বাবু-শিমু’র কাছাকাছি হওয়ার কৃতিত্ব বন্ধুদেরই


সাইফুল বিন হাসান প্রকাশের সময়: ফেব্রুয়ারী 14, 2018

বাবু-শিমু’র কাছাকাছি হওয়ার কৃতিত্ব বন্ধুদেরই

রাঙামাটি শহরের তবলছড়ি এলাকার বাসিন্দা বাবু ও শিমু। শিমু হচ্ছে বাবুর কাছের বন্ধু আবুর ছোট বোন। বন্ধুর বাসায় প্রতিনিয়ত যাতাযাত ছিলো বাবুর। দেখা হতো শিমুর সাথে। তবে কখনো বন্ধুর বোন থেকে আলাদা কিছুই ভাবা হয়নি তার। এ যেনো পশ্চিম বঙ্গের ‘সঙ্গী’ সিনেমার মত। হঠাৎ কখন জানি বন্ধুর বোনকে পছন্দ করে বসে বাবু। তবে কখনো বলা হয়নি একে অন্যকে নিজের মনের কথা। লুকচুরিতে থেকে যায় দুইটি অবুঝ মনের কিছু ভালোবাসার অনুভূতি।

সেই ২০০০ সালের কথা, শিমু পড়ালেখা করতো রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত সুইডিশে,থাকতো হোস্টেলে। তখনি বাবু শিমুকে তার মনের কথা লিখে পাঠালো একটি চিরকূটের মাধ্যমে, তবে এ চিরকুটে কি লেখেছিলো বাবু তা আজো গবেষণা করে বের করতে পারেনি শিমু। দেড় লাইনের এ চিঠি বাবুর মনের কি কথাই না লিখেছিলো তা বোঝাই সম্ভব হয়নি আজো শিমুর। বাবু কি লেখেছে সে নিজে জানে কিনা এনিয়ে আজো সংশয় কাটেনি শিমুর। তবু একটা ছেলের পাঠানো চিঠি। প্রথম একটি চিরকূট, এ যেনো ভালোবাসার প্রথম ছোঁয়া। তবুও শিমুর মনে হাজারো প্রশ্ন, যে মানুষটাকে বড় ভাইয়ের বন্ধু হিসাবে চেনে সে, এইতো বছর দুইএক ধরে মানুষটাকে দেখছে, জানছে কিন্তু মানুষটা এ কেমন চিঠি দিলো। যার অর্থ খুঁজে পায়নি শিমু।
তবুও ভালোলাগা ভালোবাসার যাত্রা শুরু করে এখান থেকেই। ভালোবাসার বিশাল সমুদ্রে দুজনেই নৌকার পাল তুলে দিয়ে ছুটতে থাকে নির্দিষ্ট গন্তব্যের পথে।

শিমু যখনি ছুটিতে বাড়িতে আসতো তখন বাবু তাকে ডেকে আনতো বাবুর মা শিমুকে ডেকেছে বলে। এছাড়া শিমু যখন হোস্টেলে থাকতো তখন প্রায় সময় বাবু শিমুর অভিভাবক সেজে ফোন করতো শিমুর হোস্টেলে। হোস্টেল সুপার ভেবেই নিতো হয়তো শিমুর বাড়ি থেকে তার অভিভাবক ফোন করেছে। তাই ডেকে দিতো শিমুকে। এমনই করে লুকোচুরি কথা হতো দুজনের।

আর ছুটিতে বাড়ি এলেতো কথাই নেই, বাবুর বাড়িতে দেখা হতো দুজনের। এছাড়া একই এলাকায় বসবাস, দেখা তো হতই প্রতিনিয়ত।

বাবু প্রায় সময় শিমুকে দেখতে যেতো কাপ্তাইয়ে। দুই জনের কথা হতো, দেখা হতো, আড্ডা হতো মিলন হতো দুই মনের। মজা বিষয় হচ্ছে বাবু কাপ্তাই থেকে ফিরার পরে প্রায় সময় তার পকেটে থেকে যেতো কাপ্তাই লঞ্চের টিকেট। এনিয়ে বাড়িতে হাজারো প্রশ্নের শিকার হতে হতো বাবুকে। বাবু তখনও বেকার এক যুবক। তাই তো তার তেমন একটা পকেটে টাকা থাকতো না বলেই চলে। এদিকে সে কাপ্তাই যায়, এনিয়ে তো হাজার প্রশ্নের মুখামুখি হতেই হয়। শিমু বাবুকে তার পকেট খরচ থেকে প্রায়ই টাকা দিতো কাপ্তাই যাওয়া আসার জন্যে। ভালোবাসা হয়তো এমনই হয়, একটি বোঝাপড়ার মধ্যেই চলে ভালোবাসার রেলগাড়ি।

