
Guest

তোমাদের ভালোবাসা অমর হোক

Rigan Das
Guest

সামনের দিন গলো জন্য শুভ কামনা রহিল দাদা