বোহেমিয়ান এক সকালে জীবনের খোঁজে…

4
top article add

ভোরের আলো ছোঁয়নি তখনো। আমাদের দু চাকার যান ছুটছে উঁচু নিঁচু পথ ধরে। শহুরে রোলার কোষ্টারের চেয়ে কোন অংশে কম নয় এই পথ। কখনো সাই করে উঠে যাচ্ছে মেঘের কাছে আবার কখনো একদম নিচুতে।পথে পথে তখনো পাহাড়ায় মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু কুকুর। গাড়ি তাই চালাতে হয় সাবধানেই। আড়মোড়া ভেঙে জাগছে নাম জানা না জানা পাখির দল।লেকের জলে চিকচিকে আলো জানান দিচ্ছে সকাল। আসছে।দুপাশে লেক পাহাড়ের মাঝে সরু পথ ধরে ছুটতে ছুটতে গন্তব্যে আমরা।

আপাতত গন্তব্য সজীব কাকুর দোকান। ঘুম ভেঙেছে সবে সজিব কাকুর ক্লাশ ফাইভ পড়ুয়া দু পুত্রের।আমাদের দেখেই উনুনে চাপলো চায়ের কেটলি। দোকানের মুখেই লেকের পাড় জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঁশের আরাম কেদারায় পা ছড়িয়ে বসে আমরা দেখছি পূব দিগন্তে জেগে উঠে লেকের জলে ছড়িয়ে পড়া তেজদীপ্ত সূর্য্যি মামা। লেকের জজলে এক অদ্ভুদ সুন্দরতা। স্বচ্ছ জলে সকালের প্রথম আলো।গায়ে মাখামাখি ভালোবাসা। বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকা দায়। আর এপাড়ে রাস্তার দুধার জুড়ে রঙ বেরংয়ের নানা ফুল। মোহে বিভোর হতে হতেই ডাক পড়লো চায়ের। সকালের প্রথম চা সাথে দু পিস বিস্কিট। কাকুর দোকানে গরম পরোটা আরর ডাল পাওয়া যায় কেবল বিকেলেই। খেতে পারেন মশঅলা দেয়া রঙ চা-ও। চায়ে চুমুক দিতেই হাজির কাকুর দুই পাহারাদার কালো কুকুর আর সাদা বিড়ালছানা। দু পিস বিস্কিটে ছড়িয়ে দিতেই আহ্লাদে পায়ের কাছে গড়াগড়ি।

চা খেতে খেতে গল্প বাড়ছে কাকুর সাথে। বাঁধের জলে ভেসে যাওয়া পুরান শহরের গল্প,সংসারের গল্প,পাহাড়ি বাঙালী হৃদ্যতা ভালোবাসা বন্ধুতা বিবাদের গল্প! প্রতিদিন এই পথে ঘুরতে আসা মানুষের গল্প হুটহাট বিপদে পড়ার গল্প। কত শত গল্প।  চা শেষ হতে না হতে হাজির সজীব কাকুর সহধর্মীনি। দুজন মিলেই মূলত: চালায় জীবিকার মাধ্যম এই দোকান। রোজকার বেচা বিক্রিতে আয় ২-৩ হাজার। মাসির পছন্দ হলোনা চায়ের রঙ! এবার চা খেতে হবে আমাদের আবার। মাসীর আবদার। কি আর করা। যেহেতু আমার চায়ে না নেই সাথে কাকুর মুখে আরো কিছু গল্প শুনা। অসাধারন চা বানায় মাসী। চা পান সব শেষ কিন্তু গল্প ফুরোয় না কাকুর। বাবার সাথে হিসেব মিলাতে আসলো কাকুর ছোট ছেলে। হাতে গুণে গুণে একদম পাক্কা হিসেব। মাসী নিজের বানানো।চায়ের দাম নিবেনা কোন ভাবেই। আবার বিকেলের আমন্ত্রন মাসীর।