সে এক বাবুর জন্মদিনের কথা, শিমু সবে মাত্র তার বৃত্তি পেয়েছে। যে শিমু কখনো রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় তার কলেজ এবং সদর উপজেলার তার বাড়ি ছাড়া একলা কোথাও যায়নি। সেই শিমু প্রথম তার এক বন্ধুর সাথে চট্টগ্রাম গিয়ে প্রিয় মানুষের জন্যে একটা পাঞ্জাবি নিয়ে আসলো। ভালোবাসার মানুষের জন্মদিন বলে কথা। এমনই করে হাজারো সুখ-দুঃখের মধ্যে চলতে থাকে বাবু-শিমুর প্রেম কাহিনী।

তবে হঠাৎই যেনো ভাঁটা চলে আসে তাদের প্রেমের মাঝে, বেকার বাবুর সাথে শিমুর প্রেম ও বিয়ে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না শিমুর পরিবার। তাই সরাসরি নির্দেশ বাবুকে ভুলে যেতে হবে তার। কোন ভাবেই বাবুর সাথে সম্পর্ক রাখা চলবে না। এত কড়া নির্দেশের মাঝেও শিমুর ভাই আবু অর্থাৎ বাবুর বন্ধু কিন্তু ছিলো নিজের প্রিয় বোন শিমু ও বন্ধু বাবুর পক্ষে। হাজারো ঝড় ঝাপটার পরেও তারা টিকে থাকার জন্যে যুদ্ধে করে যাই সমাজ পরিবারের বিপক্ষে গিয়ে।

একসময় শিমুর ডিপ্লোমা প্রায় শেষ, তখন সে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য পড়ালেখার প্রয়োজনে ঢাকার যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পড়ালেখা শেষ করে এদিকে বাবু ডিগ্রি করা বেকার এক যুবক। কিভাবে সম্ভব তাদের ভালোবাসার মিলনের ? এ নিয়েই ভাবনা দুজনের। একদিকে শিমুর বাড়ির কড়া নির্দেশ অন্যদিকে বেকার যুবক বাবু।

একদিন শিমু খবর পাঠালো বাবুকে, বাবু এসে শিমুর বাড়িতে দুজনে গোপনে কথা বলছে। শিমু সরাসরি বাবুকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে,বাবু তার পক্ষে এখন সম্ভব না বলে জানিয়ে দেয় শিমুকে। অভিমানী শিমু বাবুকে রাগে, ক্ষোপে বের করে দেয় বাড়ি থেকে। যে মেয়ে এক বেকার ছেলেকে স্বামী হিসাবে গ্রহণ করতেও রাজি, সে ছেলে কিনা এ মেয়েকেই ফিরিয়ে দিচ্ছে।

এদিকে কষ্টে ভরা বুক নিয়ে বাবু ফিরে আসে শিমুর বাড়ি থেকে। এর মধ্যে শিমুর সাথে পরিবারের অন্য বড় ভাইদের সাথে খুবই ঝগড়া, কেউ যেনো মেনে নিতে পারে না তাদের সম্পর্ককে। তাই বড় ভাইয়ের সাথে সম্পর্কে ভাঁটা লেগেছে শিমুর। এ জন্যে পড়ালেখা করতে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত শিমু কিছুদিনের জন্যে মামার বাড়িতে গিয়ে উঠে। সেখান থেকে চলে যাবে ঢাকায়। কিন্তু যাওয়া হলোনা আর শিমুর।

কারণ বাবু ফিরে এসে বন্ধুদের সাথে আলাপ হয় এসকল বিষয় নিয়ে। তাই বন্ধুরা নিজেরাই মিলে শিমুর খবর নিয়ে পৌঁছে যায় শিমুর মামার বাড়িতে। প্রথমে মামির সাথে কথা বলে এবং পরে মামির মাধ্যমে কথা হয় শিমুর সাথেও। এ পর্বেই তারা কোর্ট থেকে বিয়ের কাবিন করেছিলো। মামিকে বাবুর বন্ধুরা সেই কাবিন নামাটি দেখালো। মামি শিমুকে গিয়ে জানানো একথা। মামি বুঝালো শিমুকে, ‘তোমাদের সম্পর্কের কথা প্রায় মানুষ জানে, এলাকায় ছড়িয়ে পরেছে তোমাদের সম্পর্কের কথা। এছাড়া তোমরা তো কাবিনও করে ফেলেছো, এখন তো বিয়ে করতেই হয়।’ তখন শিমু বললো ঠিক আছে।

