ভয় নিয়েই ফের ‘মৃত্যুকূপে’ বসবাস

0
top article add

রাঙামাটি শহরের ভেদভেদী সনাতন পাড়ার বাসিন্দা বাসনা দাশ (৫৫)। গত বছরের পাহাড়ধসে তার ঘরটিও মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিলো। ওই সময় মাটিচাপা পড়ে তার ছেলে লিটন দাশ (৩২), ছেলের বউ চুমকি দাশ (২১) ও নাতি আয়ুশ দাশ (২) মারা যায়। সে দিনের ভয়াল দৃশ্য এখনো চোখে ভেসে উঠলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না বাসনা।

কিন্তু বাসনা এখনো তার দুই ছেলে রতন দাশ ও রুপম দাশকে নিয়ে আবারো সেই ‘মৃত্যুকূপে’ই ঘর বেঁধে থাকছে। অন্যত্র গিয়ে ঘরবেঁধে না থাকার অবস্থা নেই বলে এখনো ‘মৃত্যুকূপে’র মধ্যে ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে বাসনার পবিবার।

বাসনার ছেলে রতন দাশ জানায়, ‘এটা আমার বাবার ভিটেমাটি। এই ভিটেছাড়া আমাদের আর কিঝুই নেই। অন্যত্র গিয়ে থাকা কিংবা ঘরবাঁধাও আমাদের পক্ষে সম্ভব না। তাই জীবন শঙ্কা নিয়ে হলেও বাস করতে হচ্ছে আমাদের।’

কেবল বাসনায় নয়। এমনিভাবে ফের মৃত্যুকূপে ঘর বেঁধেছে ভেদভেদী নতুন পাড়ার জালাল মিয়াও। গেল বছরের পাহাড়ধসে জালাল মিয়ার ছেলে আরিফ ও আরিফের স্ত্রী মারা যায়। পরে অন্যত্র গিয়ে ঘরবাঁধার আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায় ফের সেই ঝুঁকিতে ঘর বেধে থাকছেন তিনি।

জালাল মিয়া জানান, আবারো যেভাবে বৃষ্টি শুরু হয়ে এতে আমাদের মনের ভিতরে ভয় কাজ করছে। রাতে ভয়, আতঙ্কে ঘুম আসে না। তবুও জীবনের ভয় নিয়ে পরিবার আমাদের বসাবাস করতে হচ্ছে। কোথায় যাবো? নিজের ভেটেমাটি ছেড়ে কী কেউ যেতে চায়?

দক্ষিণ মুসলিম পাড়ার বাসিন্দা আজগর আলী। তার ছেলেও মারা গেছে গেল বছর পাহাড় চাপা পড়ে। কিন্তু এখনো অন্য ছেলে-মেয়েদের নিয়ে পুরোনো স্থানে ঘর করে থাকছেন তিনি।

শুধু কেবল বাসনা, জালার আর আজগর আলীই নয়। রাঙামাটি শহরের ভেদভেদির নতুন পাড়া, সনাতন পাড়া, কিনামনি পাড়া, যুব উন্নয়ন, শিমুলতলীসহ গত বছর যেসব এলাকায় ভয়াবহ পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যু ও ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল, সেখানে নতুন করে বসতি তৈরি হয়েছে।

এখন আবারো ফিরে এসেছে সেই ভয়াল ১৩ জুন। গত বছরের এই দিনে রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড় ধসে ৫ সেনা সদস্যসহ ১২০ জনের প্রানহানির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৭৩ জনই মারা যান রাঙ্গমাটি সদর উপজেলায়। এর বাইরে কাউখালী উপজেলায় ২১ জন, কাপ্তাইয়ে ১৮ জন, জুরাছড়িতে ৬জন ও বিলাইছড়ি উপজেলাতে ২ জন নিহত হন।

এসময় সারাদেশের সাথে সড়ক যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায় রাঙামাটির। এছাড়া পুরো জেলা জুড়ে প্রকৃতির ভয়াল তান্ডবে তছনছ হয়ে যায় অসংখ্য ঘরবাড়ি। আহত হয়েছে দু’শতাধিকের অধিক মানুষ। এই দুর্যোগে জেলায় ১৮ হাজার ৫৫৮টি পরিবার কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১২৩১টি বাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং নয় হাজার ৫৩৭টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