এবার ফিরতে হবে। সূর্য্যের তেজ বাড়ছে। মাথায় ঝাপি ছুটছে যে যার কাজে।জুম ফসল নিয়ে পথের ধারের বাজারে হাজির হচ্ছে পাহারী রমনী পাশে পাশে বাড়ির কুকুরটাও। আবার কারো কারো সাথে আদরের সন্তানো।স্বপ্না মাহিতি দু বান্ধুবী হাত ধুরে ছুটছে আকাবাকা রাস্তায় স্কুলে পৌছাতে হবে জলদি। রাস্তার দুধারে দোকান গুলো জাগছে উনুনের আচে। তেল গরম হচ্ছে এক্ষুনি ভেজে উঠবে গরম গরম পরোটা। পথিকের জন্য পথে পথে রাখা আছে মাটির কলসিতে ঠান্ডা জল।

যাওয়ার পথে যতটা নিস্তব্দ এ পথ ফেরার পথে ততটাই সরব। ছুটতে ছুটতে আবার এসে থামলাম আমরা এই রাস্তা শুরুর প্রান্তে। উনুন থেকে নামছে গরম গরম ফুলে ফেপে উঠা নানরুটি। সকালের নাস্তাটা সেরে নেয়াই যায়। গরম গরম নান আর ডাল আর কন্ডেন্সড মিল্কের চা। কন্ডেন্সড মিল্ক খেতে না চাইলে আছে প্যাকেট দুধেরও ব্যবস্থা এবং একটি সুন্দর সকাল….

এবার সূর্য্যের তেজ বাড়ার আগেই বাড়ি ফেরার পালা…. করছিলাম রাঙামাটি কাপ্তাই সংযোগ সড়কের গল্প। রাঙামাটিবাসীর জন্য ইতিমধ্যে ভীষন প্রিয় আর পরিচিত এই রাস্তার বৈকালিক রুপের সাথে পরিচিত কম বেশি সবাইই কিন্তু সকালটা!ঘুরে আসুন না। একদিন সকাল জাগার আগে।প্রকৃতি কি পবিত্রতায় আলিঙ্গন করছে আপনায় না গেলে বুঝবেন কি করে! এখানে সকাল সকাল দাম্পত্য শুরু হয়ে কাধে কাধ মিলিয়ে জীবিকার স্রোতে নিজস্ব ফসলের সাথে কিনবা নিজস্ব টিনশেডের ছোট্ট চায়ের দোকানে। স্কুলের জন্য ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাপাখিরা কিচিরমিচির করতে করতে পাড়ি দেয় উচু নিচু পথ সানন্দ্যে। বিহারের সামনে জমে ফুলের ডালি বন্দনার জন্য। স্কুলের সামনের প্রার্থনা সংগীতের সুর ভেসে আসবে অনেকটা পথ। শহর রাঙামাটির এপ্রান্ত তবলছড়ির আসাম বস্তি রোড ধরে ছুটে আসামবস্তি ব্রিজীর এ মাথাতেই পেয়ে যাবেন সাড়ি সড়ি সিএনজি। রিজার্ভ কিংবা লোকাল হিসেবে নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন এ পথ। নিজস্ব গাড়ি কিংবা মোটর বাইক ভ্রমনকে করবে নিঃসন্দেহে আরো আরামদায়ক। এখানে জীবন সহজ সুন্দর ভালোবাসার…এর চেয়ে সুন্দর সকাল হয়না। সত্যি হয়না…..ঘুরে আসুন না হয় বোহেমিয়ান কোন এক সকালে জীবনের খোঁজে…….

 

লিখেছেন : তানিয়া এ্যানি ১১.০৯.২০১৭

2
এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

avatar
2 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
2 Comment authors
A M Talha KhanSalauddin Jewel Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Salauddin Jewel
Guest

আমি সকালে অনেকবার গিয়েছি…বিকেলের চাইতে ঐ রোডের সকালটা বেশি সুন্দর

A M Talha Khan
Guest

লিখা পরে আপনাদের শহুরে সকাল দেখার ইচ্ছে জেগেছে।