নীড় পাতা / ব্রেকিং / বেদনা বিষাদের সেই রাত আজ

বেদনা বিষাদের সেই রাত আজ

২০১৭ সালের ১২ জুন। দুইদিন ধরেই টানা বর্ষনে বিরক্ত পার্বত্য শহর রাঙামাটির মানুষ। দৃশ্যত ঘরবন্দী সবাই। টানা বৃষ্টি,বিদ্যুৎহীনতা আর কাজকর্মের ব্যাঘাত হলেও শহরবাসির প্রতিক্ষাই ছিলো,কখন কমবে মনোটোনাস এই বৃষ্টি। সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়,সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। বর্ষন তো থামেনা। বর্ষণের বিরক্তি নিয়ে সেদিন ঘুমুতে গিয়েছিলো রাঙামাটির মানুষ। কিন্তু কে জানতো,সেই ঘুমই বিভিষিকাময় মৃত্যুর মিছিল হয়ে ফিরবে রাতভোরেই !

টানা বৃষ্টির কারণে যখন পুরো শহরেই একের সাথে অন্যের যোগাযোগহীনতা তৈরি হয়েছে,সেই সময়েই যে একের পর এক পাহাড় ধসের ঘটনায় পাহাড়ের নীচে চাপা পড়ছিলো মানুষ,সেই খবর পেতে পেতে ততক্ষণে সকাল ! ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই ভয়াল মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তখনো তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যেই শহরের নানান প্রান্ত থেকে আসতে থাকে পাহাড় ধস আর মৃত্যুর সংবাদ। এমন ভয়াবহ দুর্বিষহ দুর্যোগ আর সংকটের মুখোমুখি আগে কখনো হয়নি রাঙামাটি। নেমে আসে শহরের সব তরুণ যুবার দল। ভোর রাতেই মাঠে নেমে পড়েন তৎকালিন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান ও তার দল। সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী,পুলিশ,ফায়ারসার্ভিসসহ সরকারের সব প্রতিষ্ঠান,সর্বস্তরের মানুষ। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। একের পর এক লাশ উঠে আসতে থাকতে। রাঙামাটি সদর হাসপাতাল লাশের ভারে ভারি হয়ে উঠে। আহতদের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে উঠে আশপাশ। টানা তিনদিনের অভিযানে উদ্ধার করা হয় ১১৭ টি মৃতদেহ,৩ জনের মৃতদেহ পাওয়া না গেলেও তাদের নামও অন্তর্ভূক্ত হয় লাশের তালিকায়। সর্বমোট ১২০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনদিন পর উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের যোগাযোগ অব্যাহত রাখার চেষ্টায় কাজ করতে নামা দুই সেনাকর্মকর্তা ও জওয়ান। শুধু শহরেই নয়,মৃত্যুর মিছিলে যোগ দেয় কাউখালী,কাপ্তাই,জুরাছড়ি ও বিলাইছড়িও। লাশের পর লাশ দেখে হতবিহ্বল পুরো রাঙামাটি,সারাদেশও।

আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষের ভীড়!
মৃত্যুর মিছিলের মধ্যেই রাঙামাটি শহরের ১৯ টি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেয় কয়েক হাজার মানুষ। এইসব মানুষের থাকা,খাবার,চিকিৎসা নিয়ে শুরু হয় নতুন চ্যালেঞ্জ। সারাদেশ থেকে আসতে থাকে বিপুল সহায়তা। দল মত নির্বেশেষে মানুষ পাশে দাঁড়ায় এদের। মানবিক সহায়তায় যেনো অনন্য নজির হয়ে উঠে পুরো রাঙামাটি,সারা দেশ। এইভাবে টানা তিনমাস আশ্রয়কেন্দ্রের প্রায় তিন হাজার মানুষকে দিনের পর দিন খাবার,চিকিৎসা ও অন্যান্য সকল সহযোগিতা করে গেছে প্রশাসন। সাথে ছিলো বেসরকারি নানান উদ্যোগও। তিনমাস পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে বাড়ি ফিরতে শুরু করে আশ্রয়কেন্দ্রেই দিনরাত পাড় করা মানুষগুলো।

তবুও জীবনযুদ্ধ
আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বের হয়ে গিয়ে নিজের পুরনো ঠিকানাতেই বসত বাঁধতে হয় বেশিরভাগ মানুষকে। নতুন এবং ভালো কোন বিকল্প না থাকায়,সবাই ফিরে যায় ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো ঠিকানাতেই। শুরু হয় নতুন জীবন যুদ্ধ। কেউ পরিবারের সবাইকে হারিয়ে নি:স্ব,আবার কেউবা প্রিয় স্বজনকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। কিন্তু জীবন তো থেমে থাকেনা। ঠিকই জীবনের প্রয়োজনেই বেঁচে থাকার যুদ্ধ শুরু হয় এসব বিপন্ন মানুষের। প্রতিশ্রুত সহায়তা হয়তো মেলেনি,ঝাপসা চোখে প্রিয়জনকে খুঁজে ফেরে ফেরে হয়তো প্রতিদিন কাজে বেড়োয় এসব মানুষ,কিন্তু ১২ জুন পিছু ছাড়েনা। সকাল দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে,রাতও আসে ফিরে ফিরে,শুধু প্রিয়জনেরা ফেরেনা ! আশ্চর্য্য বেদনা আর হাহাকার নিয়ে বয়ে চলে জীবন,জীবনের মতোই ! যেখানে সুর নেই,ছন্দ নেই,স্বাভাবিকতা নেই,শুধু আছে বেঁচে থাকার নিদারুণ যুদ্ধটাই !

আরো দেখুন

বৃষ কেতু’র সাথে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাক্ষাত

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা এর সাথে নবগঠিত সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 + 6 =