ভেঙ্গে গেলো ‘ইউপিডিএফ’ !


প্রকাশের সময়: নভেম্বর 15, 2017

ভেঙ্গে গেলো ‘ইউপিডিএফ’ !

পাহাড়ে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলনের ১৯ বছরের মাথায় এবার প্রকাশ্যে দ্বিধা বিভক্তি দেখা দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)’এ। বুুধবার সকালে খাগড়াছড়ির শহরতরীর একটি হলরুমে দলটির সংস্কারপন্থীদের আনুুষ্ঠানিক আত্বপ্রকাশ ঘটে। আর এর মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙ্গে গেলো প্রশিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন এই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলটি।
বৈঠক থেকে ইউপিডিএফের বর্তমান রাজনৈতিক কার্যকলাপ অগনতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করা হয়। এসময় একই লক্ষ ও একই নামে নিজেদের গনতান্ত্রিক দাবী করে তপন জ্যোতি চাকমাকে আহ্বায়ক ও জলেয়া চাকমাকে সদস্য সচিব করে ৯সদস্যের নতুন কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি ঘোষনা করে। এদিকে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ এই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ করেছে এবং আজ(বৃহষ্পতিবার) খাগড়াছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা সড়ক অবরোধ ঘোষনা করেছে।
এর আগে ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল চুক্তি স্বাক্ষরকারী পাহাড়ের আঞ্চলিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির শীর্ষনেতা জৌাতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দলটি দ্বিধা বিভক্তি হয়ে যায়। সংস্কারপন্থীরা সাবেক গেরিলা নেতা সুধাসিন্ধু খীসার নেতৃত্বে একই নাম এবং লক্ষ নিয়ে বিভক্ত হয়ে আন্দোলন শুরু করে।
নতুন ভাবে ইউপিডিএফ’র আতœপ্রকাশ
প্রসীত বিকাশ খীসা নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফকে অগনতান্ত্রিক উল্লেখ করে নতুনভাবে ৯সদস্যের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি ঘোষনা করেছে। বুধবার সকালে খাগড়াছড়ি শহরতরীর খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টারে নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষনা করা হয়। এতে ইউপিডিএফের রাঙ্গামাটি জেলার সাবেক কর্ডিনেটর তপন জ্যোতি চাকমাকে আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা সমন্বয়ক জলেয়া চাকমাকে সদস্য সচিব করা হয়। আর কমিটির সদস্যরা হলেন সদস্য নানিয়ারচর থানার সাবেক সমন্বয়ক উজ্জ্বল কান্তি চাকমা, সাবেক উপজেলা সমন্বয়ক রিপন চাকমা, বাঘাইছড়ির সাবেক অফিস সহকারী সত্য রঞ্জন চাকমা, থানা কোর্ডিনেটর আলোকময় চাকমা, কেন্দ্রীয় যুব ফোরামের সদস্য মিটন চাকমা, সাবেক জেলা কর্ডিনেটর পুলু মার্মা ও সাবেক যুব ফোরাম নেতা সোনামনি চাকমা। এসময় লিখিত বক্তব্যে তপন জ্যোতি চাকমা বলেন, বর্তমান ইউপিডিএফ এর আন্দোলন পরিচালনা পদ্বতি সঠিক না হওয়ার কারণে ইউপিডিএফ এর কেন্দ্রীয় নেতা সঞ্চয়, দিপ্তী শংকর চাকমাসহ অনেক নেতাকর্মী দল ত্যাগ করেছেন। দল ত্যাগ করার অপরাধে দলটির অনেক নেতাকর্মীকে মেরে ফেলা হয়েছে। ইউপিডিএফের গঠনতন্ত্রে গনতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও তাদের তাদের কার্যকলাপ অগণতান্ত্রিক। বলপ্রয়োগ, চাঁদাবাজী, গুম, খুন অপহরণের রাজনীতি করে আসছে। এখন থেকে গণতান্ত্রিক উপায়ে দল পরিচালনা করা হবে।
এই বিষয়ে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ এর খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সংগঠন মাইকেল চাকমা বলেন, ‘ইউপিডিএফের কার্যক্রমে ঈর্শার্নিত হয়ে একটি পক্ষ নেপথ্য থেকে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। পার্টির নাম ভাঙ্গিয়ে তাঁরা আমদের দুর্বল করার চেষ্টা করছে। যারা এখন নতুন করে ইউপিডিএফ দাবী করছে তাঁরা সবাই বহিস্কৃত।
শহরে লাঠি মিছিল, বৃহষ্পতিবার সড়ক অবরোধ
এদিকে কমিটি ঘোষনার আগে প্রসীত বিকাশ খীষার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ ‘মাদক সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্ত প্রতিরোধ কমিটি’র ব্যানারে শহরে লাঠি মিছিল বের করা। মিছিলটি স্বনির্ভর এলাকা থেকে বের হয়ে চেঙ্গী স্কোয়ার ঘুরে আবার স্বণির্ভরে এসে শেষ হয়। এতে বক্তব্য রাখেন ইউপিডিএফের জেলা সংগঠক মাইকেল চাকমা, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের জেলা কমিটির জেলা সাধারণ সম্পাদক অমল ত্রিপুরা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রেশমি মারমা, নারী সংঘের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কাজলী ত্রিপুরা প্রমুখ। সমাবেশ থেকে বক্তারা সংস্কারপন্থীদের নব্য মুখোশধারী আখ্যা দিয়ে তাদের প্রতিহত করার ঘোষনা দেন এবং আগামীকাল খাগড়াছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা সড়ক অবরোধ পালন করা হবে বলে জানানো হয়।

যেভাবে জন্ম ইউপিডিএফ’র
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংকট সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-র সাথে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে।
নব্বই দশকের গোড়ার দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যয়নকালে অবিভক্ত বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতা প্রসীত বিকাশ খীসা সন্তু লারমার ওই সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করেন।
১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আয়োজিত ঐতিহাসিক অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রসীত খীসা’র অনুগামীরা ব্যানার উঁচিয়ে ‘নো রেস্ট, ফুল অটোনমি’ লেখা ব্যানার উচিঁয়ে চুক্তির বিরোধীতা করেন।
পরে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হলরুমে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে পাহাড়ের তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা শান্তিচুক্তিকে প্রত্যাখান করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনই পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যার একমাত্র সমাধান’ বলে ঘোষণা দেয় । গঠন করা হয় নতুন রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পর্যন্ত প্রসীত বিকাশ খীসা ইউপিডিএফ’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ইউপিডিএফ’র জন্মলগ্ন থেকেই সংগঠনটিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে ধরে নেয় নিয়ে পার্বত্যচুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তুু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)। ফলে তিন পার্বত্য জেলায় ইউপিডিএফ’র সাথে পিসিজেএসএস জড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতি নানা সংঘাতে। এই দুই সংগঠনের সশস্ত্র সংঘাতে অর্ধ-সহ¯্রাধিক পাহাড়ির মৃত্যু পাশাপাশি অসংখ্য অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, হামলা-মামলার ঘটনা ঘটছে, ঘটে চলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Notify of
avatar
wpDiscuz