তবে পাহাড় ধসে মানুষ মারা গেছে এমন কয়েকটি জায়গার অনেক বাসিন্দা এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়েও থাকছেন। এদের মধ্যে একজন মো. কাউসার। কাউসার জানান, আমি আগে ভেদভেদী রূপনগর এলাকায় থাকতাম। গত বছরে পাহাড়ধসে আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। তাই পড়ে ভাড়া বাসাতে উঠেছি। এখন পরিবার নিয়ে ভেদভেদী পুলিশ চেকপোস্ট এলাকায় থাকছি।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এরমধ্যে এবছর রাঙামাটি পৌরসভাসহ ১০ উপজেলায় মোট ৩ হাজার ৩৭৮ পরিবারের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজারেরও অধিক মানুষ পাহাড় ধসের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, রাঙামাটি পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের ৩৩টি এলাকায় ৬০৯টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে বসবাস করছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, চম্পানির মার টিলা, চেঙ্গির মুখ, এসপি অফিস সংলগ্ন ঢাল, মাতৃমঙ্গল এলাকা, কিনারাম পাড়া, র্স্বর্ণটিলা, রাজমনি পাড়া, পোস্ট অফিস কলোনি, মুসলিম পাড়া, কিনা মোহন ঘোনা, নতুন পাড়া পাহাড়ের ঢাল, শিমুলতলী, রূপনগর এলাকা পাহাড়ের ঢাল, কাঁঠালতলী মসজিদ কলোনি, চম্পকনগর পাহাড়ের ঢাল, আমতাবাগ স্কুলের ঢাল, জালালাবাদ কলোনি পাহাড়ের ঢাল ও অন্যান্য এলাকা।

এর বাইরে রাঙামাটি সদর উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে ৭৫০ পরিবারের ৩ হাজার ৪২৪ জন লোক পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকিতে আছে। রাজস্থলী উপজেলায় তিন ইউনিয়নে ২৮৬টি পরিবারের ১ হাজার ১৮২ জন, কাপ্তাই উপজেলার ৫ ইউনিয়নে ৫৮০ পরিবারের ২ হাজার ৭৯৩ জন, বরকল উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের ৩৭৭ পরিবারের ১ হাজার ৮৫০ জন, জুরাছড়ি উপজেলার ৪ ইউনিয়নে ৬৪ পরিবারের ৩২০ জন, নানিয়ারচর উপজেলার ৪ ইউনিয়নে ২৩৯ পরিবারের ১ হাজার ১১১ জন, লংদুতে ৩ ইউনিয়নের ১০৮ পরিবারের ৫১৪ জন, বিলাইছড়ির ৩ ইউনিয়নের ২৪৫ পরিবারের ১ হাজার ১৭৯ জন, কাউখালী উপজেলার ৪ ইউনিয়নের ১২০ পরিবারের ৫৫৩ জন সহ মোট ১২ হাজার ৯২৬ জন লোক পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে আছে।

এরমধ্যে রাঙামাটি শহরের ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতামূলক সাইনবোড টাঙিয়েছে জেলা প্রশাসন। করেছে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে মত বিনিময় সভাও।

পৌর কাউন্সিরর রবি মোহন চাকমা বলেন, ‘প্রশাসন তো ঝুঁিকপূর্ণ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য বলে আসছে। এখনো তাদের বলা হচ্ছে। কিন্তু তারা কোথায় যাবে, কি করবে ? এজন্য অনেকেই তাদের পুরোনো জায়গায় ঘরবাড়ি বেঁধে থাকছে। তবে জীবন বাঁচানোর জন্য তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয় নিতেই হবে। আমাদের আর যেন কোনও অস্বাভাবিক মৃত্যু দেখতে না হয়। আমরা সে ব্যাপারে কাজ করছি।’

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ বলেন, ‘আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্যোগ মোকাবেলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি করাদের নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া সে সব এলাকায় জনপ্রতিনিধিরাসহ তাদের সাথে আমরা মতবিনিময় সভা করেছি। ইতিমধ্যে পুরো জেলায় মোট ২১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাঙামাটি শহরে পাহাড় ধসের হতে পারে আমরা এমন ৩১টি স্থান চিহ্নিত করেছি। এর মধ্যে পুরো জেলায় মোট ৩ হাজার ৩৭৮ পরিবারের প্রায় ১৫ হাজার লোক পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছে। এর মধ্যে আমরা শহরে ও পুরো জেলায় ২১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছি। ’

উল্লেখ্য, গেল বছরের ১৩ জুন রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ওইসময় নিহত পরিবারের পাশাপাশি বিধ্বস্ত হয়ে বহু পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল।

1
এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
1 Comment authors
Kanta Biswas Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Kanta Biswas
Guest

Amar Mama Chilo, Dida Daduke Eto kore bolchi Okhan Theke Sore Jete tobu Sore na