মামি যখনই শিমুর সাথে কথা বলছিলো তখন বাড়ির বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলো বাবুর বন্ধুরা। পরে তারা হাজির হলো শিমুর সামনে।

মামিসহ শিমু ও বাবুর বন্ধুরা চলে যায় কাজীর বাড়িতে সেখানেই বিয়ে হয় দুজনের। বিয়ের সময় সে এক মজার ঘটনা, যে দুই বন্ধু সে সময়ে সেখানে হাজির ছিলো তারা দুজনই হলো সনাতন। এখন বিয়েতে সাক্ষির প্রয়োজন, তাই এ বন্ধুদেরকেই সাজানো হলো সাক্ষি, নাম পরিবর্তন করেই তাদেরকেই রাখা হলো সাক্ষি হিসাবে।

উল্লেখ্য, বিয়ের কৃতিত্ব বাবুর বন্ধু এলাহী, সবুজ, জসিম, রানা, রহিম সহ আরো অনেকের। বন্ধুরা ছিলো বলেই সম্ভব হলো এ যুগল প্রেমিকের মনের মিলনের।

তবে একটি কথা না বলেই নয়, বাবু বেকার থাকায় বিয়ের সময়েও তার পকেটে কোন অর্থ ছিলোনা। সে জন্যে বন্ধু জসিমের কাছ থেকেই ধার নেয়া হয় কাজীর ফিস, তবে আজো বন্ধুর থেকে ধার করা সে টাকা শোধ করা হয়নি বাবুর। বন্ধু বলে কথা এ নিয়ে প্রতিনিয়ত ক্ষেপানো হয় বন্ধু বাবুকে,বন্ধুদের আড্ডায়ও চলে এনিয়ে হাসিঠাট্টা।

বিয়ের পরে বন্ধুরাই নানান ছল করে রাজি করায় বাবুর মা’কে, এর মধ্যে দিয়ে একপক্ষের অনুমতি মিলে যায় তাদের।

বিয়ের পরে কেটে গেছে এ যুগল প্রেমিকের দীর্ঘ সংসার জীবন। প্রথম সন্তান যখন পৃথিবীতে আসার সময় হয় তখন প্রায় মেয়েই আশা করে তার মা-বাবা তারই পাশে থাকবে। কিন্তু কপালের লেখা কি আর খন্ডানো যায়। তবুও শিমুর মা মেয়ের এমন দিনে কাছে থাকার সে কি ব্যকুলতা। মায়ের মন বলে কথা, তাই না পাঠক।

এর পর থেকে শিমুর মায়ের আশা-যাওয়া, বেকার বাবুর বেকারত্ব দূর হওয়া সহ নানান সমস্যার সমাধান শেষে আলোর মুখ দেখে এ যুগল প্রেমিক।

২০০০ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রেম। এরপরে ২০০৪ সালের ৯ জানুয়ারি বিয়ে করেন এই দুই যুগল প্রেমিক। আজ প্রায় দীর্ঘ ১৫ বছর তাদের সংসার জীবন। সুন্দর এক বোঝাপরার মাঝেই কেটে যাচ্ছে তাদের জীবন সংসার। কখনো ঝগড়া হয়েছে বলে জানাই নেই এই দুই যুগল প্রেমিক-প্রেমিকার। বর্তমানে তাদের সংসারে রয়েছে দুই মেয়ে সন্তান আনিকা ও আনিশা। ভালোবাসাময় জীবন কাটাচ্ছে এ যুগল ।

এ যুগলের কাছে জানতে চাওয়া হয় বর্তমান প্রেম সম্পর্কে, তারা জানান, বর্তমান প্রেমে বোঝা পড়ার কিছুটা সমস্যা রয়েছে। রয়েছে একে অন্যকে পাওয়ার যে পণ করার প্রতিজ্ঞা তারও অভাব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

avatar
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Jahid Hassan Shuvo
Guest

২০০০ সালের সময় তো সুইডিশ এ মহিলা হোস্টেলই ছিলোনা!